কাঁটাতারের বেড়া ও বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত আবারও আলোচনায়। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় এসে প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েই শুভেন্দু অধিকারীর সীমান্তে নতুন করে কাঁটাতারের বেড়া বসানোর ঘোষণা, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।
ভারতের দাবি-বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অনুপ্রবেশ, চোরাচালান ও সীমান্ত অপরাধ ঠেকাতেই এই পদক্ষেপ। অন্যদিকে বাংলাদেশে অনেকের প্রশ্ন-এই বেড়া কি শুধুই নিরাপত্তার জন্য, নাকি এর পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক বার্তা?
একটু জানার চেষ্টা করবো -
• বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়ার ইতিহাস।
• কেন ভারত এই বেড়া দিতে চায়?
• ১৫০ গজের বিতর্ক কী?
• ফেলানি হত্যাকাণ্ড কেন আজও গুরুত্বপূর্ণ?
• আর নতুন করে বিজেপি সরকারের এই পদক্ষেপ দুই দেশের সম্পর্কে কী প্রভাব ফেলতে পারে?
সীমান্তে কাঁটাতারের ইতিহাস
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত পৃথিবীর অন্যতম দীর্ঘ স্থলসীমান্ত। প্রায় চার হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ এই সীমান্তের অনেক অংশই নদী, গ্রাম, কৃষিজমি ও জনবসতিপূর্ণ এলাকায় অবস্থিত। এই সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার চিন্তা নতুন নয়। বাংলাদেশ যখন পূর্ব পাকিস্তান ছিল, তখন থেকেই ভারতের আসামে "অবৈধ অনুপ্রবেশ" নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়।
বিশেষ করে আসামের বিভিন্ন আঞ্চলিক সংগঠন ও রাজনৈতিক দল দাবি তুলেছিল-পূর্ব পাকিস্তান, পরে বাংলাদেশ থেকে মানুষের প্রবেশ ঠেকাতে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ শক্ত করতে হবে। এরই ধারাবাহিকতায়, ১৯৮৫ সালের আসাম চুক্তির পর ভারত সরকার সিদ্ধান্ত নেয়-বাংলাদেশ সীমান্তের বড়ো অংশ জুড়ে কাঁটাতারের বেড়া বসানো হবে।
১৯৮৯ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু হয়। একই সময় পাকিস্তান সীমান্তেও ভারত একই ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করছিল। ভারতের যুক্তি ছিল পরিষ্কার- সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশ, চোরাচালান, জাল নোট ও জঙ্গি কার্যকলাপ ঠেকাতে এই বেড়া দরকার।
১৫০ গজের জটিলতা
এখন প্রশ্ন হলো-বেড়া বসানো নিয়ে এত বিতর্ক কেন? এর উত্তর লুকিয়ে আছে ১৯৭৫ সালের ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত সমঝোতায়। সেই চুক্তি অনুযায়ী, সীমান্তের জিরো লাইন থেকে ১৫০ গজের মধ্যে কোনো পক্ষ "প্রতিরক্ষা সক্ষমতা" আছে এমন স্থাপনা তৈরি করতে পারবে না। এমনকি উন্নয়নমূলক স্থাপনা করতেও অপর পক্ষের সম্মতি প্রয়োজন।
সমস্যা হলো-অনেক সীমান্ত এলাকায় ভারতের পক্ষে ১৫০ গজ দূরে গিয়ে কার্যকরভাবে বেড়া বসানো সম্ভব হয়নি। কারণ তাতে অনেক জায়গায় ভারতীয় ভূখণ্ডের বড়ো অংশ বেড়ার বাইরে পড়ে যায়। ভারত দাবি করে-কাঁটাতারের বেড়া কোনো সামরিক স্থাপনা নয়। এটি শুধু সীমান্ত অপরাধ ঠেকানোর ব্যবস্থা। কিন্তু বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে এই ব্যাখ্যার সঙ্গে পুরোপুরি একমত ছিল না।
ফলে সীমান্তের বিভিন্ন এলাকায় উত্তেজনা ও সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে।
ফেলানি হত্যাকাণ্ড ও জনমত
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে কাঁটাতারের আলোচনা এলেই একটি নাম সামনে আসে-ফেলানি খাতুন। ২০১১ সালের জানুয়ারিতে কুড়িগ্রামের কিশোরী ফেলানি সীমান্ত পার হওয়ার সময় বিএসএফের গুলিতে নিহত হন। এরপর তার মরদেহ কাঁটাতারের বেড়ায় ঝুলে থাকার ছবি পুরো বাংলাদেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল।
সেই ছবি শুধু একটি মৃত্যুর প্রতীক ছিল না- এটি সীমান্তে মানবাধিকার প্রশ্ন, সীমান্ত হত্যা এবং ভারতীয় সীমান্ত নীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভের প্রতীক হয়ে ওঠে। বাংলাদেশে তখন ব্যাপক প্রতিবাদ হয়েছিল। এমনকি ভারতের ভেতরেও মানবাধিকারকর্মী ও নাগরিক সমাজের একাংশ সীমান্তে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ ও বেড়া নীতির সমালোচনা করেছিল। ফেলানির ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে-কাঁটাতারের বেড়া সীমান্তে নিরাপত্তা বাড়ালেও মানবিক সংকটও তৈরি করেছে।
বাংলাদেশের অবস্থান
বাংলাদেশের বিভিন্ন সরকার সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নিয়ে প্রায় একই ধরনের অবস্থান নিয়েছে। জেনারেল এরশাদ, খালেদা জিয়া কিংবা শেখ হাসিনার সরকার-কেউই প্রকাশ্যে তীব্র বিরোধিতা করেনি। আবার পুরোপুরি সমর্থনও দেয়নি।
তবে ২০০৯ সালের পর আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে কিছু এলাকায় ভারতকে জিরো লাইনের কাছাকাছি অবকাঠামো নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। এতে ভারতের জন্য বেড়া নির্মাণ সহজ হয়। বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থান ছিল অনেকটা এমন-দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে, তবে সীমান্তে উত্তেজনাও বাড়ানো যাবে না।
নতুন করে বিজেপি সরকারের উদ্যোগ
এখন আবার নতুন করে বিষয়টি সামনে এসেছে। শুভেন্দু অধিকারীর ঘোষণা অনুযায়ী, সীমান্তে নতুন করে কাঁটাতারের বেড়া বসানোর জন্য ৪৫ দিনের মধ্যে বিএসএফকে জমি হস্তান্তরের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিজেপি দীর্ঘদিন ধরেই "অবৈধ অনুপ্রবেশ" ইস্যুকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করে আসছে।
বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে এই ইস্যু তাদের নির্বাচনি রাজনীতির বড়ো অংশ।
তাই অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন-এই উদ্যোগ শুধু নিরাপত্তা নয়, রাজনৈতিক বার্তাও বহন করছে। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার মনে করে সীমান্তে কঠোর নজরদারি জাতীয় নিরাপত্তার জন্য জরুরি। কিন্তু সমালোচকরা বলছেন, এতে দুই দেশের মানুষের মধ্যে দূরত্ব আরও বাড়তে পারে।
শেষ কথা
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক একদিকে যেমন : সহযোগিতার, অন্যদিকে তেমনি সংবেদনশীল। সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া সেই সম্পর্কেরই এক জটিল প্রতীক। কারও কাছে এটি নিরাপত্তা ব্যবস্থা, কারও কাছে এটি বিভাজনের দেয়াল। প্রশ্ন হলো-নতুন করে এই উদ্যোগ কি সীমান্ত অপরাধ কমাবে?
নাকি দুই দেশের মধ্যে নতুন উত্তেজনার জন্ম দেবে? এখন দেখার বিষয়, বাংলাদেশ সরকার এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কী প্রতিক্রিয়া জানায়, এবং বাস্তবে সীমান্ত পরিস্থিতি কোন দিকে যায়।
Comments