বিতর্কে প্রসিকিউশন, প্রশ্নে ট্রাইব্যুনাল
বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার ইতিহাসে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) বরাবরই একটি সংবেদনশীল ও বিতর্কিত প্রতিষ্ঠান। যুদ্ধাপরাধের বিচার থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সহিংসতার অভিযোগ-সবকিছুতেই এই ট্রাইব্যুনালকে ঘিরে জনমনে উচ্চ প্রত্যাশা যেমন তৈরি হয়েছে, তেমনি প্রশ্ন ও সংশয়ও কম নয়। যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়া এবং রায় নিয়েও অনেক প্রশ্ন ছিল।
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের শাসনামলে এই ট্রাইব্যুনালকে কেন্দ্র করে যে ঘটনাপ্রবাহ ঘটেছে, তা বিচারব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল, সাবেক সরকার প্রধান শেখ হাসিনা ও আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে কথিত "জুলাই গণহত্যা" মামলায় দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন করে রায় দেওয়া। বাংলাদেশের বিচার ইতিহাসে এত দ্রুততার সঙ্গে প্রসিকিউশনের তদন্ত শেষ করার নজির প্রায় নেই। সাধারণত আন্তর্জাতিক মানের অপরাধ তদন্তে দীর্ঘ সময় লাগে। প্রমাণ সংগ্রহ, সাক্ষী সুরক্ষা, ফরেনসিক বিশ্লেষণ এবং আইনি যাচাই-বাছাইয়ের মতো জটিল প্রক্রিয়ার কারণেই সময় নিতে হয়। কিন্তু এই ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক দ্রুততা অনেকের কাছে প্রশ্নের জন্ম দেয় : বিচার কি সত্যিই নিরপেক্ষভাবে হয়েছে, নাকি রাজনৈতিক তাড়াহুড়োর প্রভাব ছিল?
এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন ট্রাইবুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। অন্তর্বর্তী সরকার তাঁকে এই গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেয়। কিন্তু নিয়োগের সময় থেকেই আইন অঙ্গনে প্রশ্ন ওঠে তাঁর নিরপেক্ষতা নিয়ে। কারণ অতীতে তিনি ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত জামায়াতে ইসলামের কয়েকজন নেতার আইনজীবী ছিলেন। আইনের দৃষ্টিতে কোনো আইনজীবীর অতীত পেশাগত ভূমিকা স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাকে অযোগ্য করে না, কিন্তু এমন সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানে স্বার্থের সম্ভাব্য দ্বন্দ্ব এড়িয়ে চলাই আন্তর্জাতিক মানদণ্ড। তা সত্ত্বেও তৎকালীন আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল এবং সরকার এই উদ্বেগকে গুরুত্ব দেয়নি।
এর পরবর্তী ঘটনাগুলো আরও উদ্বেগজনক। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর নতুন বিএনপি সরকার ট্রাইব্যুনালে পরিবর্তন আনে এবং চিফ প্রসিকিউটরের পদ থেকে তাজুল ইসলামকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। কিন্তু তাঁর বিদায়ের দিনই ট্রাইবুনালের আরেক প্রসিকিউটর বি এম সুলতান মাহমুদ গুরুতর অভিযোগ তোলেন। তাঁর দাবি, চিফ প্রসিকিউটরের চেয়ারকে টাকা আয়ের হাতিয়ারে পরিণত করেছিল তাজুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন একটি সিন্ডিকেট। এই অভিযোগ শুধু ব্যক্তিগত দুর্নীতির প্রশ্নই তোলে না, বরং পুরো প্রসিকিউশন কাঠামোর নৈতিক ভিত্তিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।
অন্যদিকে তাজুল ইসলামের পালটা বক্তব্যও কম বিস্ফোরক নয়। তিনি দাবি করেন, প্রসিকিউটর বি এম সুলতান মাহমুদের বিরুদ্ধে তিনি আগেই ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। তাঁর অভিযোগ অনুযায়ী, সুলতান মাহমুদ বিশ্বাসভঙ্গ, শৃঙ্খলাভঙ্গ, নিরাপত্তা প্রহরীকে মারধর এবং পারিবারিক সহিংসতার মতো বিভিন্ন আচরণবিধি লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এ বিষয়ে তিনি সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলকে ১১ জানুয়ারি একটি চিঠিও পাঠিয়েছিলেন। যদি এই দাবি সত্য হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবে-কেন সেই অভিযোগের যথাযথ তদন্ত বা ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি?
এরই মধ্যে আরও একটি গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। একটি সংবাদ প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ট্রাইবুনালের এক প্রসিকিউটর কারাবন্দী এক সাবেক আওয়ামী লীগ নেতাকে জামিনে মুক্তি পাইয়ে দেওয়ার জন্য তাঁর পরিবারের কাছে এক কোটি টাকা দাবি করেছিলেন। হোয়াটসঅ্যাপ কথোপকথনের অডিও রেকর্ডিংয়ে এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। যদি এই অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তবে এটি শুধু দুর্নীতির ঘটনা নয়, এটি বিচারপ্রক্রিয়ার সরাসরি বাণিজ্যিকীকরণের ইঙ্গিত দেয়।
একই সময় প্রসিকিউটর সাইমুম রেজা তালুকদারের পদত্যাগও সন্দেহের আবহকে আরও ঘনীভূত করেছে। সরকারিভাবে তাঁর পদত্যাগ গ্রহণ করা হলেও এর পেছনের কারণ সম্পর্কে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। ফলে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে-ট্রাইব্যুনালের ভেতরে কি আরও বড় ধরনের অস্থিরতা বা অনিয়ম লুকিয়ে আছে?
এই সব ঘটনাকে একত্রে বিবেচনা করলে একটি বড় প্রশ্ন সামনে আসে: এমন একটি প্রসিকিউশন টিমের ওপর ভরসা করে দেওয়া রায় কতটা গ্রহণযোগ্য? বিচারব্যবস্থার মূল শক্তি হলো জনগণের আস্থা। যদি সেই আস্থা নষ্ট হয়ে যায়, তবে বিচারিক রায় আইনি দৃষ্টিতে বৈধ হলেও নৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মতো প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই আস্থার গুরুত্ব আরও বেশি, কারণ এখানে বিচার হয় ইতিহাস, মানবাধিকার এবং রাষ্ট্রের নৈতিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নে।
বাংলাদেশে আইসিটি প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য ছিল ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী বার্তা দেওয়া। কিন্তু যদি সেই প্রতিষ্ঠানের ভেতরেই দুর্নীতি, ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব এবং রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ ঘন ঘন ওঠে, তাহলে পুরো প্রক্রিয়াই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। শুধু একটি রায় নয়, বরং সেই রায়ের পেছনের তদন্ত, সাক্ষ্য এবং আইনি প্রক্রিয়া—সবকিছুই তখন সন্দেহের মুখে পড়ে।
অতএব, বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে জরুরি হলো স্বচ্ছ ও স্বাধীন তদন্ত। ট্রাইব্যুনালের ভেতরে ওঠা সব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত এবং প্রয়োজনে পুরো প্রসিকিউশন কাঠামো পুনর্গঠন করা দরকার। বিচার শুধু হওয়াই যথেষ্ট নয়; বিচার হতে হবে এমনভাবে, যাতে তা নিয়ে কোনো যুক্তিসঙ্গত সন্দেহ না থাকে। অন্যথায়, ন্যায়বিচারের পরিবর্তে ইতিহাসে থেকে যাবে আরেকটি বিতর্কিত অধ্যায়।
Comments