হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে পেট্রোইউয়ান বনাম ডলার 'মুদ্রাযুদ্ধ'
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের আবহে বিশ্ব অর্থনীতি যখন টালমাটাল, তখনই বিশ্ববাজারে মার্কিন ডলারের একাধিপত্য বা 'পেট্রোডলার' ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে ইরান ও চীন। হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই 'মুদ্রাযুদ্ধ' বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদী পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিশ্বের মোট তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সরবরাহ হয় কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে। এতদিন এই বাণিজ্যের প্রায় ৮০ শতাংশ লেনদেন হতো ডলারে। তবে আলজাজিরার বিশ্লেষণ বলছে, ইরান এখন এই প্রণালি অতিক্রমকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর কাছ থেকে চীনা মুদ্রা ইউয়ানে ট্রানজিট ফি বা টোল আদায় করছে।
সম্প্রতি চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। জিম্বাবুয়েতে ইরানি দূতাবাস সামাজিক মাধ্যমে ঘোষণা দিয়েছে যে, তেলের বাজারে এখন 'পেট্রোডলার'-এর বদলে 'পেট্রোইউয়ান' প্রতিষ্ঠার সময় এসেছে। আইএমএফ-এর সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ কেনেথ রোগফ একে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইরানের সরাসরি চ্যালেঞ্জ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
এই নতুন ব্যবস্থার ফলে বেইজিং ও তেহরান উভয়ই কৌশলগত সুবিধা পাচ্ছে: ইউয়ানে লেনদেনের ফলে দুই দেশই মার্কিন আর্থিক নিষেধাজ্ঞা পাশ কাটিয়ে বাণিজ্য চালিয়ে যেতে পারছে। ইরান থেকে রপ্তানি হওয়া তেলের প্রায় ৮০ শতাংশই কেনে চীন। ইউয়ানে লেনদেনের ফলে চীন যেমন ছাড়ে তেল পাচ্ছে, ইরানও বিনিময়ে চীন থেকে প্রয়োজনীয় শিল্প যন্ত্রপাতি ও ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম অনায়াসেই আমদানি করতে পারছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, চীন মূলত একটি 'বহুকেন্দ্রিক আর্থিক বিশ্ব' গড়তে চায়, যেখানে ডলারের একচ্ছত্র আধিপত্য থাকবে না।
সংঘাতের উত্তেজনার মাঝেও ইরান চীনে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করে চলেছে। কেপলার ও ট্যাঙ্কার ট্র্যাকার্সের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক উত্তেজনার প্রথম দুই সপ্তাহেই ইরান প্রায় ১ কোটি ৩৭ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করেছে, যার সিংহভাগই গেছে চীনে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ইউয়ানের এই ক্রমবর্ধমান ব্যবহার নির্দিষ্ট কিছু খাতে ডলারের প্রয়োজনীয়তাকে ক্রমেই কমিয়ে দিচ্ছে। যদি এই মডেল সফল হয়, তবে বিশ্বের অন্যান্য দেশও ধীরে ধীরে ডলারের বিকল্প খুঁজতে শুরু করতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে মার্কিন ডলারের বৈশ্বিক আধিপত্যকে খর্ব বা 'ক্ষয়' করতে পারে।
Comments