তরুণদের নতুন ফ্যাশন: স্ক্রিনটাইম ছেড়ে বইয়ের ঘ্রাণ!
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ক্রল করতে করতেই কেটে যায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ছোট ভিডিও আর নানা ডিজিটাল কনটেন্টের ভিড়ে দীর্ঘ সময় ধরে বই পড়ার অভ্যাসটি একসময় হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। তবে সেই চিত্রে এখন দারুণ পরিবর্তন আসছে। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে নতুন করে বাড়ছে বই পড়ার আগ্রহ। বন্ধুরা মিলে পাঠচক্রে যোগ দেওয়া, সোশ্যাল মিডিয়ায় বই নিয়ে আলোচনা কিংবা প্রিয় তারকাদের বইয়ের সুপারিশ—সব মিলিয়ে তরুণদের কাছে বই এখন এক নতুন আকর্ষণের নাম। ভারতের সংবাদমাধ্যম 'ইন্ডিয়া টুডে'র একটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই তথ্য।
বই পড়া এখন আর শুধু ঘরের কোণে একা বসে পাতা উল্টানোর বিষয় নয়; এটি হয়ে উঠেছে মানুষের সঙ্গে মেশার, নিজের পছন্দ ভাগ করে নেওয়ার এবং নতুন একটি কমিউনিটির অংশ হওয়ার দারুণ মাধ্যম।
পাঠচক্রে বাড়ছে তারুণ্যের ভিড়
একই ছাদের নিচে বসে নিজ পছন্দের বই পড়া, বই বিনিময় কিংবা আলোচনা—এমন আয়োজনের জনপ্রিয়তা বাড়ছে শহরগুলোতে। দিল্লির 'লোধি রিডস' বা অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নের 'বুক ডুফ'-এর মতো পাঠকগোষ্ঠীগুলো নীরব পাঠ ও বই বিনিময়ের চমৎকার পরিবেশ তৈরি করছে। শহুরে জীবনের একাকিত্ব কাটাতেই তরুণরা এমন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হচ্ছেন, যা পুরোনো পাঠকদেরও নতুন করে উজ্জীবিত করছে।
সোশ্যাল মিডিয়া ও তারকাদের প্রভাবে নতুন পাঠক
'বুকটক' বা 'বুকস্টাগ্রাম'-এর মতো অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতে এখন নিয়মিত বইয়ের রিভিউ ও রিডিং লিস্ট শেয়ার করা হয়। জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী দুয়া লিপার 'সার্ভিস৯৫ বুক ক্লাব'-এর মতো উদ্যোগগুলো নতুন প্রজন্মকে নতুন লেখক ও বইয়ের সঙ্গে পরিচিত করতে বড় ভূমিকা রাখছে। তবে সোশ্যাল মিডিয়ার ট্রেন্ড দেখে যাচাই না করে বই কেনার প্রবণতা থেকে সতর্ক থাকার পরামর্শও দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
ফ্যাশনের অংশ হয়ে উঠছে বই
আশ্চর্যের বিষয় হলো, বই পড়ার অভ্যাস এখন ফ্যাশন জগতেও নিজের জায়গা করে নিয়েছে। ২০২৬ সালের নিউইয়র্ক ফ্যাশন উইকে কোচের প্রদর্শনীতে তারকাদের ব্যাগে ছোট বইয়ের আকৃতির অনুষঙ্গ দেখা গেছে। পেঙ্গুইন র্যান্ডম হাউসের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে তৈরি এসব ক্ষুদ্রাকৃতির বইয়ের প্যান্ডেন্ট বা ব্যাগ বইয়ের প্রতি ভালোবাসাকে স্টাইলের অংশ করে তুলেছে। ডিওরসহ বিভিন্ন নামী ব্র্যান্ডও ক্লাসিক বইয়ের নকশা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ব্যাগ তৈরি করছে। এর মাধ্যমে বই এখন শুধু জ্ঞানার্জনের মাধ্যম নয়, বরং ব্যক্তিগত রুচি ও সাংস্কৃতিক পরিচয় প্রকাশের আধুনিক উপায় হয়ে উঠেছে।
বিশ্বজুড়ে অভিনব উদ্যোগ
তরুণদের বইমুখী করতে বিভিন্ন দেশ নানা উদ্যোগ নিয়েছে। ভারতের বিমানবন্দরগুলোতে চালু হওয়া 'ফ্লাইব্রেরি' থেকে যাত্রীরা বিনামূল্যে বই নিয়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর পর তা আবার ফেরত দিতে পারেন। সিঙ্গাপুরে প্রতিদিন ১৫ মিনিট বই পড়ার জন্য ভার্চ্যুয়াল কয়েন দেওয়ার মতো উৎসাহব্যঞ্জক ব্যবস্থাও চালু রয়েছে। দিল্লির ঐতিহ্যবাহী বইয়ের দোকানগুলোতেও এখন ১৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সী তরুণ ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ করা যাচ্ছে।
বই পড়ার ধরন ও পাঠকদের একত্র হওয়ার পদ্ধতিতে পরিবর্তন এলেও বইয়ের পাতায় নতুন জগৎ আবিষ্কারের আনন্দ চিরন্তন। সোশ্যাল মিডিয়ার একটি ভিডিও, কোনো তারকার সুপারিশ কিংবা বন্ধুদের আড্ডা—যে মাধ্যমেই হোক না কেন, তরুণ প্রজন্ম আবারও ফিরে আসছে বইয়ের কাছে। আর এই ইতিবাচক পরিবর্তনই গড়ে তুলতে পারে এক আলোকিত ভবিষ্যৎ।
Comments