বিশেষ সম্পাদকীয় | সবার ঈদ

বছর ঘুরে আবার ঈদ-উল-ফিতর এসেছে। আমাদের সবচেয়ে বড় উৎসব। দু:খকে ছেড়ে সুখকে আলিঙ্গন করে, উদাসীনতাকে ছেড়ে উচ্ছ্বলতাকে জড়িয়ে ধরার ঈদ আজ।
রোজা শেষে ঈদ আসে। মুসলমান সম্প্রদায় একটি মাস সিয়াম সাধনা করে এই উৎসবে সামিল হয়। স্বাভাবিক কারণে এর একটি ধর্মীয় তাৎপর্য আছে। কিন্তু সমাজের বৃহত্তর পরিসরে ঈদ উৎসব শুধু নামাজের আয়োজন নয়। আমাদের প্রতিটি উৎসবে থাকে মানুষকে ভালোবাসা, মানুষের বোধ আর মমত্বের মেলবন্ধন বাড়ানো।
এবার এক নতুন প্রেক্ষাপটে ঈদ এসেছে। এক প্রবল দিশাহারা সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি আমরা। এমন এক সময়, যখন জাতি বিশাল আত্মত্যাগ করে ফ্যাসিবাদকে সরিয়েছে। অনেক মানুষের জীবন গেছে, অনেক মানুষ আহত হয়ে এখনও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি। কিন্তু সমাজে শান্তি আসেনি। ফ্যাসিবাদ বিতারণের পরও 'মব ভায়োল্যান্স' নামের তীব্র গোলযোগ আর অভূতপূর্ব সংঘর্ষের সম্মুখীন হতে হয়েছে আমাদের। শিশু ও নারী নিপীড়নের আধিক্য, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই এখনও নিত্য আতংক। এমন এক সময়, যার মাথার উপরে জমে রয়েছে অর্থনৈতিক সঙ্কট ও মূল্যস্ফীতির ঘোর কৃষ্ণবর্ণ মেঘ।
আন্তর্জাতিক পরিসরে গাজায় ইজরাইলি আগ্রাসন রমজান মাসেও থামেনি, থামেনি ঈদের দিনেও। একটি জাতিকে বিলীন করে দিতে এরকম নগ্ন উন্মত্ততা আজকের সভ্য পৃথিবীতে কল্পনাও করা যায় না। কিন্তু তা চলছে সবার চোখের সামনেই। ফিলিস্তিনের মানুষ বহুদিন ধরে বিপন্ন। আরও বিপর্যয়ের মধ্যে তাদের রাখছে ইজরাইল। ফিলিস্তিনের বিধ্বস্ত জনপদ, নারী ও শিশু সহ লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু দেখে দেখে অশ্রুসজল নয়নে আমাদের ঈদ আজ।
ঈদ এলেই মানুষ এই শহরটি ছেড়ে ছুটতে থাকে প্রিয়জনের উদ্দেশ্যে। এই প্রাণপন ছুটে চলা শুধু প্রিয়জনের সাথে ঈদ করা নয়। তারা গ্রামকে আলিঙ্গন করতে চায়। কারণ বাংলাদেশের গ্রামেই তার নাড়ি। সেখানকার স্বজনেরা ভালোবাসায় আর মমত্বে সজীব। ঈদ, পহেলা বৈশাখ, দুর্গাপূজাসহ সব উৎসবে বাঙালি গ্রামীণ আমজনতা একাত্ম।
আমাদের এটাই উৎসব সংস্কৃতি। আমাদের সব উৎসবে এই সাংস্কৃতিক উপাদান সংগঠিত ও স্পষ্ট। গ্রামসংস্কৃতির এই চর্চা আমাদের ঐতিহ্য। কিন্তু উৎসব সব জায়গায় সমানভাবে আসে না, এবারও আসেনি। শহর বা গ্রাম সব খানেই ঈদের আনন্দ একটি নতুন বিত্তবান শ্রেণির দখলে চলে গেছে। সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ করার সুযোগ সীমিত। এই আসাম্যকে সাথে নিয়ে আজ আমাদের ঈদ।
আমাদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে অনেক সমস্যা আছে, আছে অনেক সংকট। তা সত্ত্বেও বিভিন্ন জাতীয় উৎসবে শ্রেণি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষ শরিক হয়। যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী প্রিয়জনকে নতুন পোশাক ও উপহার সামগ্রী কিনে দেয়। যারা সারাবছর জীর্ণ পোশাকে থাকে, তারাও ঈদের দিনে সন্তানদের গায়ে নতুন পোশাক পরাতে চায়।
ঈদ যে আনন্দের বার্তা বয়ে আনে, তার মর্মমূলে থাকে শান্তি ও ভালোবাসা। ঈদ আমাদের সামষ্টিক জীবনে মিলন ও শুভবোধের চর্চার দৃষ্টান্ত। কিন্তু এই ঈদের আগে আগেই অনেক কারখানায়, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা ঈদ বোনাস পায়নি, তারা সড়কে বিক্ষোভ করতে গিয়ে পুলিশের সাথে সংঘর্ষে জড়িয়েছে। অনেক পরিবার ভয়ংকর রাজনৈতিক ও গোষ্ঠিগত বিদ্বেষ ও সহিংসতার শিকার হয়েছে। তাদের আর্তনাদ আমাদের ভারাক্রান্ত করেছে।
তবুও ঈদ আসে, উৎসব আসে। ঈদ সবার জীবনে আনন্দ বয়ে আনুক। সব উৎসবই হয়ে উঠুক আমাদের শুভেচ্ছা ও সম্প্রীতির সংস্কৃতি। ঈদ আসে, ঈদ চলেও যায়। একটু আমোদে সুখে স্বাচ্ছন্দ্যে আরো একটু বেশি বেশি ভালো থাকতে চায় সবাই। মানুষ মেতে থাকতে চায় নিরাপদ উৎসবে, পার্বণে, ছুটিতে।
Comments