আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল : দেড় বছরের অন্দর কাহিনি
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-যে প্রতিষ্ঠানটি জাতির ইতিহাসের সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ বিচারিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত—সেই প্রতিষ্ঠানের ভেতরকার দ্বন্দ্ব এখন প্রকাশ্য ময়দানে। সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম-এর বিদায়ের পরপরই প্রসিকিউশন টিমের ভেতরের টানাপোড়েন, অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ এবং ব্যক্তিগত আক্রোশের বয়ান গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রশ্ন উঠছে-গত দেড় বছরে ট্রাইব্যুনালে আসলে কী চলছিল?
অভিযোগের পাল্টাপাল্টি বয়ান
ট্রাইবুনালের প্রসিকিউটর বি এম সুলতান মাহমুদ প্রকাশ্যে অভিযোগ করেছেন, চিফ প্রসিকিউটরের চেয়ারকে 'টাকা কামানোর হাতিয়ার' বানানো হয়েছিল; একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দুর্নীতি ও অনিয়ম চলছিল। এই অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর, কারণ এটি শুধু একজন ব্যক্তি নয়, পুরো প্রসিকিউশন কাঠামোকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।
অন্যদিকে মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম এসব অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন। বরং তিনি দাবি করেন, প্রসিকিউটর বি এম সুলতান মাহমুদের বিরুদ্ধেই গুরুতর অনিয়ম, নথি ফাঁস, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং ব্যক্তিগত অসদাচরণের অভিযোগ রয়েছে। এমনকি, ১১ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে তিনি তৎকালীন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল-এর কাছে একটি লিখিত অভিযোগপত্র পাঠিয়েছিলেন বলেও দাবি করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হলেও রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সরকার পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে তা থেমে যায়।
মূল প্রশ্ন : প্রতিষ্ঠান না ব্যক্তি?
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড়ো প্রশ্ন—এটি কি কেবল দুই ব্যক্তির ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব, নাকি প্রতিষ্ঠানের ভেতরে গভীরতর কোনো কাঠামোগত সংকট?
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের মতো সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানে প্রসিকিউশন টিমের নিরপেক্ষতা, পেশাগত শুদ্ধতা এবং নৈতিক মানদণ্ড প্রশ্নবিদ্ধ হলে তার অভিঘাত সরাসরি বিচার প্রক্রিয়ার ওপর পড়ে। যদি দুর্নীতি বা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ সত্য হয়, তবে তা বিচারপ্রার্থীদের আস্থা নষ্ট করবে। আবার যদি অভিযোগগুলো বিদ্বেষপ্রসূত বা প্রতিশোধপরায়ণ হয়, তবে সেটিও সমানভাবে বিপজ্জনক— কারণ এতে বিচারিক প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক কাদা ছোঁড়াছুঁড়ির মঞ্চে পরিণত করা হয়।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের ছায়া
তদন্ত প্রক্রিয়া নির্বাচনি ডামাডোলে থেমে যাওয়া এবং নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রসঙ্গ ইঙ্গিত দেয়—রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও এই সংকটের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। আমাদের দেশের বাস্তবতায় বিচারিক ও আধা-বিচারিক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায়ই রাজনৈতিক পালাবদলের অভিঘাতে অস্থির হয়ে পড়ে। ফলে প্রশ্ন জাগে— ট্রাইব্যুনাল কি সেই একই চক্রে আবদ্ধ?
করণীয় কী?
এ মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি হলো:
অভিযোগগুলোর স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও সময়সীমা বদ্ধ তদন্ত।
তদন্ত প্রক্রিয়া জনসমক্ষে স্বচ্ছভাবে উপস্থাপন।
প্রসিকিউশন টিমের নৈতিকতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার।
বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা একদিনে তৈরি হয় না, কিন্তু একাধিক বিতর্কে তা মুহূর্তেই ক্ষয়ে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শুধু একটি আদালত নয়; এটি ইতিহাসের দায় বহন করে। সেই দায় রক্ষার স্বার্থেই ব্যক্তি-দ্বন্দ্বের ঊর্ধ্বে উঠে সত্য উদ্ঘাটন এখন সময়ের দাবি।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই—দেড় বছরে কী হয়েছে, তা জানার অধিকার জনগণের আছে। আর সেই উত্তর দিতে হবে প্রমাণ, প্রক্রিয়া ও স্বচ্ছতার মাধ্যমে, পালটাপালটি সংবাদ সম্মেলনের ভাষ্য দিয়ে নয়।
Comments