কী ঘটেছে ট্রাইব্যুনালের ভেতরে ইউনূস-আসিফ নজরুল জামানায়?
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) সাবেক প্রসিকিউটর সাইমুম রেজা তালুকদারের বিরুদ্ধে কোটি টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি। জুলাই হত্যা মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সাবেক এমপি ফজলে করিমের স্ত্রীর কাছে এই টাকা চাওয়া হয়েছিল। মঙ্গলবার নিজ কার্যালয়ে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেছেন, "প্রসিকিউটর সাইমুম রেজা তালুকদার ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলার আসামি ফজলে করিম চৌধুরীকে খালাস করিয়ে দেওয়ার আশ্বাসে তার স্ত্রীর কাছে এক কোটি টাকা ঘুষ চান। সেই ঘুষ চাওয়ার অডিওটি মিডিয়ায় ফাঁস হওয়ার পর আমরা এই ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি গঠন করে তদন্ত শুরু করি।"
বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার ইতিহাসে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বরাবরই একটি সংবেদনশীল ও বিতর্কিত প্রতিষ্ঠান। যুদ্ধাপরাধের বিচার থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সহিংসতার অভিযোগ—সবকিছুতেই এই ট্রাইব্যুনালকে ঘিরে জনমনে যেমন উচ্চ প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তেমনি প্রশ্ন ও সংশয়ও কম নয়। যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়া এবং রায় নিয়ে অতীতেও অনেক প্রশ্ন ছিল।
অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে এই ট্রাইব্যুনালকে কেন্দ্র করে যে ঘটনাপ্রবাহ ঘটেছে, তা বিচারব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল সাবেক সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা ও আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে কথিত 'জুলাই গণহত্যা' মামলায় দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন করে রায় দেওয়া। বাংলাদেশের বিচার ইতিহাসে এত দ্রুততার সঙ্গে প্রসিকিউশনের তদন্ত শেষ করার নজির প্রায় নেই। সাধারণত আন্তর্জাতিক মানের অপরাধ তদন্তে দীর্ঘ সময় লাগে। প্রমাণ সংগ্রহ, সাক্ষী সুরক্ষা, ফরেনসিক বিশ্লেষণ এবং আইনি যাচাই-বাছাইয়ের মতো জটিল প্রক্রিয়ার কারণেই সময় নিতে হয়। কিন্তু এই ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক দ্রুততা অনেকের মনে প্রশ্ন জাগিয়েছে: বিচার কি সত্যিই নিরপেক্ষভাবে হয়েছে, নাকি এর পেছনে রাজনৈতিক তাড়াহুড়ো ছিল?
এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন ট্রাইব্যুনালের তৎকালীন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। অন্তর্বর্তী সরকার তাঁকে এই গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেয়। কিন্তু নিয়োগের সময় থেকেই আইন অঙ্গনে তাঁর নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কারণ, অতীতে তিনি ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত জামায়াতে ইসলামীর বেশ কয়েকজন নেতার আইনজীবী ছিলেন। একই আদালতে আসামির আইনজীবী থেকে তিনি হয়ে গেলেন বাদীপক্ষের প্রধান আইনজীবী। আইনের দৃষ্টিতে কোনো আইনজীবীর অতীত পেশাগত ভূমিকা তাকে অযোগ্য করে না, কিন্তু এমন সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানে 'স্বার্থের সংঘাত' (Conflict of Interest) এড়িয়ে চলাই আন্তর্জাতিক মানদণ্ড। তা সত্ত্বেও তৎকালীন আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল এবং সরকার এই উদ্বেগকে গুরুত্ব দেয়নি।
এর পরবর্তী ঘটনাগুলো আরও উদ্বেগজনক। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর নতুন সরকার ট্রাইব্যুনালে পরিবর্তন আনে এবং চিফ প্রসিকিউটরের পদ থেকে তাজুল ইসলামকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। কিন্তু তাঁর বিদায়ের দিনই ট্রাইব্যুনালের আরেক প্রসিকিউটর বি এম সুলতান মাহমুদ গুরুতর অভিযোগ তোলেন। তাঁর দাবি, চিফ প্রসিকিউটরের চেয়ারকে অর্থ উপার্জনের হাতিয়ারে পরিণত করেছিল তাজুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন একটি সিন্ডিকেট। এই অভিযোগ শুধু ব্যক্তিগত দুর্নীতির প্রশ্নই তোলে না, বরং পুরো প্রসিকিউশন কাঠামোর নৈতিক ভিত্তিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।
অন্যদিকে তাজুল ইসলামের পাল্টা বক্তব্যও কম বিস্ফোরক নয়। তিনি দাবি করেন, প্রসিকিউটর বি এম সুলতান মাহমুদের বিরুদ্ধে তিনি আগেই ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। তাঁর অভিযোগ অনুযায়ী, সুলতান মাহমুদ বিশ্বাসভঙ্গ, শৃঙ্খলাভঙ্গ, নিরাপত্তা প্রহরীকে মারধর এবং পারিবারিক সহিংসতার মতো বিভিন্ন আচরণবিধি লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এ বিষয়ে তিনি সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলকে ১১ জানুয়ারি একটি চিঠিও পাঠিয়েছিলেন। যদি এই দাবি সত্য হয়, তবে প্রশ্ন উঠবে—কেন সেই অভিযোগের যথাযথ তদন্ত বা ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি?
এরই মধ্যে আরও একটি গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। একটি সংবাদ প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর সাইমুম রেজা কারাবন্দী এক সাবেক আওয়ামী লীগ নেতাকে জামিনে মুক্তি পাইয়ে দেওয়ার জন্য তাঁর পরিবারের কাছে এক কোটি টাকা দাবি করেছিলেন।
সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে—ট্রাইব্যুনালের ভেতরে ইউনূস-আসিফ নজরুলের জামানায় আসলে ঘটেছিল কী? সংশ্লিষ্টরা কি প্রকৃত বিচারিক কাজ করেছেন, নাকি আখের গোছাতে আর ক্ষমতা চর্চায় লিপ্ত ছিলেন?
এই সব ঘটনাকে একত্রে বিবেচনা করলে একটি বড় প্রশ্ন সামনে আসে: এমন একটি প্রসিকিউশন টিমের ওপর ভরসা করে দেওয়া রায় কতটা গ্রহণযোগ্য? বিচারব্যবস্থার মূল শক্তি হলো জনগণের আস্থা। যদি সেই আস্থা নষ্ট হয়ে যায়, তবে বিচারিক রায় আইনি দৃষ্টিতে বৈধ হলেও নৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মতো প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই আস্থার গুরুত্ব আরও বেশি; কারণ এখানে বিচার হয় ইতিহাস, মানবাধিকার এবং রাষ্ট্রের নৈতিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নে।
বাংলাদেশে আইসিটি প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য ছিল ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী বার্তা দেওয়া। কিন্তু যদি সেই প্রতিষ্ঠানের ভেতরেই দুর্নীতি, ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব এবং রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ ওঠে, তবে পুরো প্রক্রিয়াই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। শুধু একটি রায় নয়, বরং সেই রায়ের পেছনের তদন্ত, সাক্ষ্য এবং আইনি প্রক্রিয়া—সবকিছুই তখন সন্দেহের মুখে পড়ে।
অতএব, বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে জরুরি হলো স্বচ্ছ ও স্বাধীন তদন্ত। ট্রাইব্যুনালের ভেতরে ওঠা সব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত এবং প্রয়োজনে পুরো প্রসিকিউশন কাঠামো পুনর্গঠন করা দরকার। বিচার শুধু হওয়াই যথেষ্ট নয়; বিচার হতে হবে এমনভাবে, যাতে তা নিয়ে কোনো যুক্তিসঙ্গত সন্দেহ না থাকে। অন্যথায়, ন্যায়বিচারের পরিবর্তে ইতিহাসে এটি আরেকটি বিতর্কিত অধ্যায় হিসেবেই থেকে যাবে।
Comments