মেসিকে ইসরাইলপন্থী বানানোর শখ, আর ইন্টারনেটের ‘হিংসার’ বাস্তবতা
লিওনেল মেসি কি ফুটবলার, নাকি কোনো দেশের অলিখিত পররাষ্ট্রমন্ত্রী? লিওনেল মেসি নামের এক ভদ্রলোক ফুটবল খেলেন। বল পায়ে তিনি যখন ছোটেন, পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ তখন টেলিভিশনের সামনে বসে মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে থাকে। এটা বেশ সরল একটা সমীকরণ। কিন্তু ইন্টারনেটের একটা নিজস্ব জগত আছে, সেখানে সমীকরণ এত সহজে মিললে তাদের পেটের ভাত হজম হয় না। ইন্টারনেটের কিছু অতি-সক্রিয় মানুষের শখ হলো - মেসিকে দিয়ে এমন সব ভারী ভারী রাজনৈতিক কথা বলানো, যা তিনি হয়তো কোনোদিন স্বপ্নেও ভাবেননি। একটা চমৎকার নিয়ম আছে - আপনি যত কম কথা বলবেন, মানুষ আপনার হয়ে তত বেশি বানিয়ে বলবে।
মেসি মাঠের বাইরে বড্ড চুপচাপ স্বভাবের মানুষ। আর এই নীরবতার সুযোগটাই লুফে নিয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার একাংশ। একদল খুব জোর দিয়ে প্রমাণ করতে চায়, মেসি ঘোরতর ইসরাইলপন্থী। আরেক দল আবার তলোয়ার উঁচিয়ে দাবি করে, মেসি আসলে ফিলিস্তিনের সবচেয়ে বড় ত্রাণকর্তা। মাঝে মাঝে ফেসবুকের কিছু পোস্ট দেখলে মনে হয়, মেসি সাহেব সকালে ঘুম থেকে উঠে বিশ্ব রাজনীতির জটিল ফাইলগুলো নিয়ে কিছুক্ষণ চিন্তাভাবনা করেন, তারপর একটা কড়া বিবৃতি লিখে মাঠে প্র্যাকটিস করতে যান। বাস্তবতা অবশ্য এত রঙিন নয়। বাস্তবতা বেশ নিরস, আর নিরস সত্য সাধারণত ইন্টারনেটে সহজে ভাইরাল হতে চায় না।
আসলে মেসির আসল পরিচয়টা খোঁজার জন্য বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে যাওয়ার কোনো দরকার নেই। তিনি ফুটবলার এবং মাঠের বাইরে একজন অতি সাধারণ মানুষ, যিনি নিরবে কিছু মানবিক কাজ করতে ভালোবাসেন। মনে আছে আফগানিস্তানের সেই ছোট্ট ছেলে মুর্তজা আহমাদির কথা? টাকার অভাবে যে নীল-সাদা পলিথিন কেটে পেছনে কলম দিয়ে 'MESSI 10' লিখে জার্সি বানিয়ে খেলেছিল। সেই ছবি যখন ইন্টারনেটে ভাইরাল হলো, মেসি কিন্তু কোনো পলিটিক্যাল এজেন্ডা খোঁজেননি। তিনি কাতার সফরের সময় সেই খুদে ভক্তকে বুকে টেনে নিয়েছিলেন, তাকে নিজের সই করা আসল জার্সি উপহার দিয়েছিলেন। ইন্টারনেটে উগ্র রাজনীতির তর্ক যখন তুঙ্গে, মেসি তখন মাঠের বাইরের এই ছোট ছোট ভালোবাসার গল্পে শান্তিদূত হয়ে থাকেন।
আসল সত্যিটা জানতে হলে আমাদের একটু পেছনে তাকাতে হবে। মেসি ২০১১ সাল থেকে ইউনিসেফের শুভেচ্ছাদূত। এই পরিচয়ে তিনি পৃথিবীর বহু দেশে গেছেন, যুদ্ধ কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপন্ন শিশুদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। হাইতি, সিরিয়া, ইউক্রেন কিংবা গাজা - যেখানেই শিশুদের জীবন সংকটে পড়েছে, মেসি একটা সাধারণ মানুষের ভাষায় কথা বলেছেন। তার বার্তাটা সবসময় খুব পরিষ্কার এবং একঘেয়ে - যুদ্ধ বন্ধ হোক, শিশুদের বাঁচতে দেওয়া হোক। শুধু ইউনিসেফ নয়, নিজের 'লিও মেসি ফাউন্ডেশন'-এর মাধ্যমে তিনি বছরের পর বছর ধরে ক্যানসার আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা, বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের পুনর্বাসন এবং সুবিধাবঞ্চিত হাজারো মানুষের শিক্ষার জন্য কোটি কোটি টাকা অনুদান দিয়ে আসছেন। অথচ প্রচারবিমুখ এই মানুষটার নীরবতাকে পুঁজি করে চলে অন্য খেলা।
২০১৪ সালের গাজা সংঘাতের সময় তিনি একটা বিবৃতি দিয়েছিলেন। একজন বাবা এবং ইউনিসেফের দূত হিসেবে তিনি বলেছিলেন, শিশুদের এই রক্তাক্ত ছবিগুলো তাকে গভীরভাবে ব্যথিত করে। শিশুরা তো এই যুদ্ধ তৈরি করেনি, তাহলে শাস্তিটা তারা কেন পাবে? এই পুরো বক্তব্যের মধ্যে তিনি কোনো দেশের পতাকা ওড়াননি, কোনো সরকারকে গালি দেননি কিংবা কাউকে বাহবাও দেননি। তিনি দাঁড়িয়েছিলেন শিশুদের পক্ষে, যুদ্ধের বিপক্ষে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় সত্যের চেয়ে এডিট করা স্ক্রিনশটের গতি যে অনেক বেশি, তার বড় প্রমাণ বছরের পর বছর ধরে ঘুরে বেড়ানো একটা বিখ্যাত ভুয়া উক্তি। ফেসবুকে প্রায়ই দেখা যায়, মেসির একটা হাসিমুখের ছবির পাশে বড় বড় অক্ষরে লেখা - "যে দেশ নিরীহ শিশুদের হত্যা করে, সেই দেশের মাটিতে আমি খেলতে পারি না।" শুনতে বেশ নাটকীয় এবং লাইক-শেয়ার পাওয়ার জন্য একদম পারফেক্ট। কিন্তু সমস্যা একটা জায়গাতেই - মেসি এই কথা কোনোদিন বলেননি। আন্তর্জাতিক ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থা এএফপি (AFP) অনেক আগেই প্রমাণ করেছে যে এই উক্তিটি সম্পূর্ণ বানোয়াট। অথচ প্রতি তিন-চার মাস পরপর এই গুজবটি অলৌকিকভাবে বেঁচে ওঠে।
এরপর আসা যাক ২০১৮ সালের সেই বিখ্যাত ম্যাচের ঘটনায়। রাশিয়া বিশ্বকাপের ঠিক আগে আর্জেন্টিনার একটা প্রীতি ম্যাচ খেলার কথা ছিল ইসরাইলের জেরুজালেমে। শেষ মুহূর্তে ম্যাচটি বাতিল হয়ে যায়। ব্যস, অমনি চারদিকে শোরগোল পড়ে গেল – "মেসি ফিলিস্তিনের টানে ম্যাচ বয়কট করেছেন।" অথচ আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন খুব পরিষ্কার করে জানিয়েছিল, খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা এবং সামগ্রিক গুমোট পরিস্থিতির কথা চিন্তা করে দলগতভাবে ম্যাচটি বাতিল করা হয়েছে। মেসি নিজে সেখানে কোনো বীরত্বগাঁথা বা রাজনৈতিক ইশতেহার প্রকাশ করেননি। কিন্তু মানুষের স্বভাব তো অদ্ভুত, তারা সত্যের চেয়ে নিজের মনের মতো সাজানো অনুমানকে বেশি ভালোবাসে।
আবার মুদ্রার উল্টো পিঠটাও বেশ মজার। একদল মানুষ ঠিক করে রেখেছেন, মেসিকে 'ইসরাইলপন্থী' বানাতেই হবে। তাদের যুক্তি? মেসি ইসরাইল সফরে গিয়ে ওয়েলিং ওয়ালে (Wailing Wall) মাথা ঠেকিয়েছিলেন। হ্যাঁ, তিনি গিয়েছিলেন। কিন্তু তারা চমৎকারভাবে একটা তথ্য ভুলে যান বা চেপে যান—সেই একই সফরে মেসি কিন্তু ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরেও গিয়েছিলেন। তিনি যেমন ইসরাইলি শিশুদের সাথে হেসে ছবি তুলেছেন, তেমনি ফিলিস্তিনি শিশুদের সাথেও মাঠে ফুটবল নিয়ে দৌড়েছেন। পুরো সফরটি ছিল মূলত এফসি বার্সেলোনা এবং ইউনিসেফের যৌথ 'পিস ট্যুর' বা শান্তি উদ্যোগের অংশ। যে ঘটনাটা ছিল স্রেফ একটা মানবিক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পদক্ষেপ, সেটাকে রাতারাতি রাজনৈতিক সিলমোহর দিয়ে দেওয়া হলো। একবিংশ শতাব্দীর ইন্টারনেট বোধহয় একমাত্র জায়গা, যেখানে একজন মানুষকে একই সাথে দুই চরম বিপরীত মেরুর সমর্থক বানিয়ে দেওয়া সম্ভব।
এবার একটু বিশ্ব রাজনীতির থাগ-লাইফ বা আসল কূটনীতির দিকে তাকানো যাক। যারা বিশ্বকাপে ফুটবল দেখতে বসেন, তারা কি কখনো হিসাব করে দেখেছেন - সেখানে অংশ নেওয়া কতগুলো দেশের সাথে ইসরাইলের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক আছে? তালিকাটা কিন্তু বেশ লম্বা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, ফ্রান্স, ব্রাজিল, অস্ট্রেলিয়া, সুইজারল্যান্ড, এমনকি খোদ মেসির নিজের দেশ আর্জেন্টিনাও এই তালিকায় আছে। আবার এই দেশগুলোর অনেকেই কিন্তু ফিলিস্তিনকে কোটি কোটি টাকার মানবিক সহায়তা দেয়, কেউ কেউ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতিও দিয়েছে। অন্যদিকে মরক্কো বা সৌদি আরবের মতো দেশগুলো প্রকাশ্যে ও কূটনৈতিকভাবে ইসরাইলের পক্ষে অবস্থান নেয়।
এখন কথা হলো, ফুটবল মাঠে নামার আগে কি তাহলে প্রতিটি খেলোয়াড়কে তাদের দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্রিফিং ফাইল মুখস্থ করে আসতে হবে? মেসির কাছে মানুষের রাজনৈতিক জ্ঞান খোঁজার এই আকুলতা সত্যিই বেশ বিনোদন জোগায়।
২০২৩ সালের গাজা যুদ্ধ নিয়ে যখন পুরো পৃথিবী উত্তাল, তখনও ইন্টারনেটের একটা বড় অংশ চাতক পাখির মতো বসে ছিল—মেসি একটা কিছু বলুন। মেসি কোনো রাজনৈতিক বিবৃতি দেননি। আর এই নীরবতা নিয়েও সোশ্যাল মিডিয়ার জুরি বোর্ড বিচার বসিয়ে দিল। আমরা আসলে এমন এক যুগে বাস করছি, যেখানে একজন মানুষ কী বলেছে তার চেয়ে সে কেন চুপ ছিল - সেটার ব্যবচ্ছেদ করতেই মানুষ বেশি আনন্দ পায়।
মেসি ফুটবলের ইতিহাসে অফিশিয়ালি নয়শোর বেশি গোল করেছেন। এই বিশ্বকাপে এখনও পর্যন্ত সর্বোচ্চ গোল আর অসংখ্য রেকর্ড তার দখলে কিন্তু ইন্টারনেটের ট্রল আর গুজবের দুনিয়ায় তার নামে এগুলোর বাইরের আলাপই বেশি! গুজবগুলোর অর্ধেকও যদি সত্যি হতো, তবে তিনি ফুটবল বুট অনেক আগেই তুলে রেখে কোনো পরাশক্তির পূর্ণকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে যোগ দিতে পারতেন।
তথ্য যাচাই করতে একটু সময় লাগে, একটু মগজ খাটাতে হয়। আর গুজব ছড়াতে লাগে মাত্র কয়েক সেকেন্ড। তাই এরপর যখনই ফেসবুক বা টিকটকে দেখবেন "মেসি বলেছেন...", তখন শেয়ার বাটনে চাপ দেওয়ার আগে নিজেকে একটা ছোট্ট প্রশ্ন করবেন - ভদ্রলোক আসলেই কি এই কথা বলেছেন, নাকি ইন্টারনেটের কোনো অতি-উৎসাহী প্রতিভাবান তার মুখে নিজের মনের কথা গুঁজে দিয়েছে?
কাজেই, মেসি মাঠে যখন পায়ের জাদুতে সবাইকে বোকা বানাচ্ছেন, তখন তাকে জোর করে বিশ্ব রাজনীতির দাবার গুটি বানানোর চেষ্টাটা বাদ দেওয়াই ভালো। তাকে আপনি পছন্দ নাই করতে পারেন। সেটা আপনার ব্যক্তিগত সমস্যা, কিন্তু না জেনে না বুঝে কুৎসা রটনা থেকে নিজেকে বিরত রাখুন। নিজে সুস্থ থাকুন, অন্যের ক্ষতি কামনা না করি, আনন্দে থাকুন। খেলাটাকে উপভোগ করুন।
Comments