বিশ্বকে শাসন করা বাদ দিয়ে আমেরিকার উচিত নিজের ঘরে তাকানো
বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র নিঃসন্দেহে সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তির শীর্ষে অবস্থান করছে। উন্নত প্রযুক্তি, বিপুল সম্পদ এবং বৈশ্বিক প্রভাব-সব মিলিয়ে দেশটি দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে 'বিশ্বনেতা' হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই নেতৃত্ব কি সত্যিই বিশ্বকে স্থিতিশীল করেছে, নাকি নতুন সংকটের জন্ম দিয়েছে?
সাম্প্রতিক দশকগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের বহু সামরিক হস্তক্ষেপই প্রত্যাশিত ফল বয়ে আনতে পারেনি। আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া কিংবা সিরিয়া-প্রতিটি ক্ষেত্রেই ঘোষিত লক্ষ্য ছিল স্থিতিশীলতা, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা বা সন্ত্রাস দমন। বাস্তবে দেখা গেছে, এসব দেশ আজও অস্থিরতা, সহিংসতা এবং ভঙ্গুর রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধের ময়দানে সাময়িক বিজয় সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক সমাধান প্রতিষ্ঠা করা যায়নি।
ইতিহাসও একই শিক্ষা দেয়। ভিয়েতনাম যুদ্ধ থেকে শুরু করে লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে হস্তক্ষেপ—প্রতিটি ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। তবুও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে যেন সেই অভিজ্ঞতা থেকে শেখার প্রবণতা কম। বরং নতুন নতুন অজুহাতে সামরিক শক্তির ব্যবহার অব্যাহত রয়েছে।
এই ধারাবাহিক হস্তক্ষেপের পেছনে অনেকেই সামরিক-শিল্প জোটের প্রভাবের কথা উল্লেখ করেন। যুদ্ধ মানেই বিপুল অর্থনৈতিক কার্যক্রম-অস্ত্র উৎপাদন, সরবরাহ এবং পুনর্গঠন প্রকল্প। ফলে কিছু শক্তিশালী গোষ্ঠী এই যুদ্ধাবস্থার ধারাবাহিকতা থেকে লাভবান হয়। এর ফলে কূটনৈতিক সমাধানের চেয়ে সামরিক পদক্ষেপই অনেক সময় বেশি গুরুত্ব পায়।
অন্যদিকে, যে দেশগুলোতে এই হস্তক্ষেপ চালানো হয়, তাদের নিজস্ব ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সামাজিক বাস্তবতাকে প্রায়ই উপেক্ষা করা হয়। গণতন্ত্র বা সংস্কার কোনো বাহ্যিক শক্তি দিয়ে চাপিয়ে দেওয়া যায় না; এগুলো একটি দেশের ভেতর থেকেই বিকশিত হতে হয়। বাহ্যিক চাপ অনেক সময় উল্টো প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে এবং দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতার জন্ম দেয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই বৈদেশিক অভিযানের খরচ শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। যুক্তরাষ্ট্র নিজেও বিপুল অর্থনৈতিক চাপ ও মানবিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয়, হাজার হাজার সেনার প্রাণহানি-এসবের পাশাপাশি দেশের ভেতরে রয়েছে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, অবকাঠামো ও দারিদ্র্যসংক্রান্ত গুরুতর সমস্যা। অথচ এসব সমস্যার সমাধানে পর্যাপ্ত মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে না।
বিশ্বকে 'শাসন' করার এই প্রবণতা থেকে সরে এসে যুক্তরাষ্ট্রের উচিত নিজের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতার দিকে মনোযোগ দেওয়া। একটি দেশের প্রকৃত শক্তি তার জনগণের কল্যাণ, সামাজিক স্থিতি এবং অর্থনৈতিক সাম্যের ওপর নির্ভর করে। বিশ্বমঞ্চে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তা হতে হবে সহযোগিতা ও কূটনীতির ভিত্তিতে, সামরিক আগ্রাসনের মাধ্যমে নয়।
অতএব, সময় এসেছে নীতির পুনর্মূল্যায়নের। বিশ্বকে বদলানোর আগে নিজেদের ঘর গুছানোই হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত এবং টেকসই পথ।
Comments