হত্যার গ্রাফ কেন এমন উর্ধ্বমুখী?
দেশের গণমাধ্যমের শিরোনামে বন্দুক, রক্ত, হত্যা-এগুলো যেন পুরনো খবর নয়, এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে পুলিশের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে বলা হয়েছে, দেশের এক দশকে সর্বোচ্চ দৈনিক হত্যাকাণ্ড হয়েছে চলতি বছরে, প্রতি দিন গড়ে আটটি খুন। এই সংখ্যা নিঃসন্দেহেই উদ্বেগ-জাগানিয়া। শুধু সংখ্যার বিষয় নয় - তার পেছনে লুকিয়ে আছে সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা, আইনশৃঙ্খলার অবক্ষয়, রাজনৈতিক সহিংসতা ও বিচারবহির্ভূত হত্যার প্রবণতা।
প্রথমত, এটি একটি শক্তিশালী ইঙ্গিত পরিস্থিতি ভালো নয়, আইনের শাসনের ঘাটতি আছে। হত্যা, খুনকে কে রোধ করার জন্য আইন, বিচার ও পুলিশি তৎপরতা এখন যথেষ্ট নয় বলেই মনে হচ্ছে। প্রতিদিন গড়ে ৮টি হত্যা হচ্ছে বলে পুলিশই বলছে। তাহলে বলা যায়, সাধারণ মানুষের নিত্যদিনকার নিরাপত্তা একেবারেই নেই বা খুবই দুর্বল। বিচারহীনতা ও প্রতিকারহীনতা মানুষকে আগ্রাসী হয়ে উঠতে উৎসাহিত করছে।
দ্বিতীয়ত, প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে যে বেশিরভাগ হত্যাকাণ্ড 'রাজনৈতিক বিরোধী মতকে দমন করার জন্য' সংঘটিত হয়েছে। অর্থাৎ, হত্যা এখন কেবলমাত্র সাধারণ অপরাধ নয় - এটি রাজনৈতিক সহিংসতার হাতিয়ার। রাজনৈতিক বিরোধিতা মানেই নিরাপত্তাহীনতা অথবা মৃত্যুর ভয় - এই ভাবনা রাষ্ট্র-শাসনের দায়িত্বের জন্য লজ্জার।
রাজনৈতিক সমালোচনা, মতপ্রকাশ, বিরোধিতার স্বাধীনতা - এসব মৌলিক অধিকার যদি হত্যার শিকার হয়,তাহলে সমাজের মুক্তির ভিত্তিই ভেঙে পড়ছে।
তৃতীয়ত,এই ঘটনা বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামোয় ভয়ঙ্কর এক সংকেত দেয়। দরিদ্রতা, বেকারত্ব,শিক্ষার অভাব,সামাজিক ভাঙন -এসব সমস্যার সঙ্গে সহিংসতাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। যখন সাধারণ ব্যক্তি নিজের অধিকার বা নিরাপত্তা না পায়, তখন নিজের শক্তি প্রমাণ করার জন্য অবৈধ পথ বেছে নেয়। হত্যার এই সংখ্যার পিছনে রয়েছে অনেক গোপন ক্ষত ও বিচ্ছিন্নতা।
এই ধরনের হত্যার প্রবণতার জন্য একাধিক স্তরে দায় আছে:
সরকারের -আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, বিচারব্যবস্থা ও প্রশাসন যাতে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নেয় তা নিশ্চিত করতে হবে।
দলের নেতৃবৃন্দ ও স্থানীয় রাজনৈতিক শক্তিকে দায়িত্ব নিতে হবে—রাজনৈতিক বিরোধিতাকে হত্যার হাতিয়ার বানিয়ে চললে গণতন্ত্রই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
সাধারণ মানুষের মধ্যে পরিকল্পিতভাবে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, অপমান, হিংসাত্মক আচরণ ছড়িয়ে দিলে সেটিও সহিংসতাকে লালন করে।
মিডিয়া ও সোশ্যল মিডিয়াকে সচেতন হতে হবে—খুন-অপরাধ বিষয়ে সংবাদ দান শুধু সংখ্যা দিয়ে নয়, কারণ ও প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করতে হবে, যাতে জনসচেতনতা বাড়ে।
কী করা যেতে পারে?
১. দ্রুত বিচারিক ব্যবস্থা চালু করতে হবে - হত্যা-মামলায় বিচার যেন দ্রুত হয়,বিচারের দেরি বন্ধ হয়। বিচারহীনতা মানুষের মধ্যে আইন উল্লঙ্ঘনের মনোভাব তৈরি করে।
২. সন্ত্রাস,রাজনৈতিক সহিংসতা ও গ্যাং সংশ্লিষ্ট হত্যাকে নির্ধারিত করবে বিশেষ প্রশাসনিক যন্ত্র - যেখানে রাজনৈতিক বিরোধিতাকে দমন করার জন্য হত্যার ব্যবহার হয়,সেগুলোকে আলাদা মনিটরিং সিস্টেমে আনা যেতে পারে।
৩. সামাজিক সুরক্ষা নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করতে হবে -যেসব এলাকায় বেশি হত্যার প্রবণতা সেখানে শিক্ষা,কর্মসংস্থান ও সামাজিক পরিষেবা বাড়াতে হবে। কারণ,দারিদ্র্য ও শিক্ষাহীনতা সহিংসতা-প্রবণতা বাড়ায়।
৪. মিডিয়া-ক্যাম্পেইন চালু করতে হবে - মানুষকে আত্মরক্ষা,সহিংসতা প্রতিরোধ ও সামাজিক সংহতির দিকেই নিয়ে যেতে হবে। জনগণকেই সচেতন করতে হবে যে হত্যাও একটি সামাজিক ব্যাধি।
৫. আন্তঃসংস্থাগত সমন্বয় বাড়াতে হবে -আইন প্রয়োগকারী সংস্থা,স্থানীয় প্রশাসন,সিভিল সোসাইটি ও মিডিয়া এক সঙ্গে কাজ করলে হত্যার প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।
দেশ যখন গড়ে প্রতিদিন আট হত্যার মুখ দেখছে, তখন এটি শুধু অপরাধ পরিসংখ্যান নয়- এটি আমাদের সামাজিক চেতনা, রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও ন্যায়বিচার ব্যবস্থার উন্নতির সংকেত। মৃত্যুর পরিসংখ্যার প্রতিটিই একটি পরিবার,একটি স্বপ্ন,একটি মানুষকে হারানোর গল্প। আমরা যদি এই সংখ্যাকে 'উপসংহার' মানে মানতে থাকি, তাহলে আগামীদিনে আরও বেশি মৃত্যু,আরও বেশি হিংসার ছবি আমাদের অভ্যাসে পরিণত হতে পারে।
সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের আলোকে বলতে হয়—হত্যা রোধ করা শুধু পুলিশ বা বিচার ব্যবস্থার কাজ নয়; এটি হতে হবে একটি রাষ্ট্রীয়,সামাজিক,রাজনৈতিক সব-স্তরের আন্দোলন। আমরা যদি সত্যিই 'মানবতার জয়' চাই, তাহলে প্রথমে প্রতিদিনের এই রক্তপাতকে শুধু সংখ্যার খাতায় না দেখে, হৃদয়ের খাতায় নাম লিখে ফেলতে হবে।
কলম ধরুন, চোখ খুলে দেখুন—দিনে আট জনের মৃত্যু আমাদের জন্য এক-সচেতন চোখে দেখতে হবে, এক-সচেতন হৃদয়ে অনুভব করতে হবে। কারণ যদি আমরা 'এখনও বাড়ছে' বলেই প্রথম উৎসাহ না পাই, তাহলে আগামীকাল হতে পারে ভয়ঙ্কর এক বাস্তবতা।
Comments