ইরান যুদ্ধে রাশিয়ার গোপন প্রতিশোধ
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা এখন আর শুধু মিসাইল বা বোমার যুদ্ধ নয়। এটি ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছে তথ্য, স্যাটেলাইট ও ইলেক্ট্রনিক সিগনালের এক অদৃশ্য যুদ্ধে, যেখানে গুলির চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে লোকেশন বা কোঅর্ডিনেটস। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে পশ্চিমা গণমাধ্যম ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মধ্যে একটি প্রশ্ন ঘুরছে: ইরানের নিখুঁত হামলার পেছনে কি রাশিয়ার গোপন সহায়তা রয়েছে? কিছু ঘটনার পর সেই সন্দেহ আরও জোরালো হয়েছে।
নিখুঁত হামলা, বিস্মিত যুক্তরাষ্ট্র
মধ্যপ্রাচ্যে কয়েকটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ইরানের ড্রোন হামলা যুক্তরাষ্ট্রকে বিস্মিত করেছে। বিশেষ করে কুয়েতের একটি ঘাঁটিতে হামলায় ছয় মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার ঘটনায় পেন্টাগনের কর্মকর্তারা মনে করছেন—এটি কোনো কাকতালীয় আঘাত নয়। কারণ, যেসব স্থাপনায় হামলা হয়েছে, সেগুলোর অনেকগুলোর অবস্থান ওপেন সোর্সে পাওয়া সম্ভব ছিল না। ফলে ধারণা করা হচ্ছে, ইরান সংবেদনশীল গোয়েন্দা তথ্য পেয়েছিল।
পেন্টাগনের কয়েকজন কর্মকর্তা ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেছেন, এই হামলা আন্দাজে হয়নি। যে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করা হয়েছে, সেগুলো ছিল সরাসরি ইরানের বিরুদ্ধে অপারেশনাল। ফলে কেউ না কেউ টার্গেটিং ইন্টেলিজেন্স সরবরাহ করেছে।
সন্দেহের তীর মস্কোর দিকে
মার্কিন কর্মকর্তাদের একটি অংশ মনে করছেন, ইরানকে এই ধরনের তথ্য দিতে পারে রাশিয়া। এই তথ্যের মধ্যে থাকতে পারে
- মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটির সঠিক কোঅর্ডিনেট
- সমুদ্রে যুদ্ধজাহাজের অবস্থান
- আকাশে যুদ্ধবিমানের চলাচলের তথ্য
ঘটনার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সরাসরি ফোন করেছিলেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে। তবে পুতিন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন-এ বিষয়ে তাদের কোনো ভূমিকা নেই।
পুতিনের হিডেন হ্যান্ড
ইরাকের ইরবিল ঘাঁটিতে ড্রোন হামলার পর ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলি বলেন, এই হামলার পেছনে "পুতিনের হিডেন হ্যান্ড" থাকতে পারে। ব্রিটিশ সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানি ড্রোনগুলো অত্যন্ত নিচু উচ্চতায় উড়ে রাডার এড়িয়ে গেছে। এই কৌশলটি ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়া ব্যবহার করেছে। বিশেষ করে শাহেদ কামিকাজ ড্রোন ব্যবহারের সময় এমন কৌশল দেখা যায়। এই ড্রোনগুলো ইরানের তৈরি হলেও ব্যবহার ও অপারেশনাল কৌশলের বড় অভিজ্ঞতা রয়েছে রাশিয়ার।
স্যাটেলাইট ও নেভিগেশনের গোপন সহায়তা
ইরানের নিজস্ব সামরিক নজরদারি স্যাটেলাইট খুবই সীমিত। ফলে সমুদ্রে দ্রুত চলমান যুদ্ধজাহাজের মতো লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করা তাদের জন্য কঠিন। কিন্তু রাশিয়ার রয়েছে উন্নত নজরদারি স্যাটেলাইট। এসব স্যাটেলাইট উচ্চ রেজুলেশনের ছবি ও রাডার ইমেজ দিয়ে লক্ষ্যবস্তুর অবস্থান নিশ্চিত করতে পারে। অন্যদিকে, চীনের বেইদো নেভিগেশন সিস্টেম ব্যবহার করলে মিসাইলের গাইডেন্স অনেক বেশি নিখুঁত হয়। বিশ্লেষকদের মতে, এই দুই প্রযুক্তি, চীনের হার্ডওয়্যার এবং রাশিয়ার গোয়েন্দা তথ্য, ইরানের সক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
প্রতিশোধের কৌশল?
কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, এর পেছনে রয়েছে পুরোনো হিসাব। ইউক্রেন যুদ্ধের সময় রাশিয়ার বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় ড্রোন হামলায় যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে টার্গেটিং ইন্টেলিজেন্স দিয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি একবার পুতিনের বাসভবনের কাছেও ড্রোন হামলা হয়। এ কারণে ধারণা করা হচ্ছে, রাশিয়া হয়তো পরোক্ষভাবে ইরানকে সহায়তা করে একই ধরনের কৌশলগত প্রতিশোধ নিচ্ছে।
যুদ্ধ থেকে লাভও পাচ্ছে মস্কো
এই সংঘাত থেকে রাশিয়ার কৌশলগত লাভও হচ্ছে বলে মনে করছে পশ্চিমা গণমাধ্যম।
১. মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়লে তেল সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ে, যা রাশিয়ার জন্য লাভজনক।
২. বিশ্বরাজনীতির নজর আংশিকভাবে ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে সরে যাচ্ছে। এতে আন্তর্জাতিক চাপ কিছুটা কমছে মস্কোর ওপর।
নতুন যুগের যুদ্ধ
বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক যুদ্ধে সবচেয়ে মূল্যবান অস্ত্র এখন তথ্য। সাবেক সিআইএ কর্মকর্তা ব্রুস রিডেল বলেন,"শত্রু কোথায় আছে—যে পক্ষ এটি সঠিকভাবে জানে, শেষ পর্যন্ত সেই পক্ষই যুদ্ধে এগিয়ে থাকে।" আজকের যুদ্ধ তাই শুধু বন্দুক বা বোমার নয়। এটি স্যাটেলাইট, সিগন্যাল, রাডার এবং গোয়েন্দা তথ্যের অদৃশ্য যুদ্ধ—যেখানে একটি সঠিক কোঅর্ডিনেট পুরো যুদ্ধের গতিপথ বদলে দিতে পারে।
Comments