বাণিজ্যের পালাবদলে বাংলাদেশের নতুন ভূরাজনীতি
বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের মানচিত্রে একটি লক্ষণীয় পরিবর্তন ঘটছে। একসময় চীন ও ভারতের ছায়ায় থাকা যুক্তরাষ্ট্র এখন মাসভিত্তিক হিসাবে ভারতের সঙ্গে দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদারের আসন নিয়ে প্রায় সমানে সমান লড়ছে। ২০২৫ সালের মে, আগস্ট ও ডিসেম্বর—তিন মাসে যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে ছাড়িয়ে দ্বিতীয় স্থানে উঠেছিল। ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের ৯.৬ শতাংশ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে, ভারতের অংশ ছিল ৮.০৯ শতাংশ।
২০২৬ সালেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে: জানুয়ারি, এপ্রিল, মে ও জুনে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের ওপরে ছিল। জুনে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ছিল ৩৪২.৫৮ বিলিয়ন টাকা, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ১৬০.৬৫ বিলিয়ন এবং ভারতের সঙ্গে ১৫২.৬৫ বিলিয়ন টাকা। অর্থাৎ বিষয়টি আর এক মাসের কাকতালীয় ঘটনা বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।
তবে এখানেই প্রথম সতর্কবার্তা। বলা ঠিক হবে না যে ভারতকে স্থায়ীভাবে পেছনে ফেলে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার হয়ে গেছে। বরং বলা ভালো, দুই দেশের অবস্থান এখন অত্যন্ত কাছাকাছি এবং মাসভেদে পালাবদল হচ্ছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভারতের অংশ ছিল ৮.৪৭ শতাংশ, যুক্তরাষ্ট্রের ৮.৪৬ শতাংশ—ফারাক মাত্র ০.০১ শতাংশীয় পয়েন্ট। অর্থাৎ বাংলাদেশের বাণিজ্যিক কূটনীতিতে একটি নতুন প্রতিযোগিতামূলক ভারসাম্য তৈরি হচ্ছে।
এই পরিবর্তনের পেছনে ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য কমার একটি বাস্তব কারণ আছে। সীমান্তবাণিজ্যে নিষেধাজ্ঞা, পণ্য চলাচলে বিধিনিষেধ, রাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং বাণিজ্যিক অনিশ্চয়তা দুই দেশের পুরোনো সরবরাহব্যবস্থায় চাপ সৃষ্টি করেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের ভারত থেকে আমদানি ১০.৯৬ বিলিয়ন ডলারে উঠলেও রপ্তানি ছিল মাত্র ১.৭৫ বিলিয়ন ডলার। ফলে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি এখনো বিপুল; কাজেই 'ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য কমছে' কথাটি সব ধরনের বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সমানভাবে সত্য নয়। বরং সীমান্তভিত্তিক বাণিজ্যের কিছু অংশ সংকুচিত হয়েছে, আর মোট বাণিজ্যেও ভারতের অংশ মাসভেদে যুক্তরাষ্ট্রের নিচে নেমে যাচ্ছে।
অন্যদিকে আমেরিকার গল্পটি বেশ আলাদা। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের পণ্যবাণিজ্য ছিল প্রায় ১১.৯ বিলিয়ন ডলার; যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ থেকে ৯.৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে এবং বাংলাদেশে রপ্তানি করেছে ২.৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। অর্থাৎ বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যে আমেরিকার ঘাটতি ছিল ৭.১ বিলিয়ন ডলার। এই অসমতা কমানোর জন্য ওয়াশিংটনের চাপ এবং ঢাকার কূটনৈতিক হিসাব—দুটিই আমেরিকান পণ্য আমদানির দরজা বড় করেছে।
২০২৬ সালের জানুয়ারি-এপ্রিল সময়ে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১৯,১০৪ কোটি টাকার পণ্য আমদানি করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের ৯,৫৩৫ কোটি টাকার তুলনায় ১০১ শতাংশ বেশি। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানি বেড়েছে মাত্র ৩.৩২ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রের তুলা আমদানি বেড়েছে ৪৪.৬ শতাংশ; উড়োজাহাজের ইঞ্জিন আমদানিতে অস্বাভাবিক লাফ দেখা গেছে। অর্থাৎ এই পরিবর্তন শুধু বাজারের স্বাভাবিক চাহিদার ফল নয়; এর মধ্যে বাণিজ্য-আলোচনা ও শুল্কনীতির চাপও কাজ করছে।
যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার। পোশাক তার কেন্দ্রবিন্দু। ফলে ওয়াশিংটনের বাজারে শুল্ক বা প্রবেশাধিকার নিয়ে কোনো ঝুঁকি তৈরি হলে ঢাকার জন্য সেটি শুধু বাণিজ্যিক সমস্যা থাকে না; কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রা ও শিল্পনীতির প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। ২০২৫ সালে সেই চাপের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম, তুলা, সয়াবিন, এলএনজি ও অন্যান্য পণ্য বেশি কেনার প্রতিশ্রুতি দেয়; এমনকি বোয়িংয়ের ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্তও সামনে আসে। যুক্তরাষ্ট্রের গম আমদানির জন্য পাঁচ বছরে প্রতিবছর সাত লাখ টন পর্যন্ত কেনার সমঝোতাও হয়েছিল।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তনটি তুলার বাজারে। ২০২৫ সালে বাংলাদেশের মোট তুলা আমদানি কমলেও ভারত থেকে আমদানি ২১ শতাংশের বেশি কমে প্রায় ১.২৪ মিলিয়ন বেলে নেমেছে। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানি ৩০.৫ শতাংশ বেড়ে প্রায় ০.৭৭ মিলিয়ন বেলে হয়েছে। একই সঙ্গে ব্রাজিলও বড় সরবরাহকারী হিসেবে উঠে এসেছে। এর অর্থ, বাংলাদেশ কেবল ভারতের ওপর নির্ভরশীল একটি সরবরাহব্যবস্থা থেকে ধীরে ধীরে বহু উৎসের দিকে যাচ্ছে।
ভারতের ভৌগোলিক নৈকট্য, স্থলবন্দর, তুলা-সুতা-কাপড়সহ শিল্পের কাঁচামাল এবং আঞ্চলিক সরবরাহব্যবস্থার গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। আবার যুক্তরাষ্ট্রের বাজার, প্রযুক্তি, কৃষিপণ্য, জ্বালানি এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ সম্ভাবনাও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকার কাজ কোনো একটি শক্তির দিকে হেলে পড়া নয়; বরং নিজের বাজারক্ষমতা ও দর-কষাকষির শক্তি বাড়ানো। আমার চোখে এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সেখানেই—বাণিজ্যকে কখনো পররাষ্ট্রনীতির আবেগ দিয়ে চালানো যায় না। প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হলে তার অর্থনৈতিক মূল্য আছে, আর আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক ভালো করতে গিয়ে অতিরিক্ত আমদানির প্রতিশ্রুতিও বিনা মূল্যে আসে না। বাংলাদেশের এখন প্রয়োজন ভারত, আমেরিকা, চীন, ইউরোপ ও নতুন বাজার—সবখানেই নিজের স্বার্থের জায়গাটি শক্ত করা। কারণ ভূরাজনীতিতে বন্ধুত্ব স্থায়ী নয়, কিন্তু বাণিজ্যিক স্বার্থের হিসাব বড় নির্মম। আজ যে দেশ দ্বিতীয়, কাল সে তৃতীয় হতে পারে; স্থায়ী হওয়া উচিত কেবল বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ।
লেখক : ভূরাজনৈতিক বাণিজ্য ও উন্নয়ন কৌশল বিশ্লেষক
Comments