নতুন বাস্তবতার কূটনীতি: ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কে এক সতর্ক আশাবাদ
প্রায় দুই মাস পরে দিল্লি ও আগরতলায় বাংলাদেশ মিশন থেকে ভারতের নাগরিকদের ভিসা দেওয়ার কার্যক্রম আবার চালুর সিদ্ধান্ত হয়েছে। দিল্লি ও আগরতলা থেকে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সূত্রগুলো আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে এমন একটি খবর বাংলাদেশের পত্রিকাগুলোতে এসেছে।
বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ তুলে গত ডিসেম্বরে দিল্লি, কলকাতা,আগরতলায় বাংলাদেশের মিশন ঘিরে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো বিক্ষোভ করে।
বোঝা যায় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক আবার স্বাভাবিকের পথে চলতে শুরু করেছে। তবে এটা ঠিক, দক্ষিণ এশিয়ায় সম্পর্কগুলো খুব কমই সহজ পথে চলে। আমাদের এ অঞ্চলের কূটনীতি প্রায়ই অতীতের নস্টালজিয়া বা সন্দেহের আবর্তে ঘুরপাক খায়। অবিশ্বাস থেকে শত্রুতার বার্তা সবই উচ্চারিত হয়। নতুন বাস্তবতার চেয়ে পুরোনো বক্তব্যের প্রতিক্রিয়াই হয়ে ওঠে প্রধান চালিকা শক্তি। এই প্রেক্ষাপটে ঢাকার সাম্প্রতিক নির্বাচনের পর ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কের যে কূটনৈতিক কোরিওগ্রাফি দেখা গেল, তা বিশেষভাবে লক্ষণীয়।
নির্বাচনের ফল ঘোষণার পরই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিএনপি নেতা তারেক রহমান-কে ফোন করে অভিনন্দন জানান। কূটনীতিতে সময়ই নীতি-এই প্রবাদ এখানে যেন বাস্তব হয়ে ওঠে।
রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ নির্বাচনের পর দ্রুত, সরাসরি নেতা-নেত্রীর যোগাযোগ তিনটি কাজ করে:
১.গুজব ও ভুল ব্যাখ্যার সুযোগ কমায়
২. আমলাতান্ত্রিক ধীরগতিকে পাশ কাটায়
৩. প্রতিপক্ষীয় শক্তির "ইচ্ছাকৃত ব্যাখ্যা"র সুযোগ সংকুচিত করে
এর মাধ্যমে দিল্লি স্পষ্ট বার্তা দেয়-বাংলাদেশের জনগণ যে সরকারকে বেছে নিয়েছে, ভারতের পক্ষ থেকে তার সঙ্গে কাজ করতে কোনো দ্বিধা নেই।
ঢাকার পক্ষ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ দেখা গেছে। নতুন সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী মোদিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। দক্ষিণ এশীয় কূটনীতিতে শপথ অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণ কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি আঞ্চলিক আস্থার একটি প্রতীকী স্বীকৃতি।
যদিও সময়সূচির কারণে মোদির ব্যক্তিগত উপস্থিতি সম্ভব হয়নি, ভারত উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে। লোকসভার স্পিকার ওম বিরলা-কে ১৭ ফেব্রুয়ারির শপথ অনুষ্ঠানে পাঠানো হয়।
এই "আমন্ত্রণ এবং উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিত্ব" সমীকরণটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি সম্পর্ককে ব্যক্তিনির্ভর না করে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ভেতরে রাখে। এতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক কেবল নেতাদের ব্যক্তিগত রসায়নের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে না; বরং রাষ্ট্র-রাষ্ট্র সম্পর্ক হিসেবে স্থিতিশীল থাকে।
আরও গভীর একটি দিক আছে, যা নির্বাচন-পূর্ব সময় থেকেই তৈরি হচ্ছিল। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার অসুস্থতা নিয়ে জনমনে উদ্বেগ তৈরি হলে, প্রধানমন্ত্রী মোদি প্রকাশ্যে উদ্বেগ জানান এবং "সব ধরনের সহায়তা" দেওয়ার প্রস্তাব করেন।
এটি ছিল মানবিক কূটনীতির একটি তাৎপর্যপূর্ণ উদাহরণ। তারেক রহমানও আন্তর্জাতিক নেতাদের সমর্থনকে পরিবারের জন্য শক্তির উৎস হিসেবে উল্লেখ করেন।
দক্ষিণ এশিয়ার কঠিন রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই ধরনের মানবিক ইঙ্গিত দুইভাবে কাজ করে:
- রাজনৈতিক উত্তেজনা কমায়
- ভবিষ্যতের কঠিন আলোচনার জন্য নীরব আস্থার ভাণ্ডার তৈরি করে
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে বহুমাত্রিক-ভূরাজনীতি, বাণিজ্য, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, নদীর পানি বণ্টন, আঞ্চলিক সংযোগ-সবই এখানে জড়িত। নতুন সরকারের সঙ্গে দিল্লির দ্রুত সম্পৃক্ততা দেখায় যে উভয় পক্ষই অতীতের সন্দেহের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে বাস্তববাদী পথে হাঁটতে চায়।
তবে সতর্ক আশাবাদই এখানে সবচেয়ে উপযুক্ত শব্দ। কূটনৈতিক সৌজন্য একটি দরজা খুলে দেয়, কিন্তু সেই দরজা দিয়ে টেকসই সহযোগিতার পথে হাঁটতে হলে প্রয়োজন ধারাবাহিক আস্থা, পারস্পরিক সংবেদনশীলতা এবং কঠিন ইস্যুতেও খোলামেলা সংলাপ।
দক্ষিণ এশিয়ায় "নতুন পথ" খুব কমই আসে। কিন্তু কখনও কখনও, সঠিক সময়ে সঠিক সংকেত-ফোনকল, আমন্ত্রণ, সহানুভূতি-একটি সম্পর্ককে নতুন ছন্দে এগিয়ে নিতে পারে। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এখন সেই সম্ভাবনার দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে।
Comments