ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বৃদ্ধি: নেপথ্যে অভ্যন্তরীণ বিভেদ ও সামরিক সংকট
মধ্যপ্রাচ্যে চরম উত্তেজনার মাঝে ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মঙ্গলবার বিকেলে হোয়াইট হাউসে জাতীয় নিরাপত্তা দলের সঙ্গে এক জরুরি বৈঠকের পর তিনি এই সিদ্ধান্ত নেন। একইসঙ্গে দ্বিতীয় দফার শান্তি আলোচনায় অংশ নিতে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের পাকিস্তান সফর আপাতত বাতিল করা হয়েছে।
সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দ্বিতীয় দফার আলোচনার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে চুক্তির কিছু শর্তাবলি আগেই পাঠিয়েছিল। তবে তেহরানের পক্ষ থেকে কোনো সাড়াশব্দ না মেলায় অনিশ্চয়তায় পড়ে ট্রাম্প প্রশাসন। মঙ্গলবার বিকেলে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সকে বহনকারী বিমানটি অ্যান্ড্রিউজ বিমানঘাঁটির টারম্যাকে অপেক্ষমাণ থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা আর ইসলামাবাদের উদ্দেশ্যে উড়াল দেয়নি।
যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর ঘোষণা দিয়ে নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ ট্রাম্প লিখেছেন, ইরান সরকার বর্তমানে 'মারাত্মকভাবে বিভক্ত'। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা ও পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের তথ্য অনুযায়ী, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও আলোচনার সীমারেখা নিয়ে নতুন ইরানি সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির স্পষ্ট নির্দেশনার অভাবে দেশটির কর্মকর্তাদের মধ্যে ঐকমত্যের অভাব দেখা দিয়েছে। ট্রাম্প মনে করেন, সামরিক হামলার চেয়ে আলোচনার জন্য সময় বাড়ানোই এখন কৌশলগতভাবে সঠিক।
এদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বিবিসি-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আলোচনার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের 'সদিচ্ছার অভাব' ও 'অসৎ উদ্দেশ্য'কে দায়ী করেছেন। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক হুমকি—ইরান প্রস্তাব না মানলে দেশটির 'প্রতিটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও সেতু ধ্বংস' করে দেওয়ার কথা উল্লেখ করে বাঘাই বলেন, ওয়াশিংটন বারবার তাদের অবস্থান পরিবর্তন করছে।
ইরানপন্থী মিলিশিয়াদের দমনে বাগদাদ সরকারকে চাপে ফেলতে ইরাকে ডলার সরবরাহ স্থগিত করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, ফেডারেল রিজার্ভে থাকা ইরাকের নিজস্ব ৫০০ মিলিয়ন ডলারের চালান আটকে দিয়েছে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ। অন্যদিকে, ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) সতর্ক করেছে যে, প্রতিবেশী দেশগুলোর ভূখণ্ড ব্যবহার করে ইরানে হামলা চালানো হলে পুরো মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদন ব্যবস্থা বন্ধ করে দেওয়া হবে।
তীব্র বাগাড়ম্বর থাকলেও পর্দার আড়ালে মার্কিন সামরিক মজুত নিয়ে উদ্বেগের খবর প্রকাশ করেছে 'দ্য হিল'। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, 'অপারেশন এপিক ফিউরি'র ফলে যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মজুতে বড় ধরনের টান পড়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, একদিকে ইরানি নেতৃত্বের অভ্যন্তরীণ জটিলতা এবং অন্যদিকে নিজেদের অত্যাধুনিক মিসাইলের মজুত কমে আসা—এই দুই কারণেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আপাতত সরাসরি যুদ্ধের পথে না গিয়ে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়িয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স, বিবিসি, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, আল জাজিরা ও দ্য হিল।
Comments