পারস্পরিক নির্ভরতাই হোক ভারত-বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক নিয়ে আমাদের কথাবার্তা প্রায়ই ইতিহাস, আবেগ, সীমান্ত, পানি বা রাজনীতির গোলকধাঁধায় আটকে যায়। অথচ সম্পর্কটির সবচেয়ে বাস্তব ভিত্তি অন্য জায়গায়—অর্থনীতি ও ভূগোলে। দুই দেশের সীমান্ত প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ, মানুষের চলাচল, নদী, বাজার, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ও সরবরাহব্যবস্থা একে অন্যের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে, কাগজে-কলমে দুটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হলেও বাস্তব অর্থনীতিতে তারা একে অপরের প্রতিবেশী মাত্র নয়, পরস্পরের প্রয়োজনীয় অংশীদার। আমার কাছে এখানেই ভবিষ্যৎ সম্পর্কের সবচেয়ে শক্তিশালী সূত্রটি লুকিয়ে আছে: 'ইন্টারডিপেন্ডেন্স'—পারস্পরিক নির্ভরশীলতা।
বাংলাদেশের জন্য ভারতের গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। বিশাল ভারতীয় বাজার, কাঁচামাল, শিল্পপণ্য, জ্বালানি, চিকিৎসা, যোগাযোগ এবং স্থল ও নৌপথ বাংলাদেশের অর্থনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণও বলছে, ভারতের সঙ্গে গভীর বাণিজ্যিক একীভবন বাংলাদেশের রপ্তানি ও মোট দেশজ উৎপাদন বাড়াতে পারে; ভারতের সঙ্গে একটি গভীর বাণিজ্য চুক্তি হলে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রায় ৩.৯ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ার সম্ভাবনা দেখানো হয়েছে। কিন্তু নির্ভরশীলতা মানেই অধীনতা নয়। একজন মানুষ যেমন প্রতিবেশীর ওপর প্রয়োজনের সময় নির্ভর করতে পারেন, তাতে তাঁর স্বাধীনতা নষ্ট হয় না; বরং সুস্থ সম্পর্কের ভিত শক্ত হয়।
ভারতের ক্ষেত্রেও একই সত্য আছে, যদিও তার ধরন ভিন্ন। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ভূগোলের এক অদ্ভুত বন্দিত্বে আটকে আছে। মূল ভারতের সঙ্গে ওই অঞ্চলকে যুক্ত করেছে সরু শিলিগুড়ি করিডর। অথচ বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ব্যবহার করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে সমুদ্রবন্দর ও মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগ অনেক ছোট ও সাশ্রয়ী হতে পারে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, আগরতলা থেকে কলকাতা বন্দরে পণ্য নিতে শিলিগুড়ি হয়ে প্রায় ১,৬০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়; বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানোর দূরত্ব প্রায় ২০০ কিলোমিটার হতে পারে এবং পরিবহন ব্যয় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। অর্থাৎ বাংলাদেশের দরজা ভারতের জন্যও অর্থনৈতিক দরজা।
এই জায়গাটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ভারত যদি বাংলাদেশকে কেবল একটি বাজার হিসেবে দেখে, আর বাংলাদেশ যদি ভারতকে কেবল বড় প্রতিবেশী হিসেবে দেখে, তাহলে সম্পর্ক কখনো পূর্ণতা পাবে না। সম্পর্ককে দেখতে হবে একটি আঞ্চলিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দুই গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে। বাংলাদেশের বন্দর, নদীপথ ও ভৌগোলিক অবস্থান ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জন্য মূল্যবান; আবার ভারতের বৃহৎ বাজার, শিল্পভিত্তি, বিদ্যুৎ, কাঁচামাল ও যোগাযোগব্যবস্থা বাংলাদেশের জন্য মূল্যবান। ২০২৪ সালের ভারতীয় সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ছয় মাসে বাংলাদেশে ভারতের রপ্তানি ছিল প্রায় ৫.৮১ বিলিয়ন ডলার এবং বাংলাদেশ থেকে আমদানি প্রায় ১.০৭ বিলিয়ন ডলার। সংখ্যাটি বাংলাদেশের দিক থেকে বড় বাণিজ্যঘাটতি দেখায়—এটি অস্বীকার করার কিছু নেই। বরং এখানেই বাংলাদেশের কাজ: শুধু ভারত থেকে কেনা নয়, ভারতের বাজারে আরও বেশি বাংলাদেশি পণ্য ও সেবা পৌঁছানো।
পারস্পরিক নির্ভরতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে যোগাযোগে। রেল, সড়ক, নৌপথ, বন্দর, বিদ্যুৎ ও সীমান্তবাণিজ্য যদি একে অন্যের অর্থনীতিকে যুক্ত করে, তাহলে রাজনৈতিক সম্পর্কের ওঠানামা অর্থনীতিকে পুরোপুরি ভেঙে দিতে পারবে না। দুই দেশের ছয়টি পুরোনো রেলসংযোগ পুনরায় চালু হয়েছে; ২০২৩ সালে আখাউড়া–আগরতলা রেলসংযোগও যুক্ত হয়েছে। বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহারের সুযোগ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জন্য নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করেছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাব আরও বড় কথা বলে—পরিবহন সংযোগ গভীর হলে বাংলাদেশের জাতীয় আয় সর্বোচ্চ ১৭ শতাংশ এবং ভারতের ৮ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
তবে এখানে একটি কঠিন সত্য বলতেই হবে। পারস্পরিক নির্ভরতা তখনই বন্ধন হয়, যখন সেখানে সমতা থাকে। বড় দেশ ছোট দেশের ওপর অনুগ্রহ করবে—এমন সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী নয়। আবার ছোট দেশও বড় প্রতিবেশীর প্রতিটি পদক্ষেপকে সন্দেহের চোখে দেখলে আস্থার পরিবেশ তৈরি হয় না। বাংলাদেশ ও ভারত দুটি স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র। আয়তন, জনসংখ্যা বা অর্থনীতির আকার আলাদা হতে পারে; রাষ্ট্রের মর্যাদা আলাদা নয়। সমতার অর্থ এই নয় যে দুই দেশের ক্ষমতা সমান; সমতার অর্থ হলো, আলোচনার টেবিলে দুই দেশের স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বের মূল্য সমানভাবে স্বীকৃত হবে।
গণতন্ত্রে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবেই। সরকার বদলাবে, নীতি বদলাবে, জনমত বদলাবে। কিন্তু মানুষের চাওয়া শেষ পর্যন্ত খুব সাধারণ—কাজ, আয়, নিরাপদ সীমান্ত, সস্তা পণ্য, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, চিকিৎসা, শিক্ষা এবং উন্নত জীবন। তাই দিল্লি বা ঢাকার রাজনৈতিক অস্বস্তি যেন দুই দেশের সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎকে জিম্মি না করে। সম্পর্কের এমন একটি কাঠামো দরকার, যেখানে সরকারগুলোর মধ্যে মতবিরোধ থাকলেও বাণিজ্য, নদী, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, সীমান্তবাজার ও মানুষের বৈধ চলাচলের দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে না যায়।
পরিবারের সম্পর্কও সব সময় মসৃণ নয়। ভাইয়ে ভাইয়ে মতভেদ হয়, তর্ক হয়, অভিমান হয়। কিন্তু প্রয়োজনের সময় দরজা বন্ধ থাকে না। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককেও সেই বাস্তবতার দিকে যেতে হবে—আবেগের পরিবার নয়, স্বার্থের পরিবার। যে পরিবারে ভালোবাসার পাশাপাশি হিসাবও থাকে, কিন্তু সেই হিসাব শত্রুতার নয়, পারস্পরিক প্রয়োজনের। ভারত বাংলাদেশের উন্নয়নকে নিজের পূর্বাঞ্চল ও বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক অর্থনীতির অংশ হিসেবে দেখবে; বাংলাদেশও ভারতের বাজার, অবকাঠামো ও আঞ্চলিক সংযোগকে নিজের উন্নয়নের সুযোগ হিসেবে দেখবে। এই নির্ভরতার জাল যত ঘন হবে, বিচ্ছিন্নতার রাজনৈতিক খরচ তত বাড়বে। শেষ পর্যন্ত স্থায়ী শান্তির সবচেয়ে শক্ত ভিত্তি হয়তো কোনো চুক্তির কালি নয়—দুই দেশের মানুষের জীবনে একে অপরের প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠা। পারস্পরিক নির্ভরতাই সেই পথ, যেখানে বাংলাদেশ ও ভারত কেউ কারও ছোট বা বড় নয়; দুজনই প্রতিবেশী, দুজনই সার্বভৌম, আর দুজনের সমৃদ্ধিই একে অপরের স্বার্থের সঙ্গে ক্রমশ জড়িয়ে যায়।
লেখক : ভূরাজনৈতিক বাণিজ্য ও উন্নয়ন কৌশল বিশ্লেষক
Comments