বিনিয়োগ নেই, উন্নয়ন কাজে স্থবিরতা: কোন পথে অর্থনীতি?
অর্থনীতি চাঙ্গা করতে সরকার চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। কথার ফুলঝুরি, বিদেশ সফর আর জাঁকজমকপূর্ণ সম্মেলন ছাড়া বাস্তবে অর্থনীতিতে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তনের ছাপ নেই। গত ১০ বছরের মধ্যে এডিপি বাস্তবায়নের হার এখন সর্বনিম্ন, যা সরকারের অদক্ষতা, নীতি-অসঙ্গতি ও প্রশাসনিক অচলাবস্থার নগ্ন প্রমাণ। বিদেশি বিনিয়োগ না আসায় অর্থনীতির সবচেয়ে বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে কর্মসংস্থান। তরুণদের জন্য নতুন চাকরি সৃষ্টি তো দূরের কথা,বিদ্যমান কর্মসংস্থানও টিকিয়ে রাখা যাচ্ছে না।
দেশি ও বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধ এখন জাতীয় বাজেটের প্রধান খাতে পরিণত হয়েছে। উন্নয়ন ব্যয় নয়,ঋণের সুদ মেটানোই সরকারের অগ্রাধিকার। এ বাস্তবতায় বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের ফাঁদে পড়ার বাস্তব ঝুঁকিতে রয়েছে। এই সংকটের দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই।
গত শনিবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এসব কঠোর বাস্তবতা তুলে ধরেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। 'বাংলাদেশের অর্থনীতি ২০২৫-২৬: নির্বাচনী বাঁকে বহুমাত্রিক ঝুঁকি' শীর্ষক প্রবন্ধে তিনি বলেন,বিশ্ববাজারে চালের দাম প্রায় ৪০ শতাংশ কমলেও বাংলাদেশে তা উল্টো বেড়েছে। চালের কোনো ঘাটতি নেই, উৎপাদন চাহিদার চেয়েও বেশি, তবু দাম বাড়ছে। সরকার আজ পর্যন্ত এর সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেনি।
খাদ্যপণ্যের দামে বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে বাংলাদেশের বিস্তর ফারাক স্পষ্ট করে দেয় বাজার ব্যবস্থাপনায় সরকারের ব্যর্থতা। চালের ক্ষেত্রে বড় মুনাফা না হলেও আলু,পেঁয়াজ,কাঁচামরিচ,বেগুন,মাছ ও মাংসে মধ্যস্বত্বভোগীরা নির্বিঘ্নে লুটপাট চালিয়ে যাচ্ছে। মজুদদারি ও কারসাজি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ না নিয়ে সরকার কেবল সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, যা বাস্তবে কোনো কাজ দিচ্ছে না। খাদ্য ও খাদ্য-বহির্ভূত মূল্যস্ফীতি এখন কাঠামোগত সমস্যায় পরিণত হয়েছে,বিশেষ করে খাদ্য-বহির্ভূত মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জন্য অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে।
অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসে বিদেশি বিনিয়োগ আনতে বিপুল অর্থব্যয়ে 'বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট সামিট–২০২৫' আয়োজন করেছিল। ৫০টি দেশের ৫৫০ জনের বেশি বিনিয়োগকারী অংশ নিলেও বাস্তবে বিনিয়োগ আসেনি। বিডা তাৎক্ষণিক ৩২ কোটি ডলারের প্রতিশ্রুতির কথা বললেও দেড় বছরে অর্থনীতি আরও মুখথুবড়ে পড়েছে। প্রধান উপদেষ্টার একের পর এক বিদেশ সফর,বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রচারণা-সবই কাগুজে সাফল্য,বাস্তবে শূন্য।
বেসরকারি বিনিয়োগ ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে, বিদেশি বিনিয়োগও একইভাবে তলানিতে। ব্যাংকিং খাতে নানা উদ্যোগ নেওয়ার পরও স্থিতিশীলতা ফেরানো যায়নি। খেলাপি ঋণ,রাজনৈতিক প্রভাব ও দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কারণে আমানতকারীদের আস্থা ভেঙে পড়েছে। ব্যাংক খাত সংস্কারে রাজনৈতিক সদিচ্ছার স্পষ্ট অভাব রয়েছে।
রাজস্ব আদায়ে সরকার পুরোনো পথেই হাঁটছে, নতুন কোনো কার্যকর কৌশল নেই। করদাতাদের উৎসাহিত করার বদলে চাপ বাড়ানো হচ্ছে,অপ্রয়োজনীয় কর ছাড় বহাল রয়েছে,আর অবৈধ অর্থপাচার রোধে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। এলডিসি উত্তরণ সামনে রেখেও কর ব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কার হয়নি। একই সঙ্গে সরকার নির্বিচারে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভর করছে এবং প্রকল্প ব্যয়ের অপচয় নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ।
খাদ্য নিরাপত্তাকে এখনো জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি। খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার সংস্কার,আধুনিক মজুদ ও সংরক্ষণ অবকাঠামো,নির্ভরযোগ্য তথ্যভিত্তিক আমদানি সিদ্ধান্ত এবং কার্যকর সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ছাড়া বাজার স্থিতিশীল করা অসম্ভব, এই সত্য সরকার স্বীকার করতেও অনীহা দেখাচ্ছে।
সবশেষে,আসন্ন নির্বাচন নিয়েও গুরুতর উদ্বেগ রয়েছে। নির্বাচন যেন অর্থের দাপট,সহিংসতা ও কারচুপি মুক্ত হয় - এই ন্যূনতম নিশ্চয়তা এখনো অনিশ্চিত। অর্থনৈতিক সংকটের এই বাস্তবতায় একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনই পারে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে। অন্যথায়,রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার সঙ্গে অর্থনৈতিক বিপর্যয় আরও গভীর হবে।
Comments