আহসান মনসুর যেসব ভুল করে গেছেন
অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে ব্যাংকিং রেজল্যুশন অধ্যাদেশের মাধ্যমে পাঁচটি দুর্বল ব্যাংককে একীভূত করে গঠিত 'সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক'-কে পুরোনো মালিকদের হাতে, বিশেষত এস আলমের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া নিয়ে চলছে আলোচনা, সমালোচনা।
শেখ হাসিনার শাসনামলে এস আলম ব্যাংকিং খাত থেকে প্রায় ১ লক্ষ কোটি টাকা লুট করেছে বলে অভিযোগ আছে। সেই এস আলমকেই এসব লুট করা ব্যাংক ফিরিয়ে দেওয়া নিয়েই সমালোচনা বেশি।
কিন্তু সমস্যাটা কি এই সরকার সৃষ্টি করছে বলে মনে হয়? বিষয়টা এতো সরল নয়। বাস্তবতা হলো, বিশ্বব্যাংকসহ অনেক অর্থনীতিবিদের পরামর্শ উপেক্ষা করে অন্তর্বর্তী সরকারের কেন্দ্রীয় ব্যাংক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর তার ব্যক্তিগত ইগোর কারণে দেউলিয়া ব্যাংকগুলোকে রাষ্ট্রীয়করণ করে একটি সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক করতে গেছেন। এর অর্থ হলো ব্যাংক লুটের দায় বাংলাদেশের জনগণের ওপর ও বাজেটের ওপর চাপিয়ে দিলেন আহসান মনসুর। আর সে কারণেই বর্তমান সরকার এ অবস্থা থেকে রাজস্ব খাত ও মূল্যস্ফীতিকে রক্ষা করতে এই অধ্যাদেশে কিছু সংশোধনী এনেছে।
ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নেওয়া অনেক আইনের একটি ছিল ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ ২০২৫। পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করে, এই ব্যাংকগুলোকে ধ্বংসের জন্য দায়ী পরিচালকদের কাছ থেকে মালিকানা সরিয়ে দেওয়া। এই পাঁচটা ব্যাংকই দেউলিয়া। ব্যাংকগুলোর নেট অ্যাসেট ভ্যালু নেগেটিভ এবং অ্যাকাউন্টিং ইকুইটি শূন্য। অর্থাৎ এই ব্যাংকগুলোর সম্পদের থেকে দেনা বেশি। ফলে আহসান এইচ মনসুর সাহেব যখন এই পাঁচটা ব্যাংককে একীভূত করে বাংলাদেশের প্রথম সরকারি মালিকানাধীন রাষ্ট্রায়ত্ত ইসলামী ব্যাংক তৈরি করলেন, তখন তিনি মূলত কিছু দেউলিয়া ব্যাংককে রাষ্ট্রায়ত্ত করলেন। এর মাধ্যমে তিনি লুট হওয়া ব্যাংকগুলোর ৭৫ লাখ আমানতকারীর ১ লক্ষ ৪২ হাজার কোটি টাকা ডিপোজিট পরিশোধের দায় রাষ্ট্রের ওপর চাপিয়ে দিলেন।
এই এক লক্ষ ৪২ হাজার কোটি টাকার ডিপোজিটের বিপরীতে রয়েছে ১ লক্ষ ৯৩ হাজার কোটি টাকার ঋণ, যার ৯০ শতাংশই এখন খেলাপি। ফলে এই ঋণ পুনরুদ্ধার না করে এই দেড় লক্ষ কোটি টাকা পরিশোধ করতে ইন্টেরিম আমলেই ৩৫ হাজার কোটি টাকা ছাপাতে হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও হয় টাকা ছাপিয়ে নয়তো বাজেট থেকে প্রায় ১ লক্ষ কোটি টাকার বেশি জনগণকে পরিশোধ করতে হবে। তাই ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ ২০২৫ ছিল একজন ভারসাম্যহীন গভর্নরের সীমাহীন ক্ষমতা প্রদর্শনের নিদর্শন।
বিভিন্ন ব্যাংকের চাঁদায় গড়ে ওঠা আমানত বিমা ট্রাস্ট তহবিল থেকে একটি স্কিমের অধীনে আমানতকারীদের দুই লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত দেওয়া হচ্ছে। এই তহবিল মানুষ ব্যাংকে যে অর্থ রাখে তার ওপর ব্যাংক যে ফি রাখে, সেখান থেকে কেটে নিয়ে ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা রাখে। অর্থাৎ, এই দেউলিয়া ব্যাংকগুলোর টাকা ফেরত দেওয়ার প্রতিটি টাকা জনগণের কাছ থেকেই কেটে নেওয়া হচ্ছে।
অর্থমন্ত্রীর সংসদে রাখা বক্তব্য অনুসারে, এই অর্থ পরিশোধ করতে সরকার ইতোমধ্যে ৮০ হাজার কোটি টাকার বেশি পরিশোধ করেছে এবং ভবিষ্যতে আরও ১ লক্ষ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হবে। তারেক রহমানের সরকার যদি ইউনূস সরকারের নীতি চালু রাখে, তবে এই লুটে ধ্বংস হওয়া ব্যাংকগুলোকে রিকভার করতে যে অর্থ দিতে হবে, তা সরকারের আয়ের ২৫ শতাংশ যা জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ। যা বর্তমান পরিস্থিতিতে এই সরকার কোনোভাবেই পারছে না।
ফলে সরকার মনে করেছে, মোটামুটি বেস্ট অপশন হলো পুরোনো মালিকদের জন্য ব্যাংকগুলো ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া তৈরি করা এবং তাদেরকে কিছু কঠিন শর্ত দেওয়া। এসব শর্ত মেনে কেউ যদি ব্যাংকগুলো কিনতে আসে তবে তাকে রেজল্যুশনের উপধারা (৩) অনুযায়ী সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া অর্থের সাড়ে ৭ শতাংশ পরিশোধ করে বাকি ৯২.৫ শতাংশ অর্থ দুই বছরের মধ্যে ১০ শতাংশ সরল সুদসহ ফেরত দিতে হবে।
এক্সিম ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডাররা তাদের ব্যাংকের মালিকানা ফেরত নিতে আগ্রহী হবে বলেই মনে হচ্ছে। মার্জারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়ে এক্সিমের এনপিএল ছিল ২৮ শতাংশ এবং ইকুইটি ঘাটতি ৮০০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ, পুঁজি বাড়িয়ে এই ব্যাংককে বাঁচানো যেতো।
কিন্তু এক্সিম, সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, ইউনিয়ন ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংককে একীভূত করে 'সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক' নামের প্রতিষ্ঠানটিকে আবার অর্থায়ন করার যে আইন অন্তর্বর্তী সরকার করেছে তা ছিল চরম হঠকারিতা। গরিব মানুষের পকেট কেটে, মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে, জনগণের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা নিয়ে, আরও ১ লক্ষ কোটি টাকা পরিশোধ করার মাধ্যমে শেখ হাসিনার লুট হওয়া ব্যাংকের ডিপোজিটর বেইলআউটের এই চিন্তাটাই ছিল সবচেয়ে খারাপ ভাবনা।
Comments