ইরানে আলী খামেনির শেষ বিদায় পর্ব শুরু: সাত দিনের বিস্তারিত সূচি
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় নিহত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে শেষ বিদায় জানানোর আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। জানাজা, শোকযাত্রা ও দাফনসহ কয়েক ধাপে এই বিদায় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। ইরানের পাশাপাশি ইরাকেও তাঁর কিছু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা পালন করা হবে বলে নিশ্চিত করেছে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি এক হামলায় নিহত হন আলী খামেনি। তাঁর মৃত্যু ও সাত দিনের এই শোক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে পুরো অঞ্চলের ভূ-রাজনীতিতে এক থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
সাত দিনের কর্মসূচিতে যা থাকছে: শুক্রবার কর্মসূচির প্রথম দিনে তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা ধর্মীয় কমপ্লেক্সে আলী খামেনি ও তাঁর নিহত পরিবারের সদস্যদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান আমন্ত্রিত বিদেশি অতিথিরা। শনিবার: সাধারণ জনগণ খামেনির কফিনে শেষ শ্রদ্ধা নিবেদনের সুযোগ পাবেন। রোববার (তৃতীয় দিন): রাষ্ট্রীয়ভাবে জানাজা ও বিশেষ দোয়া অনুষ্ঠিত হবে। সোমবার (চতুর্থ দিন): তেহরানে বিশাল শোকযাত্রা বের করা হবে। মঙ্গলবার (পঞ্চম দিন): খামেনির অনুসারীরা শিয়াদের পবিত্র নগরী হিসেবে পরিচিত 'কোম' শহরে জমায়েত হবেন। বুধবার (ষষ্ঠ দিন): কফিন পাঠানো হবে প্রতিবেশী দেশ ইরাকে। সেখানে নাজাফ ও কারবালা শহরের পবিত্র মাজার প্রাঙ্গণে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। বৃহস্পতিবার (সপ্তম দিন): ইরানের ঐতিহ্যবাহী মাশহাদ শহরে সমাহিত করার মাধ্যমে দাফন পর্ব সম্পন্ন হবে।
ইরানের সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই আয়োজনটি ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ইতিহাসে অন্যতম বৃহত্তম জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠান হতে যাচ্ছে। কোম শহরের জুমার নামাজের খতিব আয়াতুল্লাহ মোহাম্মদ সাইদি বলেন, "শহীদ নেতার জানাজার মিছিলে জনগণের বিশাল উপস্থিতি ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পক্ষে আরেকটি গণভোট হিসেবে গণ্য হবে।"
প্রশাসন ধারণা করছে, সাত দিনের এই কর্মসূচিতে লাখ লাখ অনুসারী অংশ নেবেন। এজন্য সরকারি ব্যবস্থাপনায় যাতায়াত, আবাসন ও খাবারের বিশেষ ট্রাস্ট গঠন করা হয়েছে। এই শোকগাথার মাঝে দীর্ঘ সময় পর যুদ্ধ শুরুর পর প্রথমবারের মতো জনসম্মুখে এসেছেন আইআরজিসি প্রধান আহমেদ ভাহিদি। তবে আলী খামেনির মৃত্যুর পর নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত হওয়া তাঁর ছেলে মোজতবা খামেনি এখনো অন্তরালেই রয়েছেন।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রীয় এই শোক ও আনুগত্যের বাহ্যিক আবরণের আড়ালে বর্তমান সরকারের প্রতি সাধারণ মানুষের সমর্থন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। দশকের পর দশক ধরে চলা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং গত ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে তীব্র মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ ইরানিদের মধ্যে এক ধরণের ক্লান্তি ভর করেছে। অনেক বাসিন্দা বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে থমথমে ক্ষোভও প্রকাশ করেছেন।
তেহরানের এক স্থানীয় বাসিন্দা বার্তা সংস্থাকে জানান, বাসিজ (স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী) ও নিরাপত্তা বাহিনীর অতিরিক্ত কড়াকড়ির কারণে সাধারণ জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে এবং তাঁর পরিবার এই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া এড়াতে রাজধানী ছেড়ে চলে যাচ্ছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ১৯৮৯ সালে ইরানের প্রথম সর্বোচ্চ নেতা ও ইসলামি বিপ্লবের জনক আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর সময় যে আবেগঘন গণবিস্ফোরণ দেখা গিয়েছিল, আলী খামেনির বেলায় সাধারণ জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত আবেগ কিছুটা কম। খোমেনির বিদায়লগ্নে লাখ লাখ মানুষের চাপে কফিন ভেঙে যাওয়ার মতো ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটেছিল, তবে বর্তমান তেহরানের পরিস্থিতি অনেক বেশি শান্ত ও নিয়ন্ত্রিত।
Comments