আগের সরকারের টিকার গাফিলতিতে শিশু মৃত্যুর মিছিল
হাম ও হা্মের উপসর্গ নিয়ে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছেই। আজ যখন এ কথাগুলো বলছি, তখন পত্রিকায় ছাপা হয়েছে যে, দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে একটি শিশুর হামে মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। বাকি দুই শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে। মৃত্যু যেভাবে বাড়ছে, তাতে মনে হয় খুব শীঘ্রই তা দু-শো ছুঁয়ে যাবে।
বাংলাদেশে মানুষের মৃত্যু কোনো বিষয়ই নয় এখন আর। হিংস্রতার চর্চায় মানুষের মৃত্যুতে সংবেদনশীল হওয়া সমাজ থেকে চলে গেছে বা তাড়ানো হয়েছে। এখন শিশু মৃত্যুর বেলায়ও মনে হচ্ছে আমরা তেমনই আচরণ করছি। কোথাও সেভাবে কোনো সাড়া নেই। এমনকি জাতীয় সংসদেও একটি পুরো দিন এ নিয়ে আলোচনা হলো না এখন পর্যন্ত।
পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে দেশে হামের প্রাদুর্ভাব বিপজ্জনক চেহারা নিয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, হামের উপসর্গ নিয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৬৬৬ শিশু এবং হাম শনাক্ত হয়েছে ৭৬ জনের।
অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব ও তথ্য অনুসারে, বাংলাদেশে গত দেড় দশকে হামে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা ছিল খুবই নগণ্য। এমন কী ঘটল যে, আকস্মিকভাবে এত শিশু হামে আক্রান্ত হতে শুরু করল এবং তা শিশুমৃত্যুর মতো দুঃখজনক পরিস্থিতির দিকে মোড় নিল?
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা লক্ষ্য করেছেন, বেশ কিছুদিন ধরে টিকা কার্যক্রমের গাফিলতির ভয়াবহ পরিণাম হামের এই প্রকট প্রাদুর্ভাব। এই টিকা কেনা নিয়ে অধ্যাপক ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অহেতুক ও অপ্রত্যাশিত জটিলতা তৈরি হয়। সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সে সময়ে যাঁরা জড়িত ছিলেন, তাঁদের দূরদর্শিতা ও সক্রিয়তার অভাবে শিশুদের টিকা কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। সঠিক সময়ে টিকা মজুত না করায় অসংখ্য শিশু যথাযথ বয়সে প্রয়োজনীয় টিকা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
বলা যায়, বর্তমান সরকার-এ পরিস্থিতির ভিকটিম, দায়ী করতে হবে আগের সরকারকে। কারণ হাম ও রুবেলার টিকার অব্যবস্থা ও অপ্রাপ্যতা সেই সরকারই সৃষ্টি করে গেছে।
চিকিৎসকেরা বলছেন, হামের উপসর্গ নিয়ে যে-সব শিশু এবার হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে, তার বড়ো অংশের বয়স ৯ মাসের কম। টিকার সূচি অনুযায়ী ৯ মাসের আগে কোনো শিশুকে হামের টিকা দেওয়া হয় না। তবে এ প্রশ্ন তুলে আগের সরকারকে দায়ভার থেকে মুক্তি দেওয়ার সুযোগ নেই। কেননা, যে-সব শিশুকে ছয় মাস বয়স থেকে ছয় মাস পর পর ভিটামিন 'এ' দেওয়া হয়, তাদের হামে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা কমে যায়। শিশুর শরীরে ভিটামিন 'এ'র মজুত পর্যাপ্ত থাকলে হাম তাদের সহজে কাবু করতে পারে না। তাদের অন্য কিছু রোগ প্রতিরোধের শক্তিও বেড়ে যায়। কিন্তু ভিটামিন 'এ'র ঘাটতি থাকলে হামে আক্রান্ত শিশুর নিউমোনিয়া, ডায়রিয়াসহ অন্যান্য নানা রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়, যার পরিণতি মৃত্যু পর্যন্ত গড়াতে পারে।
আমাদের শিশুরা ২০২৪ সালের জুন মাসের পর থেকে নিয়মিত ছয় মাসের ব্যবধানে ভিটামিন 'এ'র টিকা দুর্ভাগ্যজনকভাবে আর পাচ্ছে না। ২০২৪ সালের জুনের পর তারা ভিটামিন 'এ' পেয়েছে ২০২৫ সালের মার্চ মাসে, অর্থাৎ ছয় মাসের বদলে ৯ মাস পর। এরপর আবার এ পর্যন্ত প্রায় ১৩ মাস এই টিকা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে আরেকটি বড়ো সমস্যা হলো ২০২৪ এর ৫ আগস্টের পর কমিউনিটি ক্লিনিকের কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। ফলে শিশুরা প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবাও পাচ্ছে না। সবমিলিয়ে এসব কারণে হাম এবার এতটা তীব্র চেহারা নিয়েছে।
সম্প্রসারিত টিকা কার্যক্রমের মাধ্যমে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মহলে অনন্য এক নজির স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিল। অতীতে সব রাজনৈতিক সরকারই টিকা কার্যক্রমকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছিল। বাংলাদেশে সাধারণ মানুষও টিকা নেওয়ার ক্ষেত্রে সাড়া দিয়ে এসেছে অসম্ভব উৎসাহের সঙ্গে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এত দিনের সফল এই কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। বেসরকারি ও উন্নয়ন সহযোগীদের উপর্যুপরি তাগাদাকে তারা কিছুমাত্র আমলে নেয়নি। এরই নিদারুণ খেসারত এখন দিতে হচ্ছে আমাদের অসহায় শিশুদের।
সর্বশেষ জানা গেল, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য বিষয়ক উপদেষ্টা ডাক্তার জাহেদ বলেছেন, হাম আক্রান্ত হয়ে একের পর এক শিশু মৃত্যুর ঘটনায় সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টা এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিরুদ্ধে ব্যর্থতা ও অনিয়মের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সবার প্রত্যাশা বিষয়টি যেন শুধু কথার কথা না থাকে, তদন্ত যেন হয়।
Comments