এই ভোটে ফিরে দেখা ‘৭১
গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন কেবল ক্ষমতা বদলের লড়াই ছিলনা, এটি ছিল আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন, ইতিহাসের প্রশ্ন, রাষ্ট্রের চেতনার প্রশ্ন। বহু টানাপোড়েন, বিভাজন আর উত্তেজনার মধ্য দিয়ে শেষ পর্যন্ত মানুষ জানিয়ে দিল-বাংলাদেশ কেবল মানচিত্রের নাম নয়; এটি একটি স্মৃতি, একটি রক্তাক্ত জন্মকথা, একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, যা মুছে ফেলা যায় না।
নির্বাচনের আগে এক ধরনের 'ইতিহাস-যুদ্ধ' শুরু হয়েছিল। কেউ কেউ চাইছিলেন ১৯৭১-কে আপেক্ষিক করে দিতে, জাতীয় সঙ্গীতকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে, এমনকি বাঙালির সাংস্কৃতিক ভিত্তিকেই সন্দেহের চোখে দেখতে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-কে 'রঠা' বলে কটাক্ষ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম-কে সাম্প্রদায়িক আখ্যা দেওয়ার চেষ্টা-এসব ছিল নিছক মতভেদ নয়, বরং এক বৃহত্তর বয়ান নির্মাণের প্রয়াস। সেই বয়ানে মুক্তিযুদ্ধের নৈতিক ভিত্তিকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করানো হচ্ছিল।
আরও এগিয়ে বলা হচ্ছিল, ইতিহাসের বহু প্রতিষ্ঠিত সত্য নাকি পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে। 'বিহারি গণহত্যা'র যুক্তি তুলে পাক বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের অপরাধকে আড়াল করার চেষ্টা, রাজাকার, আলবদরদের দায় অস্বীকার-এসব বক্তব্য কেবল বিতর্ক উসকে দেয়নি, আহত করেছে বহু পরিবারকে, যাদের স্বজনেরা আর ফেরেননি। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের নিয়েও অবিশ্বাসের ছায়া ফেলতে চাওয়া হয়েছিল যে তাঁরা নাকি 'দেশের শত্রু' ছিলেন! ইতিহাসের এই পুনর্লিখনচেষ্টা যে কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা স্পষ্ট হয়েছে গত দেড় বছরে।
একটি জন-আন্দোলনের ঢেউয়ে ভেসে ক্ষমতায় এসে প্রশাসনের বহু স্তরে প্রভাব বিস্তার করা হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে পুলিশ, আনসার-কোথাও প্রভাবমুক্ত ছিল না। শিক্ষকদের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের উসকে দেওয়া, সামাজিক মাধ্যমে গালির বন্যা বইয়ে দেওয়া হয়েছিল এক ধরনের সাংস্কৃতিক অবরোধ তৈরি করার জন্য। সংবাদমাধ্যমও রেহাই পায়নি। প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার-এর বিরুদ্ধে প্রকাশ্য ও পরোক্ষ আক্রমণ ছিল সেই চাপেরই বহিঃপ্রকাশ।
প্রতীক ভাঙার মধ্য দিয়েও যেন ইতিহাসের সঙ্গে এক হিসাব চুকোনোর চেষ্টা চলছিল। ধানমন্ডির ৩২ নম্বর,আজকের বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর-যা বাঙালির রাজনৈতিক ইতিহাসের এক কেন্দ্রীয় স্মারক-তাকে গুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল প্রকাশ্যে। এটি নিছক উগ্রতা নয়; বরং একটি স্মৃতি-রাজনীতির চরম প্রকাশ। ইতিহাসকে অপমান করে নতুন বয়ান প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা এখানে স্পষ্ট।
আরেক দিকে ১৯৭১-এর ধারাবাহিকতাকে ভেঙে ২০২৪-কে 'দ্বিতীয় স্বাধীনতা' আখ্যা দেওয়ার প্রচেষ্টা এক নতুন জাতীয় আখ্যান দাঁড় করানোর চেষ্টা হচ্ছিল। সেই আখ্যানের সূচনা ১৯৪৭ থেকে, ২০২৪ তার চূড়া-মাঝখানের '৭১ যেন অস্বস্তিকর এক অধ্যায়,যাকে ছোট করা বা পাশ কাটানো দরকার।
কিন্তু ইতিহাস কি এত সহজে বদলায়?
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি চরমপন্থাকে দীর্ঘমেয়াদে বরদাস্ত করে না। এখানে আবেগ আছে,প্রতিবাদ আছে, উত্তাল রাস্তা আছে-কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্যালট বাক্সে এক ধরনের মধ্যপন্থাই জয়ী হয়। এই নির্বাচনে সেটাই দেখা গেল। মানুষ বুঝিয়ে দিল,'দাবায় রাখতে পারবা না বা উই রিভোল্ট' কেবল দেয়াললেখা নয়;এটি নাগরিক সত্তার ঘোষণা। জুলাইয়ের উত্তাপে লেখা সেই স্লোগান ভোটের ফলাফলে নতুন অর্থ পেল।
প্রশ্ন উঠতেই পারে,এই জবাব কি কেবল রাজনৈতিক? না,এর ভেতরে সাংস্কৃতিক প্রতিক্রিয়াও কাজ করেছে। বাঙালির পরিচয় কেবল ধর্মীয় নয়,কেবল ভাষাভিত্তিকও নয়;এটি এক বহুমাত্রিক সত্তা। সেখানে রবীন্দ্রনাথ যেমন আছেন,নজরুলও আছেন;লালন যেমন আছেন,তেমনি আছেন জসীমউদ্দীন। এই মিশ্র ঐতিহ্যকে সংকুচিত করে একমাত্রিক বানানোর চেষ্টা করলে প্রতিরোধ আসবেই।
যদি সত্যিই মানুষের জন্য কাজ করার আন্তরিকতা থাকত,যদি অযথা 'কালচারাল ওয়ার' শুরু করে সমাজকে আরও ভাগ না করা হতো,যদি ইতিহাসকে প্রতিশোধের অস্ত্র না বানানো হতো-তাহলে হয়তো আজকের ভাষা এত তীব্র হতো না। উন্নয়ন,কর্মসংস্থান,শিক্ষা,স্বাস্থ্য-এসব প্রশ্ন ছাপিয়ে যখন পরিচয়-রাজনীতি সামনে চলে আসে,তখন মানুষ কিছুদিন দেখে,শোনে,সহ্য করে। কিন্তু একসময় সিদ্ধান্ত নেয়।
এই নির্বাচনে সেই সিদ্ধান্তই স্পষ্ট হয়েছে। মানুষ বলেছে-বাংলাদেশের ইতিহাস ১৯৪৭ থেকে শুরু হতে পারে না,আবার ২০২৪-এ গিয়েও শেষ হয় না। '৭১ এই রাষ্ট্রের জন্মচিহ্ন;তাকে বাদ দিলে শরীরটাই অচেনা হয়ে যায়। সেই জন্মের নেতৃত্বে ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান-তাঁর নাম মুছে ফেলা বা খাটো করা মানে কেবল একজন নেতাকে নয়,একটি ঐতিহাসিক মুহূর্তকে অস্বীকার করা।
তবে এটিও সত্য,ইতিহাস নিয়ে বিতর্ক গণতন্ত্রে নিষিদ্ধ নয়। প্রশ্ন তোলা যাবে,গবেষণা হবে,নতুন তথ্য আসবে। কিন্তু তার ভিত্তি হতে হবে সততা ও প্রমাণ,প্রতিশোধ নয়। ইতিহাসকে যদি রাজনৈতিক সুবিধার জন্য কচলানো হয়,তবে তা শেষ পর্যন্ত উল্টো ফল দেয়,এই নির্বাচনে তারই প্রমাণ মিলেছে।
বাংলাদেশের সমাজে 'মধ্যমপন্থা' একটি শক্তিশালী স্রোত। এখানে অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি মানুষ দীর্ঘদিন মেনে নেয় না। সুযোগ পেলে জবাব দেয়-রাস্তা দিয়ে যেমনটা দিয়েছিল শেখ হাসিনাকে। জবাব দেয় সোশ্যাল মিডিয়া দিয়ে,আর শেষ পর্যন্ত ভোটের মাধ্যমে। এই ভোট সেই জবাবেরই প্রতিধ্বনি।
ফলাফল ঘোষণার পর শহরের চায়ের দোকান থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস-সবখানেই এক ধরনের স্বস্তির সুর। যেন কেউ বলছে,'আমরা ভুলিনি।' ভুলিনি ১৯৭১,ভুলিনি শহীদদের,ভুলিনি আমাদের সাংস্কৃতিক শিকড়। আবার এটাও ভুলিনি যে গণতন্ত্র মানে মতভেদ থাকবে,ক্ষমতা বদলাবে,প্রশ্ন উঠবে। কিন্তু সেই প্রশ্নের উত্তর বন্দুক বা গালিতে নয়-ব্যালটে।
এই নির্বাচন তাই কেবল রাজনৈতিক পালাবদল নয়;এটি এক আত্মস্মরণ। ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্ক নতুন করে নির্ধারণের মুহূর্ত। যারা ভেবেছিলেন,সাময়িক ক্ষমতার জোরে জাতির স্মৃতি বদলে দেওয়া যায়,তারা বুঝলেন-বাংলাদেশের মানুষ স্মৃতিভ্রংশে ভোগে না।
শেষ পর্যন্ত বার্তাটি স্পষ্ট: এই দেশ তার অতীতকে অস্বীকার করে সামনে হাঁটতে চায় না। বরং অতীতকে স্বীকার করেই ভবিষ্যৎ গড়তে চায়। '৭১-কে বাদ দিয়ে নতুন স্বাধীনতার গল্প লেখা যাবে না। আর মধ্যপন্থার এই প্রত্যাবর্তনই হয়তো আগামী দিনের রাজনীতির জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা।
Comments