জোট টিকবে তো? বিকল্প ভাবনায় জামায়াত-চরমোনাই
আসন বণ্টনের দ্বন্দ্বে জোট ভাঙলে বিকল্প নির্বাচনী কৌশল কী হবে– তা খুঁজছে জামায়াতে ইসলামী ও চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন। জামায়াত সূত্র জানিয়েছে, ইসলামী আন্দোলন বেরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকায় এনসিপি এবং মাওলানা মামুনুল হকের বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসসহ অন্য দলগুলোকে নিয়ে জোট রক্ষার চেষ্টা চলছে। ইসলামী আন্দোলন আভাস দিয়েছে, জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতা না হলে বাংলাদেশ খেলাফত এবং জোটের অপর তিন ধর্মভিত্তিক দলকে নিয়ে নতুন জোট হতে পারে।
তবে সব দলই প্রকাশ্যে বলছে, জোট ভাঙবে না। আসন সমঝোতার আলোচনা চলছে। শিগগির তা সম্পন্ন হবে। কিন্তু এ বক্তব্য দলগুলো এক মাস ধরেই দিচ্ছে। ভোটের আর এক মাসেরও কম সময় থাকলেও নিজেদের মধ্যে আসন সমঝোতা করতে পারেনি জামায়াত, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলনসহ ১১ দলের নির্বাচনী জোট।
জোটের প্রার্থী তালিকা ঘোষণায় গতকাল বুধবার জামায়াত সংবাদ সম্মেলন ডেকেও তা স্থগিত করে চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন ও মামুনুল হকের বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের বর্জনের হুঁশিয়ারিতে।
১১ দল সূত্র জানিয়েছে, ইসলামী আন্দোলনকে সর্বোচ্চ ৪৫টি আসন ছাড়তে রাজি রয়েছে জামায়াত। পাঁচটি আসন উন্মুক্ত রাখার প্রস্তাব দিয়েছে। সেখানে দাঁড়িপাল্লা ও হাতপাখা উভয় প্রতীকের প্রার্থী থাকবে। তবে একসময়ে ১৫০ আসন দাবি করা ইসলামী আন্দোলন এখন কমপক্ষে ৬৫টি আসন চায়। আসন সমঝোতা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তারা সংবাদ সম্মেলনে না যাওয়ার বার্তা দেয় জামায়াতকে।
মামুনুল হকের খেলাফতকে ১৬টি আসন ছাড়তে রাজি হয়েছে জামায়াত। এই দলকেও কয়েকটি আসন উন্মুক্ত রাখার প্রস্তাব করেছে। তবে ২৫ আসনের কমে রাজি নন মামুনুল হক। তিনি ইসলামী আন্দোলনকে নিয়েই জোটে থাকতে চান। তিনিও দলটির সঙ্গে জামায়াতের সমঝোতার আগে প্রার্থী তালিকা ঘোষণার বিপক্ষে। মামুনুল হক গতকাল দুপুরে এ বার্তা দেওয়ার পর জামায়াত সংবাদ সম্মেলন স্থগিত করে।
বিকল্প ভাবনায় জামায়াত, শূন্য আসনে সংকট
জামায়াতের একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতা সমকালকে বলেছেন, ইসলামী আন্দোলনকে কোনো অবস্থাতেই ৪৫টির বেশি আসন দেওয়া সম্ভব নয়। দলটিকে ৪৫টি আসন দেওয়ার চিন্তা ছিল। কিন্তু গত মাসের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার দুদিন আগে এনসিপি, এলডিপি ও এবি পার্টি জোটে যুক্ত হয়। ইসলামী আন্দোলন, বাংলাদেশ খেলাফতসহ অন্যান্য দলের সম্মতিতে তাদের জোটে নেওয়া হয়। এই তিন দলকে ৩৮টি আসন দিতে হচ্ছে।
জামায়াতের একজন জ্যেষ্ঠ নেতা সমকালকে বলেছেন, পুরোনো শরিকদের আসন থেকে কিছু ছাড় দিতে অনুরোধ করা হয়েছিল। এনসিপি, এবি, এলডিপির জন্য ইসলামী আন্দোলনের ভাগ থেকে ১২-১৩টি আসন দিতে বলা হয়েছিল। তাতে তারা রাজি হয়নি। জামায়াত শেষ পর্যন্ত হাতপাখাকে ৪৫টি আসন ছেড়ে দিয়েছে। কিন্তু তারা ৬৫ থেকে ৭০টি আসনের দাবিতে অনড়, যা পূরণ করা সম্ভব নয়। ফলে তারা যদি চলে যায়, জামায়াতের কিছু করার নেই।
জামায়াতের আরেকজন জ্যেষ্ঠ নেতা সমকালকে বলেছেন, তাদের দলীয় জরিপ অনুযায়ী, ইসলামী আন্দোলন সাংগঠনিকভাবে গোছানো হলেও সারাদেশে সর্বোচ্চ ৩ শতাংশ জনসমর্থন রয়েছে। সে তুলনায় অনেক বেশি আসন ছাড়া হয়েছে দলটিকে। জামায়াতের জরিপ অনুযায়ী, এনসিপির জনসমর্থন ৭ শতাংশ। দলটিকে দেওয়া হয়েছে ৩০ আসন, যা তারা মেনে নিয়েছে। এ অবস্থায় ইসলামী আন্দোলন চলে গেলে বাংলাদেশ খেলাফত, এনসিপিকে নিয়ে জামায়াত নির্বাচনে অংশ নেবে। প্রয়োজনে মামুনুল হকের দলকে আরও কিছু আসন ছাড়বে।
নির্বাচনে ২৭৬ আসনে প্রার্থী দিয়েছে জামায়াত। এনসিপির জন্য ৭, বাংলাদেশ খেলাফতের জন্য ৮, খেলাফত মজলিসের জন্য ৪, বিডিপি ও এবি পার্টির জন্য দুটি করে আসনে প্রার্থী দেয়নি জামায়াত। এলডিপির জন্য একটি আসনে প্রার্থী দেয়নি।
মামুনুল হকের দলের জন্য যে আটটি আসনে প্রার্থী দেয়নি জামায়াত, এর দুটিতে অন্য জোট সঙ্গীর প্রার্থী রয়েছে। ফলে বাংলাদেশ খেলাফত জোট ছাড়লে ছয়টি আসনে শেষ পর্যন্ত জামায়াত-এনসিপি জোটের প্রার্থীই থাকবে না। এ বাস্তবতা ছাড়াও হেফাজতে ইসলাম যাতে প্রতিপক্ষ না হয়, সে জন্য মামুনুল হকের দলকে ধরে রাখার চেষ্টা করছে জামায়াত।
জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের সমকালকে বলেছেন, সমঝোতা যাতে বজায় থাকে সে জন্যই জামায়াত সংবাদ সম্মেলন স্থগিত করেছে। আলোচনায় সব সমাধান হয়ে যাবে।
নতুন জোটের আভাস চরমোনাই পীরের দলের
গত মঙ্গলবার মধ্যরাত পর্যন্ত ইসলামী আন্দোলনের কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার বৈঠক চলে রাজধানীর একটি মাদ্রাসায়। জামায়াত ৪৫টির বেশি আসন ছাড়তে রাজি হওয়ায় করণীয় কী– এ প্রশ্নে শূরার সদস্যদের কাছে মতামত চান চরমোনাই পীর ও ইসলামী আন্দোলনের আমির সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম।
২৬৬ আসনে প্রার্থী দিয়েছে ইসলামী আন্দোলন। মজলিসে শূরার অধিকাংশ সদস্য মত দেন, এক বছরের বেশি সময় ধরে এই প্রার্থীরা মাঠে কাজ করছেন, তারা নির্বাচন করতে না পারলে ক্ষুব্ধ হবেন। তাই অন্তত ৭০ আসনে নির্বাচন করতে হবে।
শূরার কিছু সদস্য মত দেন, জামায়াতের ছেড়ে দেওয়া ৪০-৪৫ আসনে নয়, এককভাবে নির্বাচন করা উচিত। জামায়াত নবগঠিত এনসিপিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। চরমোনাই পীরকে অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে জোটে থাকা উচিত নয়। বৈঠকে উপস্থিত একাধিক নেতা সমকালকে এসব কথা জানান।
এ পরিস্থিতিতে দলের আমির শূরা সদস্যদের জানিয়ে দেন, আসন সমঝোতা না হওয়া পর্যন্ত জামায়াতের ডাকা সংবাদ সম্মেলনে যাবেন না। জোটে থাকা-না থাকার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পরিষদ মজলিসে আমেলার বৈঠকে।
তবে বুধবার দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত জ্যেষ্ঠ নেতাদের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়নি। বৈঠক সূত্র জানায়, ছয় মাস ধরে একসঙ্গে আন্দোলন এবং ভোটের প্রস্তুতি নেওয়ায় নির্বাচনের প্রাক্কালে জোট ছেড়ে এককভাবে বেরিয়ে যাওয়া উচিত হবে না– এমন মত এসেছে।
বৈঠকের পর দলটির মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান বলেছেন, চরমোনাই পীরই ইসলামপন্থিদের ভোট এক বাক্সে আনার নীতি ঘোষণা করেছিলেন। পারস্পরিক আলোচনা চলছে। শিগগির ইসলামপন্থিদের ভোট এক বাক্সে আনার নীতির রূপরেখা ও ধরন পরিষ্কার হবে।
বিকল্প জোটের আভাস দিয়ে গাজী আতাউর বলেন, আশা করা হয়েছিল, মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের আগে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দলের সব স্তরের নেতাদের মতামত নেওয়া হয়েছে। প্রার্থীদের কথা শোনা হয়েছে। দলের নীতিনির্ধারণী ফোরাম বৈঠক থেকে যেসব দলের সঙ্গে শুরু থেকে পথচলা হচ্ছে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে।
ইসলামপন্থিদের ভোট এক বাক্সে আনার পরিকল্পনা ঘোষণা করে গত মে মাসে ইসলামী আন্দোলন, বাংলাদেশ খেলাফত, মাওলানা বাছিত আযাদের খেলাফত মজলিস, নেজামী ইসলাম পার্টি, খেলাফত আন্দোলন এবং জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম মোর্চা গঠনের আলোচনা শুরু করে। পরে জমিয়ত চলে যায় বিএনপির জোটে, যুক্ত হয় জামায়াত।
ইসলামী আন্দোলন সূত্র জানিয়েছে, জামায়াতের সঙ্গে আসন সমঝোতা না হলে দুই খেলাফত মজলিস, খেলাফত আন্দোলন এবং নেজামে ইসলামকে নিয়ে প্রয়োজনে বিকল্প জোট হতে পারে চরমোনাই পীরের নেতৃত্বে।
মামুনুলের দলের নানা হিসাব
জামায়াত সূত্র জানিয়েছে, তাদের পরিকল্পনা ছিল ইসলামী আন্দোলনের জন্য ৪৫ আসন খালি রেখে জোটের প্রার্থী ঘোষণা করা। তবে মামুনুল হকের কারণে তা হয়নি। তিনি জামায়াতকে জানিয়ে দেন, ইসলামী আন্দোলনকে রেখে তিনি আসবেন না। এ ক্ষেত্রে জোট ভেঙে যাবে। তিনি জামায়াত আমিরকে পরামর্শ দেন ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে সমস্যা সমাধানে।
গতকাল বুধবার বাংলাদেশ খেলাফতের বৈঠকে জোট অটুট রাখার পক্ষে মত আসে। সিদ্ধান্ত হয়, আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার। কিন্তু বাংলাদেশ খেলাফত ১৬টি আসন মানবে না। যদি ইসলামী আন্দোলন জোট ছাড়ে, তাহলে কী পরিস্থিতি হবে বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে যুগ্ম মহাসচিব আতাউল্লাহ আমিন বলেছেন, আলোচনার মাধ্যমে আসন বণ্টনের সুরাহা হবে বলে তারা আশাবাদী।
১১ দলের সমন্বয়ক এবং জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ সমকালকে বলেছেন, কয়েকটি আসন নিয়ে মতভিন্নতা রয়েছে। তা দূর করতে আলাপ-আলোচনার জন্য সময় নেওয়া হয়েছে। শিগগির সংবাদ সম্মেলন হবে।
Comments