ভোলায় তোফায়েল আহমেদের দ্বিতীয় জানাজায় মানুষের ঢল
ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান ও মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, সাবেক মন্ত্রী এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতা তোফায়েল আহমেদের দ্বিতীয় জানাজা তাঁর নিজ জেলা ভোলায় সম্পন্ন হয়েছে। আজ মঙ্গলবার (২ জুন) দুপুর আড়াইটায় ভোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে এই জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এই বীর মুক্তিযোদ্ধার জানাজায় সর্বস্তরের হাজারো মানুষের ঢল নামে।
জানাজার পূর্বে রাষ্ট্রীয় গার্ড অব অনারের মাধ্যমে মরহুমের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। এর আগে, আজ দুপুর দেড়টার দিকে ঢাকা থেকে একটি বিশেষ হেলিকপ্টারে তোফায়েল আহমেদের মরদেহ ভোলার বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামাল বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন হেলিপ্যাডে আনা হয়। এ সময় প্রিয় নেতাকে শেষবারের মতো দেখতে দলীয় নেতাকর্মী, স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীরা হেলিপ্যাডে ভিড় জমান। পরে সেখান থেকে একটি ফ্রিজিং ভ্যানে করে মরদেহ জানাজা ময়দানে নিয়ে যাওয়া হয়।
জানাজা শেষে মরহুমের মরদেহ জেলার দক্ষিণ দীঘলদি ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, যেখানে পারিবারিক কবরস্থানে বাবা-মায়ের পাশে তাঁকে সমাহিত করা হবে।
তোফায়েল আহমেদের বর্ণাঢ্য জীবন
বাংলাদেশের রাজনীতি ও আন্দোলন-সংগ্রামের অন্যতম অগ্রনায়ক তোফায়েল আহমেদ ১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলার কোড়ালিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা আজহার আলী ছিলেন একজন ব্যবসায়ী এবং মা ফাতেমা খানম ছিলেন গৃহিণী। তোফায়েল আহমেদ ভোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৬০ সালে ম্যাট্রিক পাস করেন। এরপর বরিশাল ব্রজমোহন (বিএম) কলেজ থেকে ১৯৬২ সালে আইএসসি ও ১৯৬৪ সালে বিএসসি সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মৃত্তিকাবিজ্ঞান বিভাগে এমএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬৪ সালে তিনি আনোয়ারা বেগমের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন এবং তিনি এক কন্যার জনক।
কলেজ জীবন থেকেই ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন তোফায়েল আহমেদ। তিনি বিএম কলেজ ছাত্রসংসদের ক্রীড়া সম্পাদক ও অশ্বিনী কুমার হলের সহসভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তিনি ইকবাল হল (বর্তমান শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) ছাত্রসংসদের ভিপি এবং ১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত ঐতিহাসিক ডাকসুর ভিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
ডাকসুর ভিপি থাকাকালীন তিনি সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করেন এবং শেখ মুজিবুর রহমানের ৬ দফাকে ১১ দফায় অন্তর্ভুক্ত করে '৬৯-এর ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেন। তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে রাজপথের আন্দোলনের মুখে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে শেখ মুজিবুর রহমানসহ সব রাজবন্দিকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে (তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান) লাখো জনতার উপস্থিতিতে তিনি বাঙালি জাতির পক্ষ থেকে শেখ মুজিবুর রহমানকে আনুষ্ঠানিকভাবে 'বঙ্গবন্ধু' উপাধিতে ভূষিত করেন।
তোফায়েল আহমেদ ১৯৬৯ সালে ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন এবং ১৯৭০ সালের জুনে আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনে মাত্র ২৭ বছর বয়সে তিনি পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য (এমএনএ) নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি ছিলেন মুজিব বাহিনীর অঞ্চলভিত্তিক দায়িত্বপ্রাপ্ত চার প্রধান অধিনায়কের একজন। তিনি দেশের পশ্চিমাঞ্চলের (বরিশাল, পটুয়াখালী, খুলনা, ফরিদপুর, যশোর, কুষ্টিয়া ও পাবনা) দায়িত্বে ছিলেন।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁকে প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় নিজের রাজনৈতিক সচিব নিয়োগ দেন। ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর তোফায়েল আহমেদকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং দীর্ঘ ৩৩ মাস তিনি কারান্তরালে ছিলেন। কারাগারে থাকা অবস্থাতেই ১৯৭৮ সালে তিনি আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন।
পরবর্তীতে তিনি ১৯৮৬, ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। দেশের সংসদীয় ইতিহাসের ১২টি সাধারণ নির্বাচনের মধ্যে তিনি ৯টিতে বিজয়ী হয়ে সংসদের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তিনি ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী এবং পরবর্তীতে ২০১৪ সালে দ্বিতীয়বারের মতো বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব সফলভাবে পালন করেন। ২০২১ সালে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ার পর তাঁর রাজনৈতিক সক্রিয়তা কিছুটা স্তিমিত হয়ে আসে এবং দীর্ঘ অসুস্থতার পর গতকাল ১ জুন তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।
Comments