ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক আবেগের নয়, বাস্তবতার
ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ককে আমরা প্রায়ই দুই চরম প্রান্তে দাঁড় করিয়ে দেখি—কেউ একে ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ ও রক্তের সম্পর্কের আবেগে বিচার করেন; অন্য পক্ষ আবার সীমান্ত, পানি, বাণিজ্যঘাটতি বা রাজনৈতিক টানাপোড়েনের চশমা পরে পুরো সম্পর্কটিকে সন্দেহের চোখে দেখেন। দুটো দৃষ্টিই অসম্পূর্ণ।
রাষ্ট্রের সম্পর্ক আত্মীয়তার মতো হতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালিত হয় স্বার্থ, সক্ষমতা ও হিসাবের ভিত্তিতে। বাংলাদেশের জন্য ভারত না চিরবন্ধু, না চিরশত্রু; ভারত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী রাষ্ট্র, যার সঙ্গে সম্পর্কের মূল্য নির্ধারণ করতে হবে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ দিয়ে।
ভূগোল এখানে সবচেয়ে নির্মম সত্য। বাংলাদেশের তিন দিক প্রায় ভারতবেষ্টিত। নদী, সীমান্ত, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, বাণিজ্য ও নিরাপত্তার বহু বাস্তবতা দুই দেশকে পরস্পরের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছে। আবার বঙ্গোপসাগর, উত্তর-পূর্ব ভারত, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে আঞ্চলিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ভারতের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৩ সালে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহারের সুযোগ ভারতের জন্য কার্যকর হওয়া এই ভূগোলেরই অর্থনৈতিক প্রকাশ। ভারতীয় সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এসব বন্দর ব্যবহার করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও মূল ভূখণ্ডের মধ্যে পণ্য পরিবহনে সময় ও ব্যয় কমার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বাণিজ্যের অঙ্কও আবেগকে বেশ ভালোভাবেই চ্যালেঞ্জ করে। ভারতের সরকারি হিসাবে ২০২৩–২৪ অর্থবছরে দুই দেশের পণ্যবাণিজ্য ছিল প্রায় ১৪.০১ বিলিয়ন ডলার; একই সময়ে বাংলাদেশ ভারত থেকে আমদানি করেছে বিপুল পরিমাণ পণ্য, বিপরীতে ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল ১.৯৭ বিলিয়ন ডলার।
বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ বলছে, ভারতীয় বাজারের সঙ্গে গভীর বাণিজ্যিক সংযোগ বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়াতে পারে। সেখানে বাংলাদেশ–ভারত গভীর বাণিজ্যচুক্তির সম্ভাব্য প্রভাবে বাংলাদেশের জিডিপি ০.৫ শতাংশ এবং রপ্তানি ৩.৯ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে মডেলভিত্তিক হিসাব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ প্রশ্নটি ভারতকে ভালোবাসব কি না, সেটি নয়; প্রশ্ন হলো ভারতীয় বাজারকে বাংলাদেশ কতটা দক্ষতার সঙ্গে বাংলাদেশের শিল্প ও রপ্তানির কাজে লাগাতে পারবে।
তবে এখানেই একটি অস্বস্তিকর সত্য আছে। বড় বাজার মানেই বড় সুযোগ নয়, যদি দেশীয় উৎপাদনশীলতা দুর্বল থাকে। ভারত থেকে তুলনামূলক সস্তা পণ্য আসবে, বাংলাদেশের শিল্প প্রতিযোগিতায় পড়বে—এটিও স্বাভাবিক। তাই ভারতীয় বাজারে প্রবেশের আলোচনা শুধু শুল্ক কমানোর আলোচনা হতে পারে না। মান, পরীক্ষণ, অশুল্ক বাধা, সীমান্ত অবকাঠামো, কাস্টমস, রেল ও নৌযোগাযোগ—সবকিছুকে একই হিসাবের মধ্যে আনতে হবে। বিশ্বব্যাংকও ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে উচ্চ শুল্ক, প্যারাট্যারিফ ও অশুল্ক বাধাকে বাণিজ্যের বড় প্রতিবন্ধক হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
বিদ্যুতের ক্ষেত্রেও বাস্তবতা স্পষ্ট। ভারতের সরকারি নথি অনুযায়ী, বাংলাদেশ ভারত থেকে ১,১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করেছে। বিদ্যুৎ আমদানি নিজে কোনো জাতীয় অপমান নয়; আবার একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতাও কৌশলগতভাবে বুদ্ধিমানের কাজ নয়। বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত উৎসের বৈচিত্র্য, প্রতিযোগিতামূলক মূল্য এবং নির্ভরযোগ্য সরবরাহ। ভারত থেকে বিদ্যুৎ আসবে, চীন বা অন্য দেশ থেকে প্রযুক্তি আসবে, দেশীয় উৎপাদনও বাড়বে—রাষ্ট্রের হিসাবটা এমনই হওয়া উচিত।
পানি ও সীমান্তের প্রশ্নে অবশ্য অর্থনীতির সঙ্গে সার্বভৌমত্বের বিষয়ও জড়িয়ে আছে। সীমান্তে প্রাণহানি, নদীর পানি বণ্টন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা কিংবা আন্তঃসীমান্ত অপরাধ—এসব বিষয়ে বন্ধুত্বপূর্ণ ভাষা যথেষ্ট নয়; দরকার নিয়মিত আলোচনা, তথ্যের স্বচ্ছতা এবং কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরেও দুই দেশের কোস্টগার্ড ও অন্যান্য সংস্থার সমন্বয়ে বাংলাদেশি ও ভারতীয় জেলেদের পারস্পরিক প্রত্যাবাসন হয়েছে। এই ঘটনাগুলো মনে করিয়ে দেয়—রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের আসল পরীক্ষা বড় সম্মেলনের ছবি নয়, সীমান্তের ছোট সমস্যাগুলো কতটা সভ্যভাবে সমাধান করা যায়।
ঢাকার জন্য আরেকটি শিক্ষা জরুরি: ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রাখার অর্থ ভারতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে যাওয়া নয়। একইভাবে ভারতকে ভারসাম্যে রাখার অর্থ চীন, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান কিংবা অন্য কারও দিকে অন্ধভাবে ঝুঁকে পড়াও নয়। ২০২৬ সালের আগস্টে বাংলাদেশে ভারতীয় শিল্প ও ব্যবসায়ীদের একটি প্রতিনিধি দল সফর করেছে এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগে পারস্পরিক স্বার্থের কথা জানিয়েছে। এর অর্থ খুব সাধারণ—রাজনৈতিক সম্পর্কের ওঠানামার মধ্যেও ব্যবসা ও অর্থনীতির নিজস্ব বাস্তবতা থাকে।
ভূ-রাজনৈতিক বাণিজ্য ও উন্নয়ন কৌশলবিদদের আপত্তি আসলে দুই ধরনের অন্ধত্বের বিরুদ্ধে। একদিকে এমন আবেগ, যেখানে ১৯৭১-এর ঐতিহাসিক ঋণকে বর্তমানের প্রতিটি দ্বিপক্ষীয় সমস্যার উত্তর মনে করা হয়। অন্যদিকে এমন ক্ষোভ, যেখানে আজকের প্রতিটি বিরোধকে ভারতের বিরুদ্ধে স্থায়ী শত্রুতার প্রমাণ হিসেবে দেখা হয়।
রাষ্ট্রের কূটনীতি এভাবে চলে না। ১৯৭১ আমাদের ইতিহাস; সীমান্ত, পানি, বাণিজ্য, বিদ্যুৎ, বিনিয়োগ ও আঞ্চলিক যোগাযোগ আমাদের বর্তমান। আর ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে আমরা কতটা দক্ষতার সঙ্গে নিজের স্বার্থ সংজ্ঞায়িত করতে পারি তার ওপর।
বাংলাদেশের দরকার ভারতবিরোধিতা নয়, ভারত-নির্ভরতাও নয়; দরকার ভারত-সম্পর্কে সক্ষমতা। যেখানে স্বার্থ মিলবে, সেখানে সহযোগিতা; যেখানে স্বার্থের সংঘাত হবে, সেখানে দৃঢ় আলোচনা; যেখানে বিকল্প দরকার, সেখানে বিকল্প তৈরি। বন্ধুত্ব থাকবে, ইতিহাস থাকবে, মানুষের সম্পর্ক থাকবে—কিন্তু রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের টেবিলে শেষ কথা বলবে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ।
আবেগ হৃদয়ে থাকুক। পররাষ্ট্রনীতি চলুক হিসাবের খাতায়।
লেখক: ভূরাজনৈতিক বাণিজ্য ও উন্নয়ন কৌশল বিশ্লেষক
Comments