সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা সুরের জাদুকর লাকী আখান্দ
১৯৯৮ সালের এক তপ্ত এপ্রিল। ঢাকার জাতীয় জাদুঘরে অঞ্জন দত্তের প্রথম গানের আসর। সেই জলসায় অঞ্জন দত্তের আমন্ত্রণে মঞ্চে উঠেছিলেন বাংলাদেশের এক নিভৃতচারী সুরসাধক। সেদিন দুজনের কেউই একে অপরের গান খুব একটা জানতেন না, কিন্তু সুরের মূর্ছনায় তৈরি হলো এক অবিস্মরণীয় মুহূর্ত। সেই শিল্পী আর কেউ নন—বাংলা গানের কিংবদন্তি লাকী আখান্দ। অঞ্জনের মনে লাকী এতটাই দাগ কেটেছিলেন যে, পরবর্তীতে তাকে নিয়ে তিনি গান বাঁধলেন— 'একজন যদি হয় অঞ্জন আর একজন লাকী আখান্দ'।
পুরান ঢাকায় জন্ম নেওয়া লাকীর সংগীতের গুরু ছিলেন তার বাবা আবদুল আলী আখান্দ। মাত্র পাঁচ বছর বয়স থেকেই শুরু হয় সুরের চর্চা। তার ছোট ভাই হ্যাপি আখান্দ ছিলেন তার প্রাণের স্পন্দন। ১৯৮৭ সালে হ্যাপির অকাল মৃত্যু লাকীকে স্তব্ধ করে দেয়। দীর্ঘ সময় নিজেকে সংগীত থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিলেন এই অভিমানে।
লাকী আখান্দের একক অ্যালবামের সংখ্যা মাত্র সাতটি হলেও তার প্রতিটি কাজ ছিল মাস্টারপিস। তাকে বলা হয় 'সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা মিউজিশিয়ান': পপ ও ফোকের সাথে পাশ্চাত্য সুরের সার্থক মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন তিনি। স্প্যানিশ মিউজিকের সাথে দেশীয় ধ্রুপদী সুরের মিশেলে তৈরি করতেন অনন্য আবহ। 'যেখানে সীমান্ত তোমার', 'আমায় ডেকো না', 'আবার এল যে সন্ধ্যা', 'আজ এই বৃষ্টির কান্না দেখে', 'কবিতা পড়ার প্রহর'—এমন অসংখ্য গান আজও বাঙালির মুখে মুখে ফেরে।
২০১৭ সালের ২১ এপ্রিল ক্যানসারের কাছে হার মেনে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান এই সুরসম্রাট। কিন্তু তিনি হারিয়ে যাননি। মৃত্যুর তিন দশক পরও তার অসমাপ্ত গান 'যার কাছে মন রেখে' তরুণ মুন্সীর কণ্ঠে যখন প্রাণ পায়, তখন বোঝা যায় লাকী কতটা প্রাসঙ্গিক।
লাকী আখান্দ তার গানের মধ্য দিয়ে আমাদের দিয়ে গেছেন এক 'নীল মনিহার'। শীত যাবে, বসন্ত আসবে, কিন্তু বাংলার প্রতিটি সুরের জলসায় লাকী বেঁচে থাকবেন তার সৃষ্টি আর সেই 'ফেরারি পাখি'র আকুতি নিয়ে।
Comments