নীতি সুদহার ১০ শতাংশ বহাল রেখে বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা
দেশের উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর ও সংকোচনমূলক অবস্থান বহাল রেখেই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথমার্ধের (জুলাই-ডিসেম্বর) মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন এই মুদ্রানীতিতে নীতি সুদহার (পলিসি রেপো রেট) ১০ শতাংশেই অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের স্থবিরতা কাটাতে শিল্প, কৃষি ও এসএমই খাতের জন্য বড় অঙ্কের বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ রাখা হয়েছে।
আজ মঙ্গলবার (৩০ জুন) বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর হাবিবুর রহমান নতুন এই মুদ্রানীতি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন। এ সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানসহ অন্যান্য ডেপুটি গভর্নর ও শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে বাজারে অর্থ সরবরাহ কমানোর নীতি ধরে রাখা হলেও, উৎপাদন ও বিনিয়োগ সচল রাখতে ভারসাম্যমূলক পদক্ষেপ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বেসরকারি খাতের স্থবিরতা কাটিয়ে কর্মসংস্থানে গতি আনতে শিল্প, কৃষি এবং কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি (সিএমএসএমই) উদ্যোক্তা খাতের জন্য ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, 'বাংলাদেশ ব্যাংক আদেশ ১৯৭২' (২০০৩ সালে সংশোধিত) অনুযায়ী মূল্যস্ফীতি সহনীয় ও স্থিতিশীল রাখাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান আইনি লক্ষ্য। মূল্যস্থিতি বজায় রাখার মাধ্যমে টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, প্রকৃত বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সহজ করাই এই নীতির মূল উদ্দেশ্য।
মুদ্রানীতির রূপরেখায় বলা হয়েছে, বর্তমান সরকার যখন দায়িত্ব গ্রহণ করে, তখন দেশের অর্থনীতি নানা কাঠামোগত চাপের মধ্যে ছিল। বিশেষ করে ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, আর্থিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতা এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে নিম্ন ও প্রান্তিক আয়ের মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছিল। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক যৌথভাবে কাজ করছে।
সরকারের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন মুদ্রানীতিতে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি এবং ৭ দশমিক ৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতি ধরে রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে দেশে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি সর্বোচ্চ ১১ দশমিক ৭ শতাংশে উঠেছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের টানা সংকোচনমূলক ও কঠোর মুদ্রানীতির ফলে তা ধাপে ধাপে কমে ২০২৬ সালের মে মাসে ৯ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে এসেছে। তবে এই পতন সত্ত্বেও মূল্যস্ফীতি এখনো সাধারণ মানুষের জন্য কাঙ্ক্ষিত ও স্বস্তিদায়ক পর্যায়ে না আসায় কঠোর অবস্থান ধরে রাখা হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বজায় থাকার পেছনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একাধিক অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক কারণ চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে রয়েছে— রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত, মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার ধারাবাহিক অবমূল্যায়ন, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্যের অস্থিরতা, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, বিগত সময়ে সরকারের উচ্চ মাত্রায় ঋণগ্রহণ এবং অভ্যন্তরীণ সরবরাহ ব্যবস্থার নানা বিঘ্ন।
Comments