১৯ বছর পর বিএনপির বাজেট - উচ্চ প্রত্যাশা,সীমিত সক্ষমতা
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে শুধু বড় বাজেট ঘোষণা করাই যথেষ্ট নয়; বরং সেই বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা, অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহার এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
প্রায় উনিশ বছর আগে,বিএনপি সরকারের অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান ২০০৬-০৭ অর্থবছরের জন্য ৬৯ হাজার ৭৪০ কোটি টাকার জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করেছিলেন। এরপর তিনটি সরকার পরিবর্তনের পর আবারও বিএনপি ক্ষমতায় ফিরে এসেছে জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে। এবার অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী দেশের ৫৪তম বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছেন,যার আকার ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকারও বেশি হতে পারে।
তবে বাজেটের আকার অনেক বড় হলেও অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক-বাজেট-জিডিপি অনুপাত-গত দুই দশকে খুব বেশি পরিবর্তিত হয়নি। ২০০৬-০৭ অর্থবছরে এটি ছিল প্রায় ১২.৬৮ শতাংশ, আর ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তা দাঁড়াতে পারে প্রায় ১৩.৬ শতাংশে। অর্থাৎ দেশের অর্থনীতির আকার বাড়লেও সরকারের রাজস্ব আহরণের সক্ষমতা সেই অনুপাতে শক্তিশালী হয়নি।
ব্যয় বেড়েছে,সংকুচিত হয়েছে আর্থিক সক্ষমতা
গত দুই দশকে দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বড় পরিবর্তন এসেছে। বিদ্যুৎ সুবিধা, গ্রামীণ সড়ক যোগাযোগ, মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যবহার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। পদ্মা সেতু ও ঢাকা মেট্রোরেল-এর মতো বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প মানুষের জীবনযাত্রা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতি এনেছে।
এখন জনগণের প্রত্যাশাও অনেক বেড়েছে। মানুষ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, আধুনিক শিক্ষা, ভালো নগর ব্যবস্থাপনা এবং আরও উন্নত যোগাযোগ অবকাঠামো চায়। ঢাকাবাসী আরও মেট্রোরেল লাইন প্রত্যাশা করছে, অন্যদিকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মহাসড়ক উন্নয়ন, নতুন সেতু ও শিল্পায়নের দাবি বাড়ছে। ফলে সরকারের ব্যয় কাঠামো স্থায়ীভাবে বড় হয়ে গেছে।
কিন্তু একই সময়ে সরকারের আর্থিক পরিসর সংকুচিত হয়েছে। বাজেটের বড় অংশ এখন পরিচালন ব্যয়ে চলে যাচ্ছে। অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধ বেড়েছে, জ্বালানি ও খাদ্য খাতে ভর্তুকির চাপও উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। এর সঙ্গে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের সম্ভাবনাও সরকারের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করছে। ফলে উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের পরিমাণ সীমিত হয়ে পড়ছে।
দুর্বল রাজস্ব ব্যবস্থা ও ব্যাংকিং খাতের সংকট
বাংলাদেশের অন্যতম বড় সমস্যা হলো দুর্বল রাজস্ব আহরণ। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনও সবচেয়ে কমগুলোর একটি। ফলে সরকারকে উন্নয়ন ব্যয় চালাতে বেশি ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
এদিকে ব্যাংকিং খাতেও দীর্ঘদিনের দুর্বলতা অর্থনীতিকে চাপে ফেলেছে। খেলাপি ঋণ বেড়েছে রাজনৈতিক প্রভাব,অনিয়ম, দুর্বল তদারকি এবং ঋণ পুনরুদ্ধারের ব্যর্থতার কারণে। এতে ব্যাংকগুলোর সক্ষমতা কমে গেছে এবং বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
সরকারের ব্যাংক ঋণও বেড়েছে,যার ফলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রাপ্তি কঠিন হয়ে পড়ছে এবং সুদের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। অন্যদিকে দেশের পুঁজিবাজার এখনও অস্থির ও অগভীর,ফলে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য কার্যকর বিকল্প অর্থায়ন তৈরি হয়নি।
দুর্নীতি ও অপচয়:উন্নয়নের বড় বাধা
সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি,ব্যয় বৃদ্ধি এবং অনিয়মের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে। এতে সরকারি ব্যয়ের কার্যকারিতা কমে যাচ্ছে। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রকাশিত বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর একটি শ্বেতপত্রে দাবি করা হয়,আগের বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার হয়ে থাকতে পারে। যদিও এ ধরনের তথ্য নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে, তবে অর্থ পাচার ও দুর্নীতি অর্থনীতির জন্য বড় উদ্বেগ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
বৈশ্বিক সংকটের চাপ
কোভিড-১৯ মহামারি বাংলাদেশের বাণিজ্য,কর্মসংস্থান ও উৎপাদন ব্যবস্থায় বড় ধাক্কা দেয়। পরে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ববাজারে খাদ্য ও জ্বালানির দাম বাড়িয়ে দেয়,যার প্রভাব পড়ে আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের ওপর। ২০২৩ সালের মার্চ থেকে দেশে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে। এতে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
আইএমএফের সংস্কার চাপ ও রাজনৈতিক বাস্তবতা
বাংলাদেশ বর্তমানে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল-এর ঋণ কর্মসূচির আওতায় রয়েছে। এর অংশ হিসেবে কর আদায় বৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাত সংস্কার, ভর্তুকি কমানো, আর্থিক শৃঙ্খলা জোরদার এবং বিনিময় হার আরও নমনীয় করার মতো সংস্কার বাস্তবায়নের চাপ রয়েছে।
এসব পদক্ষেপ দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে সহায়ক হতে পারে। তবে স্বল্পমেয়াদে এগুলোর সামাজিক ও রাজনৈতিক খরচও রয়েছে। ভর্তুকি কমানো বা কর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত জনগণের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করতে পারে।
সরকারের সামনে কঠিন সিদ্ধান্ত
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সীমিত সম্পদ দিয়ে উচ্চ প্রত্যাশার ভার সামলানো। সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে- টাকা বড় অবকাঠামো প্রকল্পে ব্যয় করা হবে,নাকি স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে। সব মিলিয়ে,আসন্ন বাজেট শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়;এটি হবে সরকারের অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি,সুশাসনের প্রতিশ্রুতি এবং সংকট মোকাবিলার সক্ষমতার একটি বড় পরীক্ষা।
Comments