যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি চুক্তি সই: কে কি সুবিধা পেল?
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সদ্য প্রকাশিত ১৪ দফার 'ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক' বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দীর্ঘদিনের সামরিক ও অর্থনৈতিক অচলাবস্থার পর উভয় পক্ষই কৌশলগত ও বাস্তবসম্মত কিছু বড় সুবিধা পেয়েছে।
চুক্তি অনুযায়ী ওয়াশিংটন এবং তেহরান—কে, কী সুবিধা পেল তা বিশ্লেষনে জানা গেল:
ইরানের প্রাপ্ত সুবিধা:
দীর্ঘদিন ধরে চলা নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক অবরোধের পর এই সমঝোতা স্মারক ইরানের জন্য বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত বিজয় নিয়ে এসেছে:
-
চুক্তির অন্যতম বড় দিক হলো ইরানের জব্দ ও অবরুদ্ধ থাকা সমস্ত তহবিল এবং সম্পদ ব্যবহারের জন্য পুরোপুরি উন্মুক্ত করে দেবে যুক্তরাষ্ট্র। পাশাপাশি ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক যাতে এই অর্থ স্বাধীনভাবে লেনদেন করতে পারে, তার সব লাইসেন্স ও অনুমোদন ওয়াশিংটন দেবে
-
চুক্তি সইয়ের পরপরই মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় ইরানের অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য রপ্তানির ওপর ছাড় দেবে। এর আওতায় ব্যাংকিং লেনদেন, বিমা ও পরিবহন সেবার সুবিধাও পাবে তেহরান ।
-
আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে নিয়ে ইরানের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অন্তত ৩০ হাজার কোটি (৩০০ বিলিয়ন) মার্কিন ডলারের একটি বিশাল অর্থনৈতিক পরিকল্পনা তৈরি করবে যুক্তরাষ্ট্র ।
-
চুক্তি স্বাক্ষরের ৩০ দিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র তার নৌ অবরোধ পুরোপুরি তুলে নেবে এবং ইরানের নিকটবর্তী এলাকা থেকে নিজেদের সামরিক বাহিনী সরিয়ে নেবে ।
-
চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হিসেবে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ, আইএইএ এবং যুক্তরাষ্ট্রের একতরফাভাবে দেওয়া সব প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের নিষেধাজ্ঞা ধাপে ধাপে প্রত্যাহার করা হবে।
-
লেবাননসহ সব ফ্রন্টে ইরানের মিত্রদের ওপর মার্কিন বা তাদের সহযোগীদের সামরিক অভিযান স্থায়ীভাবে বন্ধ হবে ।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রাপ্ত সুবিধা:
যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য ছিল পারমাণবিক হুমকি কমানো এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রধান রুটগুলো সচল করা। এই চুক্তির মাধ্যমে ওয়াশিংটন নিম্নলিখিত সুবিধাগুলো নিশ্চিত করেছে:
-
বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি অবিলম্বে উন্মুক্ত করতে বাধ্য থাকবে ইরান। বাণিজ্য জাহাজগুলো যাতে বিনা মাশুলে এবং নিরাপদে চলাচল করতে পারে, তার সর্বোচ্চ ব্যবস্থা করবে তেহরান ।
-
প্রণালিতে থাকা সব সামরিক ও কারিগরি বাধা এবং মাইন ৩০ দিনের মধ্যে অপসারণ করবে ইরান, যা বৈশ্বিক জ্বালানি ও বাণিজ্য সুরক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের বড় সাফল্য ।
-
ইরান পুনরায় নিশ্চিত করেছে যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা সংগ্রহ করবে না। এছাড়া তাদের মজুত করা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আইএইএ-র তত্ত্বাবধানে নির্দিষ্ট স্থানেই নিষ্ক্রিয় করতে রাজি হয়েছে ইরান ।
-
লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধের মাধ্যমে এই অঞ্চলে মার্কিন মিত্রদের (যেমন ইসরায়েল বা অন্যান্য উপসাগরীয় দেশ) ওপর সরাসরি সামরিক হুমকি হ্রাস পাবে ।
-
চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির বর্তমান অবস্থার বাইরে নতুন কোনো অগ্রগতি করতে পারবে না, যা যুক্তরাষ্ট্রকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার সুযোগ দেবে ।
কে বেশি সুবিধা পেল?
সামগ্রিক মূল্যায়নে দেখা যাচ্ছে, চুক্তিটি উভয় পক্ষের জন্যই 'উইন-উইন' বা সমান সুবিধাজনক একটি পরিস্থিতি তৈরি করেছে, তবে সুবিধার ধরন ভিন্ন।
-
ইরান পেয়েছে তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক ও কৌশলগত জীবনরেখা। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন তহবিল এবং জব্দ করা টাকা ফেরত পাওয়ায় ধুঁকতে থাকা ইরানি অর্থনীতি এক ধাক্কায় চাঙ্গা হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।
-
যুক্তরাষ্ট্র পেয়েছে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক স্বস্তি। বড় কোনো সামরিক সংঘাত ছাড়াই ওয়াশিংটন বিশ্ব অর্থনীতির লাইফলাইন 'হরমুজ প্রণালি' সচল করতে পেরেছে এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে কঠোর নজরদারির মধ্যে আটকে দিতে সক্ষম হয়েছে।
Comments