‘আমরা চাই আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও তাদের শরিকরাও অংশ নিক’
বাংলাদেশের আগামী জাতীয় নির্বাচন ঘিরে অনিশ্চয়তা ও বিতর্ক থাকলেও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, আগামী বছর ফেব্রুয়ারিতেই ভোট হবে। তার দাবি, সংশয় বা অশান্তির কোনো আশঙ্কা নেই। বরং দেশের মানুষ দীর্ঘদিনের ভোটাধিকার ফিরিয়ে নিতে প্রস্তুত। তাই নির্বাচন হবে উৎসবমুখর পরিবেশে। সম্প্রদি ঢাকার গুলশান বিএনপি অফিসে ভারতীয় দৈনিক 'এই সময়'কে দেয়া সাক্ষাতকারে তিনি এসব কথা বলেন। ঢাকা জার্নাল-পাঠকদের জন্য সাক্ষাতকারের আকর্ষণীয় অংশ তুলে ধরে হলো।
জামায়াতে ইসলামী বলছে, আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) ব্যবস্থা ছাড়া ভোটে অংশ নেবে না। আবার এনসিপি চাইছে প্রচলিত সংবিধান বাতিল করে আগে গণপরিষদের নির্বাচন হোক। কিন্তু আলমগীর দৃঢ়ভাবে বলেন, 'জামায়াত শেষ পর্যন্ত ভোটে আসবে। পিআর–টিআর নয়, প্রচলিত যেভাবে মানুষ ভোট বোঝেন, সেভাবেই নির্বাচন হবে। এনসিপিকে আমরা কোনো শক্তি বলেই দেখি না'।
তিনি আরও জানান, বিএনপি একসময় জামায়াতকে অকারণে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। কিন্তু এবার তাদের 'মাথায় তোলা হবে না'।
আসন ভাগাভাগির আলোচনা প্রসঙ্গে আলমগীর জানান, জামায়াত বিএনপির কাছে আসন চেয়েছিল।
'তারা ৩০টা আসন দাবি করেছিল। কিন্তু আমরা উৎসাহ দেখাইনি, বরং অনেক কম আসনের প্রস্তাব দিয়েছিলাম। এতে তারা অসন্তুষ্ট হয়েছে। এবার আর জামায়াতকে সুবিধা নিতে দেব না'।
অন্যদিকে এনসিপির আসন দাবির খবরকে তিনি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস নিয়ে একসময় বিএনপির পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ থাকলেও পরিস্থিতি এখন বদলেছে বলে জানান ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তাঁর মতে,
'দলের পক্ষে আমি তাঁর সঙ্গে কথা বলেছি। এখন তিনি আন্তরিকভাবে চান ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হোক। নির্বাচনের দিন ঘোষণার আগের রাতে সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান ও ইউনূস সাহেবের সঙ্গে আমার দীর্ঘ আলোচনা হয়'। সেই বৈঠক প্রসঙ্গে তিনি জানান,
'সেনাপ্রধান বলেছেন, পুলিশের ঘাটতির কারণে এক বছর ধরে সেনারা রাস্তায় দায়িত্ব পালন করছে, যা কাম্য নয়। তিনি চান নির্বাচন শেষ করে সেনারা ব্যারাকে ফিরুক। ইউনূস জানিয়েছেন, তিনি ফেব্রুয়ারিতেই ভোট চান, তারপর দ্রুত ক্ষমতা হস্তান্তর করে অব্যাহতি নিতে চান। ইউনূস এমনকি সতর্ক বার্তাও দিয়েছেন ফেব্রুয়ারিতে ভোট না হলে মার্চ থেকে তিনি আর দায়িত্বে থাকবেন না'।
এই সময়'কে দেয়া সাক্ষাতকারে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বিএনপি চায় আওয়ামী লিগ ও তাদের শরিকরা, এমনকি জাতীয় পার্টিও নির্বাচনে অংশ নিক।
'আমাদের বিরুদ্ধে অনেকে আওয়ামীর দালাল বলে গালাগাল দিচ্ছে। কিন্তু শেখ হাসিনার মতো ভুল আমরা করব না। তিনি ১৫ বছর প্রতিপক্ষকে ভোটে দাঁড়াতে দেননি। আমরাও যদি তাই করি, তবে একই প্রতিফল পাব'।
তবে তিনি এও মনে করিয়ে দেন যে, আওয়ামী লিগের দীর্ঘদিনের কর্মকাণ্ডের কারণে জনগণের মধ্যে তাদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রবল'।
ভারতের প্রভাব নিয়েও মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে প্রশ্ন করেন এই সময়ের সাংবাদিক। তিনি বলেন,
'ভারত মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের পাশে ছিল, এক কোটি মানুষকে আশ্রয় দিয়েছে। ভৌগোলিকভাবেও ভারত বাংলাদেশকে ঘিরে রেখেছে। তাই প্রভাব থাকবেই'। কিন্তু তাঁর অভিযোগ, ভারত এতদিন শুধু আওয়ামী লীগকেই বাংলাদেশ হিসেবে দেখেছে, বিএনপি ও অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেনি।
'আমরা অসাম্প্রদায়িক, মধ্যপন্থী গণতান্ত্রিক দল। মুক্তিযুদ্ধের সংবিধান রক্ষায় স্বাধীনতা-বিরোধীদের বিরুদ্ধেই লড়াই করছি। অথচ আওয়ামীর প্রচারণায় ভারত আমাদের জামায়াতের সমান ভেবেছে। এই ভুলটা ভারতকেই সংশোধন করতে হবে'।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে ভারত সব দলের সঙ্গে যোগাযোগ করবে, সাংস্কৃতিক বিনিময় ও মানুষে–মানুষে সম্পর্ক বাড়বে।
'আমরা কলকাতা যাব, কলেজ স্ট্রিট থেকে বই কিনব, সিনেমা-থিয়েটার দেখব। ভিসা প্রক্রিয়া হবে সহজ। ভারতীয়রাও বাংলাদেশে আসবেন, আমরা স্বাগত জানাব'।
(সূত্র: এই সময়, সাক্ষাতকার নিয়েছেন: অনমিত্র চট্টোপাধ্যায়)
Comments