ইউরোপের কঠোর ‘কিডস অ্যাক্ট’ বনাম টেক জায়ান্ট: বাংলাদেশের করণীয়
আজকের শিশুরা বড় হচ্ছে এমন এক সময়ে, চারদিকে যার কেবল মুঠোফোন আর ইন্টারনেটের আলো। শহুরে ফ্ল্যাটের বন্দি জীবন বা মফস্বলের উঠান—সবখানেই তাদের নিত্যসঙ্গী ইউটিউব, ফেসবুক বা টিকটকের অন্তহীন ভিডিও। সারাক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকায় শিশুরা শুধু শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ হচ্ছে না, বরং সাইবার বুলিং, অতিরিক্ত আসক্তি ও একাকীত্বের অন্ধকারে হারাচ্ছে। এই অবস্থার পরিবর্তন আনতে এবার বড় পদক্ষেপ নিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। সম্প্রতি ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেইন ফ্রান্সের স্ট্রাসবুর্গে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে বার্ষিক ভাষণে শিশুদের অনলাইন সুরক্ষায় যুগান্তকারী 'কিডস অ্যাক্ট' (Kids Act) বা শিশু সুরক্ষা আইন চালুর প্রস্তাব দিয়েছেন। রয়টার্সসহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এই ঘোষণা নিয়ে এখন বিশ্বজুড়ে চলছে তুমুল আলোচনা।
প্রস্তাবিত আইনের মূল কথা ও বয়সভিত্তিক কড়াকড়ি
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও এপির খবর অনুযায়ী, শিশুদের অনলাইন আসক্তি দূর করতে এবং নিরাপদ রাখতে ইউরোপীয় কমিশন কিছু কঠোর নিয়ম আনছে:
১৩ বছরের নিচে পুরোপুরি নিষেধাজ্ঞা: ১৩ বছরের কম বয়সী শিশুরা কোনোভাবেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, অনলাইন গেম বা চ্যাটবট ব্যবহার করতে পারবে না।
১৫ বছরের নিচে ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট নিষিদ্ধ: ১৫ বছরের কম বয়সীদের নিজস্ব কোনো স্বাধীন অ্যাকাউন্ট বা প্রোফাইল খোলার অনুমতি থাকবে না।
অভিভাবকের নজরে 'মিনি অ্যাকাউন্ট': ১৩ থেকে ১৫ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীরা শুধু বাবা-মা বা অভিভাবকের সরাসরি তত্ত্বাবধানে সীমিত সুবিধার অ্যাকাউন্ট চালাতে পারবে। সেখানেও প্রতিদিনের জন্য সর্বোচ্চ ১ ঘণ্টা সময় নির্ধারিত থাকবে। এছাড়া ১৫ থেকে ১৮ বছর বয়সীদের জন্য প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাধ্যতামূলকভাবে 'নিরাপদ ডিজাইন' নিশ্চিত করতে হবে।
বড় কোম্পানির একচেটিয়া ব্যবসা ও ইউরোপের অবস্থান
ভাষণে বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পানির একচ্ছত্র প্রভাব ও খেয়ালখুশিমতো চলার তীব্র সমালোচনা করেন ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, "অনেকেই মনে করেন টেক জায়ান্টগুলোর ক্ষমতা এত বেশি যে আটকানো সম্ভব নয়। কিন্তু আমি তা মানি না। ইউরোপের ক্ষমতা আছে নিয়ম বাঁধার। নিয়ম কেমন হবে তা আমরাই ঠিক করব, কোনো প্রযুক্তি কোম্পানি নয়।" তিনি আরও বলেন, এই কোম্পানিগুলো জেনেশুনেই শিশুদের ক্ষতিকর কনটেন্ট ও আসক্তিযুক্ত ফিচারের দিকে ঠেলে দেয়, যা আর মেনে নেওয়া যায় না। শুধু ছোট নয়, বড়দের ওপরও এর খারাপ প্রভাব পড়ছে। তাই আসছে শরৎকালেই কমিশন 'ডিজিটাল ফেয়ারনেস অ্যাক্ট' বা ডিজিটাল ন্যায্যতা আইন আনছে।
আন্তর্জাতিক ঐক্য এবং অভিভাবকদের হাতে আসল নিয়ন্ত্রণ
এই সংকট একা ইউরোপের নয়; তাই কানাডা ও যুক্তরাজ্যের মতো সমমনা দেশগুলোর সাথে মিলে যৌথভাবে এআই নিরাপত্তা, যাচাইকরণ পদ্ধতি ও প্রাথমিক সতর্কবার্তা ব্যবস্থা নিয়ে কাজের ঘোষণা এসেছে। নতুন এই 'কিডস অ্যাক্ট' পাস হলে ইন্টারনেটের লাগাম বা নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠি আবার অভিভাবকদের হাতে ফিরবে। পাশাপাশি, শিশুরা অনলাইনে পুরোপুরি নিরাপদ কি না—তার আইনি ও নৈতিক দায় বর্তাবে ওই প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ওপর। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্ক্রিনের আলোয় হারিয়ে যেতে বসা একটি প্রজন্মকে বাঁচাতে এমন কড়া আইন ও আন্তর্জাতিক একতাই সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: কতটা মিল আছে আমাদের সাথে?
ইউরোপের আদলে ১৩ বা ১৫ বছরের নিচে সোশাল মিডিয়া বন্ধ করার এই চিন্তাটি আমাদের বর্তমান বাস্তবতায় অত্যন্ত জরুরি ও সময়োপযোগী। করোনাকালের পর থেকে অনলাইন ক্লাস ও ইন্টারনেটের সুবাদে খুব ছোট বাচ্চাদের হাতেও স্মার্টফোন তুলে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এর ফল মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। শহর হোক বা গ্রাম, শিশুরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা পাবজি, ফ্রি ফায়ার বা ফেসবুকের ছোট ভিডিওতে বুঁদ থাকছে। ইউরোপের মতো আমাদের দেশেও যদি এই বয়সভিত্তিক কড়াকড়ি বা আইন না করা হয়, তবে আগামীতে পুরো প্রজন্ম চরম মানসিক অবসাদ ও অমনোযোগিতার শিকার হবে।
পরিসংখ্যান যা বলছে: বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার হিসাব
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) এবং ইউনিসেফের সাম্প্রতিক সমীক্ষায় শিশুদের ডিজিটাল আসক্তির যে চিত্র উঠে এসেছে, তা উদ্বেগের:
দেশের ৫ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সের জনসংখ্যার বড় অংশ এখন ইন্টারনেটের সাথে যুক্ত, যার মধ্যে শিশু-কিশোরদের সংখ্যা বাড়ছে। বিবিএস ও আইসিটি জরিপ বলছে, শিশু-কিছোরদের বিশাল অংশ নিয়মিত ইন্টারনেট ব্যবহার করছে।
রাজধানী ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে এই চিত্র আরও ভয়াবহ। ঢাকায় শিশুদের মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যবহারের হার প্রায় ৬০ শতাংশের বেশি। শহরের বাসাগুলোতে খেলার মাঠ না থাকা এবং ফ্ল্যাট সংস্কৃতির কারণে বিনোদনের একমাত্র মাধ্যম হয়েছে এই মোবাইল স্ক্রিন।
স্কুল-কলেজ, মেসেঞ্জার গ্রুপ এবং শিক্ষকদের না বোঝার ভুল
শিশুদের স্ক্রিন আসক্তির পেছনে কেবল বিনোদন বা গেম একা দায়ী নয়; এর সাথে জড়িয়ে আছে পড়াশোনার ভুল পদ্ধতি। আজকাল প্রাইমারি থেকে শুরু করে স্কুল, কলেজ বা কোচিং সেন্টারে পড়াশোনার নোটিশ বা বাড়ির কাজের জন্য হোয়াটসঅ্যাপ (WhatsApp) বা মেসেঞ্জার (Messenger) গ্রুপ থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
পড়াশোনার নামে স্ক্রিন টাইম বাড়া: হোমওয়ার্ক বা জরুরি নোটিশের অজুহাতে কোমলমতি শিশুদের হাতে ফোন দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু তারা পড়ার জন্য গ্রুপে ঢুকে পড়াশোনা বাদ দিয়ে ফেসবুকের রিলস বা অন্য আসক্তিযুক্ত ফাঁদে আটকা পড়ছে।
শিক্ষকদের অজান্তেই বাড়িয়ে দেওয়া ঝুঁকি: অনেক শিক্ষক বা প্রতিষ্ঠান পড়াশোনার জন্য এসব গ্রুপের ওপর নির্ভরতা তৈরি করায় শিক্ষার্থীরা সারাক্ষণ মোবাইলে চোখ রাখতে বাধ্য হয়। শিক্ষকরা না বুঝেই শিশুদের ডিজিটাল আসক্তির দিকে ঠেলে দিচ্ছেন, যা নিয়ে নীতিনির্ধারক মহলে সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা নেই।
বাবা-মায়ের অসহায় অবস্থা: 'ডিজিটাল প্যাসিফায়ার'
আমাদের পরিবারগুলোতে বাবা-মায়েরা একপ্রকার অসহায়। শহুরে কর্মজীবী বাবা-মায়েরা সন্তানকে শান্ত রাখতে, কান্না থামানোর জন্য বা ঠিকমতো খাওয়ানোর জন্য খুব ছোটবেলা থেকেই হাতে স্মার্টফোন তুলে দিচ্ছেন—যাকে মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন 'ডিজিটাল প্যাসিফায়ার'। ইউরোপের আইন যেভাবে অভিভাবকদের ড্রাইভিং সিটে বসানোর কথা বলছে, আমাদের দেশে অভিভাবক নিজেই প্রযুক্তির কাছে হেরে যাচ্ছেন। শিশু ঘরে কার সাথে কথা বলছে, কেমন ভিডিও দেখছে বা বিপদে পড়ছে কি না—তা খেয়াল করার সময় বা সুযোগ অনেক পরিবারেরই নেই।
সাইবার বুলিং ও মানসিক স্বাস্থ্যের বড় ক্ষতি
সারাক্ষণ স্ক্রিনে থাকার কারণে এবং ফেসবুক-ইন্টারনেটের অবাধ ব্যবহারের ফলে আমাদের ছেলেমেয়েরা মারাত্মক সাইবার বুলিং (Cyberbullying) বা অনলাইন হেনস্তার শিকার হচ্ছে। অনলাইনে নানা ট্রোল বা বাজে কথার শিকার হয়ে শিশুরা একা হয়ে পড়ছে, বাড়ছে দুশ্চিন্তা, মন খারাপ (ডিপ্রেশন) ও ঘুমের সমস্যা। ফেক আইডি থেকে হয়রানির শিকার হয়ে কোমলমতি শিশুদের মনে যে গভীর ক্ষত তৈরি হচ্ছে, তা তাদের স্বাভাবিক বেড়ে ওঠাকে থামিয়ে দিচ্ছে। অথচ এই ডিজিটাল অপরাধ থেকে বাচ্চাদের বাঁচাতে পারিবারিক সচেতনতা বা আইনি সহায়তার সুযোগ খুবই সীমিত।
আইনি লড়াই: ইউরোপের আইন বনাম আমাদের দেশ
ইউরোপীয় ইউনিয়ন যেভাবে সোজা প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছে এবং বয়স যাচাই বা 'মিনি অ্যাকাউন্ট' চালুর কড়া নিয়ম আনছে, আমাদের দেশের আইন তার চেয়ে অনেকটাই আলাদা। আমাদের দেশে সাইবার নিরাপত্তা আইন বা তথ্যপ্রযুক্তি আইন থাকলেও, ফেসবুক, টিকটক বা ইউটিউবের মতো বড় কোম্পানিগুলোর আসক্তি তৈরি করা অ্যালগরিদম নিয়ন্ত্রণের জোরালো নিয়ম নেই। আমাদের আইন মূলত অপরাধ হওয়ার পর শাস্তির কথা বলে, কিন্তু ইউরোপের মতো কোম্পানিগুলোর ব্যবসার ধরন বা ডিজাইন বদলাতে বাধ্য করার শক্তিশালী আইনি হাতিয়ার নীতিনির্ধারকদের হাতে নেই।
শিশু সুরক্ষায় গবেষণা ও নীতিনির্ধারণী ভূমিকা: সিডিসিআরএ-এর পর্যবেক্ষণ
ডিজিটাল অর্থনীতির প্রসার ও শিশু সুরক্ষার এই সংকটময় বাস্তবতায় দেশের শীর্ষস্থানীয় গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ডিজিটাল কমার্স রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি (CDCRA) তাদের গবেষণালব্ধ উপাত্ত ও পলিসি বিশ্লেষণে বারবার সতর্ক করে আসছে। প্রতিষ্ঠানটির মতে, বাংলাদেশে কেবল প্রযুক্তি নিষিদ্ধ করা নয়, বরং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর আসক্তিপ্রবণ অ্যালগরিদম এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অনলাইনভিত্তিক অতিরিক্ত নির্ভরতা নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত জরুরি। শিশুদের সুরক্ষিত রাখতে সরকারি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যুগোপযোগী গাইডলাইন প্রণয়ন এবং কঠোর ডেটা প্রাইভেসি বা শিশু সুরক্ষা আইন বাস্তবায়নে সিডিসিআরএ নিয়মিত পলিসি অ্যাডভোকেসি ও গবেষণা পরিচালনা করে আসছে।
স্ক্রিনের এই গ্রাস থেকে শিশুদের বাঁচাতে হলে কেবল ইউরোপের দিকে তাকিয়ে থাকলেই চলবে না। আমাদের সরকার, তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, স্কুল-কলেজ এবং শিক্ষকদের এখনই বসে সিদ্ধান্ত নিতে হবে—পড়াশোনার নামে মেসেঞ্জার বা সামাজিক মাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার কীভাবে কমানো যায়। একই সাথে ফেসবুক বা টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোর ক্ষতিকর আসক্তি থেকে বাচ্চাদের বাঁচাতে শক্ত আইনি কাঠামো তৈরি করতে হবে। সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই যদি আমরা শিশুদের শৈশবকে এই স্ক্রিনের বন্দিদশা থেকে মুক্ত করতে না পারি, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এক অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়বে।
তথ্যসূত্র ও প্রামাণিক সূত্র:
১. রয়টার্স (Reuters) ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (AP): ইউরোপীয় কমিশন কর্তৃক প্রস্তাবিত 'কিডস অ্যাক্ট' এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সংবাদ প্রতিবেদন।
২. ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেইন: ইউরোপীয় পার্লামেন্টে দেওয়া বার্ষিক স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণ (১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, স্ট্রাসবুর্গ)।
৩. বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) ও ইউনিসেফ (UNICEF) বাংলাদেশ: জনসংখ্যা, জনমিতি এবং শিশু ও কিশোরদের মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যবহার সংক্রান্ত পরিসংখ্যান।
Comments