এত খুনাখুনি!
দেশে গত কিছু সময় ধরে আইনশৃঙ্খলার প্রশ্নটি যেন দেশজুড়ে একটা জ্বলন্ত ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। নতুন বছর শুরুতেই রাজধানীসহ সারাদেশে গুলি করে ও ধারালো অস্ত্রের আঘাতে অন্তত ২০ জন খুন হওয়ার খবর এসেছে। এই পরিসংখ্যান নতুন বছরের প্রথম সাত দিনের। এতে রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষও নিহত হয়েছে, যা সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
দেশের আইনশৃঙ্খলার সাম্প্রতিক ধারা দেখলে বোঝা যায় -পরিস্থিতি একেবারেই স্বস্তিদায়ক নয়, উদ্বেগজনক। সরকারি তথ্য ও বিভিন্ন মিডিয়া রিপোর্টে দেখা যায় যে, অপরাধ যেমন খুন, ধর্ষণ ও নারী-শিশু নির্যাতনের ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে; এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে দিনে গড়ে প্রায় ১১টি খুন এবং ১৫টি ধর্ষণের মতো ঘটনা রিপোর্ট হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে সরকার অপারেশন ডেভিল হান্ট নামে এক বৃহৎ অভিযান চালিয়েছে, যেখানে বারো হাজারেরও বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অভিযানের লক্ষ্য ছিল সহিংসতা ও অপরাধ দমন করা। কিন্তু আদতে এটি ছিল পতিত আওয়ামী লীগ নেতা কর্মী ও সমর্থকদের গ্রেফতার করা।
তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে একদম নিরাশাজনক বললেও হবে না। কিছু সরকারি পরিসংখ্যান বলে যে চুরি, ডাকাতি ও অন্যান্য সাধারণ অপরাধের সংখ্যা কিছুটা কমেছে। জরিমানা, বিচারের হার বৃদ্ধি ও রিপোর্টিং ব্যবস্থার উন্নতির ফলে কিছু ক্ষেত্রে অপরাধের ধরন বদলাচ্ছে, যদিও তা স্বচ্ছভাবে বলা কঠিন।
বিভিন্ন জেলা থেকে আসা খবর ও জানা তথ্যগুলো দেখলে বোঝা যায় যে নিরাপত্তা ব্যবস্থার দৈহিক উপস্থিতি বাড়ানো হলেও বাস্তবে তার কার্যকারিতা কতটা তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রামের অবস্থা বেশ খারাপ।
একই সঙ্গে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নির্বাচনের মতো বড় ইভেন্টগুলো আইনশৃঙ্খলার একটি বড় উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। নির্বাচনকে সামনে রেখে বিভিন্ন এলাকায় সহিংসতা,আধিপত্যের লড়াই ও হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটছে, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি করছে।
সরকার ও পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে যে, আইজিপি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোরভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়োজিত, এবং সহিংসতা প্রতিরোধে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো হচ্ছে। আইজিপি স্পষ্ট বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা কোনোভাবেই অগ্রহণযোগ্য, বিশেষত নির্বাচনের মতো সময়গুলোতে।"
তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিশ্বাসের অভাব প্রবল। অনেকেই মনে করেন যে অপরাধ আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দুর্বল ও অনিয়মিত প্রতিক্রিয়ার কারণে অপরাধীরা সুবিধা পাচ্ছে, এবং পুলিশের উপস্থিতি বা অভিযানই প্রকৃত সমস্যার সমাধান নয়।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোরও উদ্বেগ প্রকাশের বাইরেও অভিযোগ আছে যে, সন্ত্রাসবিরোধী আইন ও কঠোর দমন নীতির নামে সরকার সাধারণ অধিবাসীর স্বতন্ত্র মত ও আন্দোলনকে দমন করছে, যা দেশের আইনের শৃঙ্খলার মানদণ্ডের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলেছে।
মাত্র সাত দিনে ২০ খুন – এটি শুধু পরিসংখ্যান নয়, এটি সমাজের গভীর অসুখের ইঙ্গিত। প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের পেছনে আছে প্রতিহিংসা, আধিপত্য চর্চা আর রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থার ক্ষয়। যখন এমন খবর প্রায় নিত্যদিনের শিরোনাম হয়ে ওঠে, তখন প্রশ্ন ওঠে: আমরা কি সহিংসতাকে স্বাভাবিক ধরে নিচ্ছি?
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এই অবনতি কেবল পুলিশের সংখ্যায় বা টহলের ঘাটতিতে সীমাবদ্ধ নয়। এর শিকড়ে আছে বিচারহীনতার সংস্কৃতি, রাজনৈতিক প্রভাব, চাঁদাবাজি করতে অস্ত্রের সহজলভ্যতা। অপরাধীরা যখন জানে যে শাস্তি অনিশ্চিত বা বিলম্বিত, তখন সহিংসতা দমে না, বরং বেড়ে যায়। দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার না হলে ভয়াবহতার এই চক্র ভাঙা কঠিন।
এখানে গণমাধ্যম, সুশীল সমাজ এবং নাগরিকদের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। কেবল খবর প্রকাশ নয়, ধারাবাহিক অনুসন্ধান, দায়বদ্ধতা আর নীতিগত আলোচনার মাধ্যমে চাপ তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রকে দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে, অপরাধ দমনে পেশাদার পুলিশিং, প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত, সাক্ষী সুরক্ষা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
সবশেষে বলা যায়, ৭ দিনে ২০ খুন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি আমাদের সামষ্টিক ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। যদি এখনই কঠোর সিদ্ধান্ত, বাস্তবায়ন ও জবাবদিহি না আসে,তবে এই সংখ্যা বাড়তেই থাকবে। নিরাপত্তা নাগরিকের মৌলিক অধিকার,এই অধিকার ফিরিয়ে দিতে রাষ্ট্রকেই আগে দায়িত্ব নিতে হবে।
নির্বাচনের আগে সামগ্রিকভাবে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এমন এক জটিল অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন নিরাপত্তা পরিবেশ,গণতান্ত্রিক অধিকার ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণের ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। সাধারণ নাগরিকের কাছে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে - সরকার শুধু আগ্নেয়াস্ত্র জব্দ ও গ্রেপ্তার বাড়িয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে?
আসলে শুধু বাহিনী মোতায়েন ও গ্রেপ্তার যথেষ্ট নয়। যদি একই সঙ্গে ন্যায্য বিচার না হয়,সবকিছুতেই রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব প্রদর্শিত হয়, তাহলে পরিস্থিতির কোন উন্নতি হবেনা।
Comments