সংশোধন হচ্ছে ‘ব্যাংক রেজুলেশন আইন’: ফিরতে পারছেন না বিতর্কিত মালিকরা
তীব্র সমালোচনা এবং বিশ্বব্যাংকের ১৬৫ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণ সহায়তা আটকে যাওয়ার শঙ্কায় বিতর্কিত 'ব্যাংক রেজুলেশন আইন' সংশোধন করতে যাচ্ছে সরকার। অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত করেছে, গত ১০ এপ্রিল পাস হওয়া এই আইনের চরম বিতর্কিত '১৮(ক)' ধারাটি বাতিল করা হচ্ছে।
এই ধারাটি বাতিল হলে ব্যাংক দখলকারী বা আর্থিক কেলেঙ্কারিতে জড়িত সাবেক শেয়ারহোল্ডারদের ব্যাংকের সম্পদ ও দায় পুনরায় ফিরে পাওয়ার আর কোনো সুযোগ থাকবে না। দেশের ব্যাংকিং খাত সংস্কারের ক্ষেত্রে সরকারের এই পিছু হটাকে একটি অত্যন্ত ইতিবাচক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা।
মূলত দেশের পাঁচটি ইসলামী ব্যাংককে কেন্দ্র করে এই আইনি জটিলতার সৃষ্টি হয়। ব্যাংকগুলো হলো, এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক,গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক,ইউনিয়ন ব্যাংক
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে একটি নির্দিষ্ট ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সীমাহীন ঋণ জালিয়াতি ও বেনামি ঋণের কারণে এই ব্যাংকগুলোতে চরম মূলধন ঘাটতি, তারল্য সংকট এবং আকাশচুম্বী খেলাপি ঋণের সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে বাংলাদেশ ব্যাংক এসব ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে নতুন বোর্ড গঠন করলেও গ্রাহকদের আস্থা পুরোপুরি ফেরানো যায়নি। এর মধ্যে সংসদে আইনটি পাসের সময় বিতর্কিত ধারাটি যুক্ত করায় গ্রাহকদের মনে আতঙ্ক ছড়ায় যে—ব্যাংকগুলো হয়তো আবারও সেই পুরোনো লুটেরাদের হাতেই ফিরে যাচ্ছে। ফলে আমানত তুলে নেওয়ার একটি ক্ষতিকর প্রবণতা তৈরি হয়। তবে ধারাটি বাতিলের সিদ্ধান্তে গ্রাহকদের মাঝে স্বস্তি ফিরবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কী ছিল সেই বিতর্কিত ১৮(ক) ধারায়?
গত ১০ এপ্রিল অন্তর্বর্তী সরকারের তৈরি করা ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশটিকে আইনে পরিণত করে বর্তমান সরকার। তবে আইনটি জাতীয় সংসদে পাসের ঠিক আগ মুহূর্তে ১৮(ক) নামে একটি নতুন ধারা যুক্ত করা হয়।
এই ধারায় বলা হয়েছিল— কোনো ব্যাংক রেজুলেশনের (পুনর্গঠন বা অবসায়ন) আওতায় যাওয়ার আগে যারা ওই ব্যাংকের শেয়ারধারক বা মালিক ছিলেন, তারা চাইলে পরবর্তী সময়ে আবার সেই ব্যাংকের শেয়ার, সম্পদ ও দায় নেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে আবেদন করতে পারবেন।
এই ধারা পাসের পরই অর্থনীতিবিদ ও সুশীল সমাজের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। অভিযোগ ওঠে, বিগত সরকারের আমলে ব্যাংক খাত ধসিয়ে দেওয়া বিতর্কিত প্রভাবশালী মালিকদের পেছনের দরজা দিয়ে আবারও মালিকানায় ফিরিয়ে আনতেই এই ধারাটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে যুক্ত করা হয়েছিল।
বিশ্বব্যাংকের কঠোর অবস্থান ও ঋণ অনিশ্চয়তা
আইনটি সংশোধনের পেছনে সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে। বিশ্বব্যাংক স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, আর্থিক খাতের সুশাসন নিশ্চিত না করে এবং লুটেরাদের ফেরার পথ খোলা রেখে এই বিশাল ঋণ ছাড় করা সম্ভব নয়। ফলে বাজেট সহায়তার অংশ হিসেবে পাওয়ার অপেক্ষায় থাকা কমপক্ষে ১৬৫ কোটি ডলারের ঋণসহায়তা সম্পূর্ণ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ মো. জাহিদ হোসেন বলেন, "১৮(ক) ধারাটি আর্থিক খাতের সংস্কারের ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের নীতিগত পশ্চাদপসরণ ছিল। এর মাধ্যমে লুটেরাদের আবার পেছনের দরজা দিয়ে ঢোকার আইনি লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল। কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থা এমন পরিস্থিতিতে আর্থিক সহায়তা দেয় না।"
সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ সরকারের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, 'যারা ব্যাংকগুলোকে দেউলিয়া করেছে, হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার করেছে, তাদেরই আবার সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়ার সুযোগ রাখা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সরকারের এটি বাতিলের সিদ্ধান্ত অত্যন্ত ইতিবাচক।'
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এই ধারাটি বাতিলের নীতিগত সিদ্ধান্ত ইতোমধ্যে চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। সরকারের অনুমোদন সাপেক্ষে যেকোনো সময় আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং (আইনি পরীক্ষা) শেষে একটি সংশোধনী বিল বা জরুরি অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে ব্যাংক রেজুলেশন আইনের ১৮(ক) ধারাটি আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হবে।
Comments