ভাঙা ঘরে বৃষ্টির পানিতে নবজাতকের জন্ম, পাশে দাঁড়াল প্রশাসন
গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি
বৃষ্টির মধ্যে ভাঙাচোরা কুঁড়েঘরে জন্ম নিয়েছে এক নবজাতক। মাথার ওপর নেই নিরাপদ ছাদ, ঘরে নেই পর্যাপ্ত খাবার। কখনো মন্দিরে, কখনো অন্যের বাড়ি কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠানে আশ্রয় নিয়ে দিন কাটছে অসহায় এই পরিবারটির।
গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলার পাটগাতী ইউনিয়নের বাঘিয়ারকুল দক্ষিণপাড়ার ২ নম্বর ওয়ার্ডে এ পরিবারটির বসবাস।
পরিবারটির কর্তা চিন্ময় মন্ডল (৪৮)। সরল-সোজা এই মানুষটির স্ত্রী আরতী মন্ডল (৪০) প্রতিবন্ধী। তাদের তিন সন্তান। বড় ছেলে কৃষ্ণ মন্ডলের বয়স ৮ বছর, সেও প্রতিবন্ধী। মেঝো ছেলে বিষ্ণু মন্ডলের বয়স ৬ বছর। আর তিন দিন আগে জন্ম নেওয়া ছোট সন্তানটি এখনো নাম পায়নি।
স্থানীয়রা জানান, প্রায় দুই বছর ধরে পরিবারটি মানবেতর জীবনযাপন করছে। থাকার মতো একটি ঘরও তাদের নেই। ভাঙাচোরা কুঁড়েঘরটুকুও বৃষ্টি হলে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। সম্প্রতি সেই ঘরেই বৃষ্টির মধ্যে জন্ম নেয় নবজাতকটি।
পরিবারটির দুরবস্থার খবর জানতে পেরে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান টুঙ্গিপাড়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ দিদারুল আলম। তিনি বাঘিয়ারকূলে গিয়ে অসহায় পরিবারটির সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের পাশে থাকার আশ্বাস দেন। ইউএনও নবজাতক শিশুটির শারীরিক অবস্থা দেখে তাকে হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। পাশাপাশি পরিবারটির জন্য একটি ঘরের ব্যবস্থা করারও আশ্বাস দেন।
প্রশাসনের এই উদ্যোগে কিছুটা আশার আলো দেখছেন পরিবারটির সদস্য ও প্রতিবেশীরা। তাদের প্রত্যাশা, শুধু আশ্বাস নয়, দ্রুত একটি নিরাপদ ঘর ও নিয়মিত খাদ্যের ব্যবস্থা হলে তিন সন্তানকে নিয়ে পরিবারটি অন্তত নিরাপদে বেঁচে থাকার সুযোগ পাবে।
ভুক্তভোগী চিন্ময় মন্ডল বলেন, 'আমার কিষাণ চলে না। সন্তানের মুখে ভাত দিতে পারি না। ঘর বানাবো কীভাবে? প্রশাসনের কাছে জোর দাবি, আমাকে যেন একটা ঘরের ব্যবস্থা করে দেয়।'
নবজাতকের মা আরতী মন্ডল প্রতিবন্ধী হওয়ায় ঠিকমতো কথা বলতে পারেন না। সন্তানদের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'আমার দুটি সন্তান।' পরিবারের অসহায়ত্ব ও প্রতিবন্ধকতার কারণে সন্তানদের স্বাভাবিকভাবে দেখাশোনাও করতে পারছেন না তিনি"।
এলাকাবাসী জয়দীপ হালদার বলেন, 'এদের পরিবারের সবাই প্রায় প্রতিবন্ধী। নুন আনতে পান্তা ফুরায়। নবজাতক শিশুটি বৃষ্টির মধ্যে ভিজে দুনিয়ায় এসেছে। কখনো মন্দিরে আশ্রয় নেয়, কখনো অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে থাকে। সেখানেও তারা থাকতে পারে না। এদের জন্য একটি ঘর খুবই প্রয়োজন। কোনো বিত্তবান ব্যক্তি, প্রশাসন বা সরকার যদি পরিবারটির জন্য একটি ঘরের ব্যবস্থা করে দেয়, তাহলে অন্তত খেয়ে না খেয়ে হলেও মাথা গোঁজার ঠাঁই পাবে পরিবারটি"।
প্রতিবেশী বিনতা মাঝি বলেন, 'এদের থাকার কোনো ব্যবস্থা নেই। একদিন তিনবেলা খাবার খায়, আবার দুই বেলা না খেয়ে থাকে। এমনকি রান্না ঘরের ব্যবস্থা নেই,বৃষ্টি আসলে রান্না করতে পারেনা"।
পাটগাতী ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য তুষু বলেন, 'তাদের যে ঘর নেই এবং তারা মানবেতর জীবনযাপন করছে, এটি আমার জানা ছিল না। আপনাদের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পেরেছি। চেয়ারম্যান ও প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করব।'
পাটগাতী ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সুভাষ চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, 'তাদের যে ঘর নেই, এ বিষয়টি আমার জানা ছিল না। গণমাধ্যমের মাধ্যমে জানতে পেরেছি। প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে ঘরের ব্যবস্থা করে দেওয়ার চেষ্টা করব।'
ইউএনও মোহাম্মদ দিদারুল আলম বলেন, 'আমি এখানে সদ্য যোগদান করেছি। বিষয়টি আমার জানা ছিল না। অসহায় পরিবারটির বিষয়ে জানতে পেরেছি। আমি দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।'
Comments