ঢাকার অনানুষ্ঠানিক জনমত কোথায় তৈরি হয়?
গ্রামের কোনো চায়ের দোকানে বসলে বুঝতে পারবেন, আলোচনার জন্য মানুষের বিষয়বস্তুর অভাব নেই। বাংলাদেশ থেকে আমেরিকা, তারেক রহমান থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্প, এমনকি ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধও উঠে আসে চায়ের আড্ডায়। যিনি কথা বলছেন, তিনি হয়তো কোনো দিন যুদ্ধক্ষেত্রও দেখেননি। তবু এসব নিয়ে তার নিজস্ব মতামত আছে, যুক্তি আছে, কখনো ক্ষোভও আছে।
গ্রাম থেকে শহরে এলে প্রশ্ন জাগে, ঢাকার এমন আড্ডা কোথায়? উত্তর খুঁজতে খুব বেশি দূরে যেতে হয় না। রিকশার গ্যারেজ, লেগুনার স্ট্যান্ডে বসে থাকলেই নানা আলোচনা কানে আসতে পারে। কোথাও যানজট নিয়ে বিরক্তি, কোথাও নিত্যপণ্যের দাম নিয়ে ক্ষোভ। আবার কোথাও সরকারের সিদ্ধান্ত বা কোনো প্রতিষ্ঠানের সেবা নিয়ে তর্ক। এসব কথাবার্তার সবটাই যে নির্ভুল তথ্যের ওপর দাঁড়িয়ে, তা নয়। কিন্তু মানুষ কী ভাবছে, কী নিয়ে অসন্তুষ্ট হচ্ছে তা জানা যায়। এছাড়াও কোন খবরকে বিশ্বাস করছে-তার কিছু ইঙ্গিত এসব আড্ডায় পাওয়া যায়।
জনসংযোগ নিয়ে কথা বললে সাধারণত সংবাদ বিজ্ঞপ্তি, গণমাধ্যম, বিজ্ঞাপন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কথা আসে। কিন্তু মানুষের মতামত কি শুধু এসব জায়গাতেই তৈরি হয়? যে মানুষ সারাদিন রাস্তায় কাজ করেন, যার কাছে প্রতিদিন নতুন নতুন মানুষ আসেন, তার কাছেও তো নানা খবর পৌঁছায়। তিনি আবার সেই খবর অন্যদের জানান। এভাবেই শহরের এক প্রান্তের কথা আরেক প্রান্তে পৌঁছে যায়।
খবর আসে, মতামতও তৈরি হয়
ধরা যাক, কোনো সড়কে নতুন নিয়ম চালু হয়েছে। কর্তৃপক্ষ যথারীতি বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে। সংবাদমাধ্যমেও খবর প্রকাশ হয়েছে। কিন্তু একজন রিকশাচালক নিয়মটি কীভাবে বুঝলেন? লেগুনাচালক জানলেন কোথা থেকে? তাদের কাজের ওপর এর কী প্রভাব পড়ছে? এসব প্রশ্নের উত্তর শুধু বিজ্ঞপ্তি পড়ে পাওয়া যাবে না।
এক চালক হয়তো অন্য চালকের কাছ থেকে নিয়মটি শুনেছেন। কেউ নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে সেটির ব্যাখ্যা করছেন। কেউ আবার শোনা কথাই সত্য বলে ধরে নিচ্ছেন। এভাবে একই তথ্য নিয়ে ভিন্ন ধারণা তৈরি হতে পারে। পরে কেউ ভুল বুঝতে পারেন, কেউ নিজের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে মত বদলাতে পারেন। আবার কেউ আগের ধারণাতেই অটল থাকতে পারেন।
জনসংযোগের কাজ এখানেই কেবল তথ্য প্রচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। মানুষ তথ্যটি পেয়েছে কি না, কীভাবে বুঝেছে এবং বাস্তবে কী অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হচ্ছে-সেটিও বোঝা জরুরি। কারণ তথ্য প্রকাশ আর সেই তথ্য মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য ও বোধগম্য হওয়া এক কথা নয়।
যাদের কথা কম শোনা হয়
ঢাকার রিকশাচালক বা লেগুনাচালকরা শহরের পরিবর্তন খুব কাছ থেকে দেখেন। কোন সড়কে যানজট বাড়ছে, কোথায় যাত্রীদের ভোগান্তি, কোন নিয়ম মানতে গিয়ে সমস্যা হচ্ছে-এসব বিষয়ে তাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা আছে। কিন্তু এসব অভিজ্ঞতা সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের কাছে কতটা পৌঁছায়, সেটি আলাদা প্রশ্ন।
কোনো প্রতিষ্ঠান বা কর্তৃপক্ষ মানুষের মনোভাব জানতে চাইলে সাধারণত জরিপ, সভা বা অনলাইন প্রতিক্রিয়ার ওপর নির্ভর করতে পারে। কিন্তু যারা এসব প্রক্রিয়ায় সহজে অংশ নিতে পারেন না, তাদের অভিজ্ঞতা বাদ পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। অথচ তাদের মতামত শুনলে এমন কিছু সমস্যা সামনে আসতে পারে, যা অফিসে বসে বোঝা কঠিন।
এখানে চায়ের দোকান বা গ্যারেজকে জনমত বোঝার একমাত্র জায়গা ভাবার কারণ নেই। আড্ডায় কয়েকজনের মতামত শুনেই পুরো শহরের মানুষের মনোভাব নির্ধারণ করা যাবে না। তবে এসব জায়গা থেকে প্রশ্ন তৈরি করা যায়। পরবর্তীতে সাক্ষাৎকার, পর্যবেক্ষণ বা গবেষণার মাধ্যমে সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা যায়।
মানুষের কথা শোনা মানে শুধু প্রচারণা নয়
জনসংযোগের আরেকটি ঝুঁকি হলো, সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগকেও কখনো কখনো প্রচারণার সুযোগ হিসেবে দেখা। প্রতিষ্ঠানকে শুধু মাত্র নিজেদের কথা জানালেই হবে না। মানুষের মন্তব্য শোনার অভ্যাস তৈরি করতে হবে। অন্যথায় সম্পর্ক তৈরি হওয়ার বদলে দূরত্ব বাড়তে পারে।
রিকশার গ্যারেজে বা লেগুনার স্ট্যান্ডে গিয়ে মানুষের কথা শোনার অর্থ তাদের দিয়ে কোনো বক্তব্য বলানো নয়। বরং তারা কী জানেন, কোন তথ্য নিয়ে বিভ্রান্ত, কোন সেবায় অসন্তুষ্ট এবং কেন-সেটি বোঝার চেষ্টা করা। তাদের বক্তব্যের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের নিজের ধারণা না মিললেও সেই পার্থক্যকে গুরুত্ব দিতে হবে।
ঢাকার চায়ের দোকান, গ্যারেজ ও পরিবহন স্ট্যান্ড নিয়ে জনসংযোগ গবেষণা হতে পারে এভাবেই। কারা সেখানে কথা বলেন। কোন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়, খবর কোথা থেকে আসে। একই সাথে মানুষের নিজস্ব অভিজ্ঞতা সেই আলোচনাকে কীভাবে প্রভাবিত করে-এসব অনুসন্ধান করলে শহরের অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ সম্পর্কে বাস্তব ধারণা পাওয়া সম্ভব।
শহরের সব মতামত সংবাদপত্রের পাতায় আসে না। সব অভিযোগ পৌঁছায় না কর্তৃপক্ষের টেবিলে। কিছু কথা থেকে যায় রাস্তার পাশের বেঞ্চে। চায়ের কাপের ফাঁকে বা যাত্রীর অপেক্ষায় থাকা চালকদের আড্ডায়। জনসংযোগের দৃষ্টিতে সেই কথাগুলোও শোনার মতো। কারণ মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে হলে, আগে জানতে হয় মানুষ আসলে কী বলছে।
Comments