১২ কোটি ভোটারের ন্যূনতম কর: বিপুল রাজস্ব স্বনির্ভরতা ও আজীবন নাগরিক সুবিধার রূপরেখা
১. বর্তমান বাংলাদেশের কর ব্যবস্থার চিত্র: একটি কাঠামোগত বৈষম্য
বর্তমানে বাংলাদেশে করদাতার সংখ্যা এবং রাজস্ব আদায়ের হার দেশের অর্থনীতির আকারের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল। দেশের বর্তমান কর ব্যবস্থার পরিসংখ্যান নিম্নরূপ:
এনআইডি বা ভোটার সংখ্যা: দেশে বর্তমানে ভোটার সংখ্যা প্রায় ১২ কোটি ১৭ লাখ ৮৫ হাজার।
টিআইএন (TIN) ধারী: দেশের বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, মোট টিআইএন ধারীর সংখ্যা প্রায় ১ কোটি।
রিটার্ন দাখিলকারী: ১ কোটি টিআইএন ধারী থাকলেও নিয়মিত আয়কর রিটার্ন জমা দেন মাত্র ৩৭ থেকে ৪০ লাখ মানুষ। অর্থাৎ, মোট ভোটারের মাত্র ৩.৩% মানুষ কর রিটার্ন দেন।
রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত (Tax-to-GDP Ratio): বাংলাদেশের ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত মাত্র ৭.৫% থেকে ৮%, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন এবং একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ (উন্নত দেশে এটি ৩০-৪০%)।
ব্যক্তিগত বনাম প্রাতিষ্ঠানিক করদাতার চিত্র: আমাদের মোট রাজস্বের সিংহভাগ আসে প্রাতিষ্ঠানিক বা কর্পোরেট কর এবং পরোক্ষ কর (ভ্যাট) থেকে। মোট নিবন্ধিত করদাতার মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক বা কোম্পানির সংখ্যা মাত্র কয়েক লাখ হলেও রাজস্বে তাদের অবদান অনেক বেশি, যেখানে ব্যক্তিগত পর্যায়ে প্রত্যক্ষ করদাতার হার মোট জনসংখ্যার তুলনায় মাত্র ২.৫% থেকে ৩%।
অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের বিশালতা: দেশের শ্রমশক্তির প্রায় ৮৫% মানুষ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত। এর মধ্যে তরকারি, মাছ, খাবার বা সবজি ব্যবসায়ী ছাড়াও রয়েছে কাপড় ব্যবসায়ী, ফুটপাত ও পাড়া-মহল্লার হকার, ক্ষুদ্র মেকানিক, online পেইজ বা ভাসমান হকারসহ হাজারো রকমের অপ্রচলিত ব্যবসা। যাদের কোনো ট্রেড লাইসেন্স নেই বা দরকার হয় না। এদের দৈনিক বা মাসিক ক্যাশ ফ্লো অনেক বেশি হলেও তারা কর জালের সম্পূর্ণ বাইরে রয়ে গেছেন।
২. প্রস্তাবনা: এনআইডি-সংযুক্ত অটো-টিন (Auto-TIN) এবং ন্যূনতম কর
১৮ বছর পূর্ণ হলে এনআইডি পাওয়ার সাথে সাথেই নাগরিকের নামে একটি "অটো-টিন" (Auto-TIN) বা ট্যাক্স অ্যাকাউন্ট তৈরি হবে। সে যখন যে অবস্থায় থাকুক না কেন তার সেই অবস্থান বিবেচনা করে তার এনআইডির এগেনস্টে একটা টিন অটোমেটিকলি জেনারেট হবে এবং সে তার অবস্থান অনুযায়ী এক টাকা হোক ৫০ টাকা হোক টাকার পরিমাণ যাই হোক সে দিয়ে যাবে।
ন্যূনতম করের গাণিতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব (মাল্টিপ্লিকেশন বা গুণফল)
১২ কোটি ১৭ লাখ ৮৫ হাজার ভোটারের প্রত্যেকে যদি ন্যূনতম অংশ নেন, তবে প্রতি বছর রাষ্ট্রীয় তহবিলে কী পরিমাণ বিপুল রাজস্ব যুক্ত হতে পারে, তার সুনির্দিষ্ট গাণিতিক সমীকরণ নিচে দেওয়া হলো: যদি প্রত্যেকে ১০০০ টাকা করে দেন ১২,১৭,০০,০৮৫ × ১,০০০ = ১২১,৭৮,৫০,০০০ অর্থাৎ, ১২১ কোটি ৭৮ লক্ষ ৫০ হাজার, এটা যদি ডাবল হয় মানে ২০০০ হয় ন্যূনতম তাহলে সংখ্যাটি দাঁড়ায় ২৪,৩৪০ কোটি ১৭ লক্ষ। এখানে শুধুমাত্র একটি গনিত হিসাব দেওয়া হল বিষয়টি সহজ ভাবে বুঝার জন্য সবার তো আর একই রকম ট্যাক্স হবে না চাকরি ব্যবসায়ী নানান পেশার মানুষের নানা রকম হতে পারে এবং এটি বাড়বে বই কমবে না কখনো।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ: বর্তমানে বাংলাদেশের বার্ষিক মোট ব্যক্তিপর্যায়ের আয়কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রার একটি বড় অংশই পূরণ হয় না। যদি শুধু ব্যক্তিপর্যায়ের এই "সার্বজনীন ন্যূনতম কর" থেকে সর্বনিম্ন ১২ হাজার কোটি থেকে সর্বোচ্চ প্রায় ৬১ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত আসে, তবে মেগা প্রজেক্ট বা বিদেশি ঋণের ওপর দেশের নির্ভরতা অর্ধেকে নেমে আসবে।
৩. করকে "সার্বজনীন ডিপিএস বা পেনশন" মডিউলে রূপান্তর
মানুষ তখনই স্বতস্ফূর্তভাবে কর দেবে যখন করের টাকা "খরচ" না হয়ে "ভবিষ্যতের সঞ্চয়" হিসেবে গণ্য হবে। করের পরিমাণ অনুযায়ী নাগরিক সুবিধা নির্ধারণের সম্ভাব্য স্তরগুলো নিচে নিচে দেওয়া হলো:
১,০০০ - ৫,০০০ টাকা (ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী/নিম্ন আয়):
বর্তমান নাগরিক সুবিধা: সরকারি হাসপাতালে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চিকিৎসা, সন্তানদের জন্য ফ্রি স্কুলিং।
ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা: রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে ন্যূনতম 'সার্বজনীন সামাজিক ভাতা'।
৫,০০১ - ৫০,০০০ টাকা (মধ্যবিত্ত/চাকরিজীবী):
বর্তমান নাগরিক সুবিধা: মানসম্মত চিকিৎসা বীমা (Health Insurance), বেকারত্বকালীন ৩-৬ মাসের ভাতা।
ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা: জমাকৃত করের অনুপাত অনুযায়ী মাসিক 'অবসরকালীন পেনশন'।
৫০,০০০+ টাকা (উচ্চ আয়/বড় ব্যবসায়ী):
বর্তমান নাগরিক সুবিধা: অগ্রাধিকারমূলক নাগরিক সেবা (VIP প্রটোকল নয়, বরং দ্রুততম সময়ে সরকারি সেবা), বিজনেস লোন ও সাবসিডি সুবিধা।
ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা: উচ্চ মাত্রার পেনশন এবং ট্যাক্স রিবেট সুবিধা।
৪. বৈশ্বিক উদাহরণ: উন্নত দেশগুলো কীভাবে করের বিনিময়ে সুবিধা নিশ্চিত করে?
অন্যান্য আধুনিক দেশগুলো যে ব্যবস্থার কারণে নাগরিকদের কাছ থেকে শতভাগ কর আদায় করতে পারে, তার কিছু সফল উদাহরণ নিচে দেওয়া হলো:
ক) যুক্তরাজ্য (UK) - ন্যাশনাল ইন্সুরেন্স ও NHS
যুক্তরাজ্যে প্রত্যেক নাগরিকের একটি National Insurance (NI) Number থাকে (যা আপনার প্রস্তাবিত এনআইডি-টিন মডিউলের মতো)।
সুবিধা: করের একটি অংশ সরাসরি যায় NHS (National Health Service)-এ। একজন নাগরিকের ক্যান্সার বা যেকোনো বড় রোগ হলে রাষ্ট্র সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চিকিৎসা দেয়। চাকরি হারালে রাষ্ট্র 'Unemployment Allowance' বা বেকার ভাতা দেয়।
খ) স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশসমূহ (সুইডেন, নরওয়ে) - উচ্চ কর, সর্বোচ্চ সামাজিক নিরাপত্তা
এসব দেশে করের হার অত্যন্ত বেশি (প্রায় ৪০-৫০%)। কিন্তু সেখানে মানুষ খুশি মনে কর দেয়।
সুবিধা: সন্তান জন্ম নেওয়ার পর থেকে ১৮ বছর পর্যন্ত তার পড়াশোনা, চিকিৎসা এবং ভরণপোষণের একটি বড় অংশ রাষ্ট্র বহন করে। অবসর নেওয়ার পর একজন নাগরিককে থাকার ঘর এবং সম্মানজনক পেনশন দেওয়া হয়, যাতে তাকে সন্তানদের ওপর নির্ভর করতে না হয়।
গ) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (USA) - সোশ্যাল সিকিউরিটি নাম্বার (SSN)
আমেরিকায় জন্ম বা নাগরিকত্ব পাওয়ার সাথে সাথে SSN দেওয়া হয়, যা ট্যাক্স আইডির কাজও করে।
সুবিধা: সারা জীবন যে কর দেওয়া হয়, তা 'Social Security Trust Fund'-এ জমা হয়। অবসরে যাওয়ার পর করদাতার গড় আয়ের ওপর ভিত্তি করে আজীবন মাসিক চেক (পেনশন) পাঠানো হয়।
৫. কর জটিলতা হ্রাস ও ডিজিটাল স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি।
মানুষ কর দিতে ভয় পায় কর অফিসের হয়রানি এবং কাগজপত্রের জটিলতার কারণে। এই কর জটিলতা কমাতে হবে এবং ঘরে বসে মোবাইলের মাধ্যমে কর দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে:
সহজ ডিজিটাল পদ্ধতি: মোবাইল অ্যাপ বা একটি নির্দিষ্ট ওয়েবসাইটের মাধ্যমে নিজে নিজে যাতে মাত্র দু'চারটা সহজ প্রশ্নের উত্তরের মাধ্যমে নিজের করের সীমা বা গড় ন্যূনতম কর নির্ধারণ করা যায়, সেই ডিজিটাল পদ্ধতি বের করতে হবে।
মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে পরিশোধ: নির্ধারিত করের টাকা বিকাশ, নগদ বা রকেটের মতো মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ঘরে বসেই এক মিনিটে পরিশোধ করা যাবে এবং সাথে সাথেই মোবাইলে ডিজিটাল প্রাপ্তিস্বীকার চলে আসবে।
৬. অপ্রচলিত ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের করের আওতায় আনার কৌশল।
ফুটপাত বা অলিতে-গলিতে যারা ট্রেড লাইসেন্স ছাড়া কাপড়, সবজি, মাছ বা খাবারের ব্যবসা করছেন, তাদের বিশাল ক্যাশ ফ্লো বা লেনদেনকে করের মূল ধারায় আনতে ডিজিটাল চ্যানেলে নিয়ে আসতে উৎসাহিত করতে হবে:
বাধ্যতামূলক কিউআর (QR) কোড প্রবর্তন: প্রত্যেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীকে মোবাইল ব্যাংকিং বা যেকোনো ডিজিটাল ফরমে নিয়ে আসার জন্য তাদের এনআইডি এবং অটো-টিনের বিপরীতে একটি করে সরকারি 'কিউআর কোড' দিতে হবে।
প্রাথমিক সরকারি প্রণোদনা: এই ব্যবস্থাকে জনপ্রিয় করতে সরকার প্রাথমিকভাবে উৎসাহিত করার জন্য বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা করতে পারে। যেমন—কোনো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী যদি কিউআর কোডের মাধ্যমে লেনদেন করেন এবং নিয়মিত ন্যূনতম কর দেন, তবে তাকে কোনো জামানত ছাড়াই নামমাত্র সুদে ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য 'স্মার্ট ঋণ' দেওয়া হবে।
७. সফল বাস্তবায়নের জন্য নীতিনির্ধারণী কৌশল ও পরামর্শ
আপনার এই যুগান্তকারী ধারণাকে বাস্তবে রূপ দিতে আরও কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করা যেতে পারে:
ট্যাক্স-বিনেফিট অ্যাপ বা চাক্ষুষ হিসাব: প্রতিটি নাগরিকের একটি ডিজিটাল প্রোফাইল থাকবে। আমি যদি চাক্ষুষ দেখতে পাই, আমার সারা জীবনের দিয়ে করে টাকা থেকে সরকার আমাকে এই বেনিফিট দিচ্ছে তাহলে আমি নিশ্চয়ই কর দিতে উৎসাহিত হব। অ্যাপে সরাসরি লেখা থাকবে নাগরিকের দেওয়া করের টাকা কোথায় ব্যয় হচ্ছে এবং সে কী সুবিধা পাচ্ছে।
কর-সুবিধা ট্রাস্ট ফান্ড: ব্যক্তিপর্যায়ের এই সার্বজনীন করের টাকা সাধারণ রাজস্ব তহবিলে না রেখে একটি আলাদা 'নাগরিক সুবিধা ট্রাস্ট ফান্ড'-এ রাখা যেতে পারে, যা কেবল শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পেনশনের কাজেই ব্যয় হবে।
৮. অপ্রচলিত পেশাজীবী ও নিম্ন আয়ের চাকরিজীবীদের অন্তর্ভুক্তি।
সার্বজনীন করের এই মডেলে দেশের একটি পেশা বা একজন প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকও বাদ যাবেননা। যারই এনআইডি বা ভোটাধিকার থাকবে, তাকেই এই কর কাঠামোর আওতায় আসতে হবে:
অপ্রচলিত পেশাজীবী (ফ্রিল্যান্স/টেকনিশিয়ান): আমাদের সমাজে ইলেকট্রিশিয়ান, টাইলস মিস্ত্রি, রাজমিস্ত্রি, প্লাম্বার, কাঠমিস্ত্রি বা রঙমিস্ত্রিদের মতো লাখ লাখ দক্ষ ও অদক্ষ কারিগর রয়েছেন। এরা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক চাকরি করেন না এবং কোনো নির্দিষ্ট কোম্পানির অধীনে থাকেন না। প্রাত্যহিক কাজের বিনিময়ে তারা যে নগদ অর্থ উপার্জন করেন, তার কোনো দৃশ্যমান হিসাব থাকে না। এই সার্বজনীন মডেলে তাদের প্রত্যেকের এনআইডির বিপরীতে ন্যূনতম কর (১,০০০ বা ২,০০০ টাকা) নেওয়া নিশ্চিত করা হবে।
নিম্ন আয়ের চাকরিজীবী (গার্মেন্টস ও অন্যান্য সেক্টর): আমাদের দেশের অর্থনীতি সচল রাখার মূল চালিকাশক্তি গার্মেন্টস সেক্টর এবং বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক বা অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের কারখানার কোটি শ্রমিক। যারা সরকারের বেঁধে দেওয়া ন্যূনতম মজুরিতে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। প্রচলিত নিয়মে তারা কর সীমার নিচে থাকায় কোনো কর দেন না। কিন্তু এই নতুন মডেলে তারাও দেশের অংশীদার হিসেবে তাদের ন্যূনতম আয়ের সাথে সামঞ্জস্য রেখে বছর শেষে অত্যন্ত ক্ষুদ্র অংকের (যেমন ৫০০ বা ১০০০ টাকা) হলেও ন্যূনতম কর প্রদান করবেন।
তাদের জন্য নিশ্চিতকৃত রাষ্ট্রীয় সুবিধা।
এই নিম্ন আয়ের কর্মী ও পেশাজীবীরা কর দেওয়ার সাথে সাথেই সরাসরি কয়েকটি জীবনরক্ষাকারী রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি পাবেন:
দুর্ঘটনা ও চিকিৎসা বীমা: রাজমিস্ত্রি বা ইলেকট্রিশিয়ানদের কাজ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কর্মরত অবস্থায় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে রাষ্ট্র তাদের সম্পূর্ণ চিকিৎসার খরচ বহন করবে এবং সাময়িক অক্ষমতার জন্য বিশেষ ভাতা দেবে।
গার্মেন্টস শ্রমিকদের জন্য আবাসন ও রেশন সুবিধা: করদাতার এনআইডি দেখিয়ে গার্মেন্টস কর্মীরা সরাসরি সরকারি ভর্তুকি মূল্যের রেশন এবং রাষ্ট্রীয় আবাসন বা উন্নত জীবনযাত্রার সুযোগ পাবেন।
৯. অপ্রচলিত খাতের অন্যান্য পেশাজীবী ও চাকরিজীবীদের পূর্ণাঙ্গ ম্যাপিং।
একটি সার্বজনীন কর কাঠামো তৈরি করতে হলে কেবল মিস্ত্রি বা গার্মেন্টস কর্মী নয়, আমাদের সমাজের সমান্তরাল অর্থনীতি সচল রাখা নিম্নোক্ত অপ্রচলিত খাতের প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিককে এর আওতায় আনতে হবে:
ক) পরিবহন খাতের অপ্রচলিত চালক ও শ্রমিক
পেশাজীবী: দেশের লাখ লাখ রিকশাচালক, ইজিরাইডার বা থ্রি-হুইলার চালক, ভ্যানচালক, রাইড শেয়ারিং অ্যাপের (পাঠাও/উবার) মোটরবাইক ও কার চালক এবং দূরপাল্লার বাস-ট্রাকের হেলপার ও কুলি-শ্রমিক।
বাস্তবতা: এদের দৈনিক আয় অনেক ক্ষেত্রে একজন সাধারণ অফিস সহকারী বা গ্র্যাজুয়েটের চেয়ে বেশি। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক কোনো কাঠামো না থাকায় এরা কর ব্যবস্থার সম্পূর্ণ বাইরে।
খ) গৃহস্থালি, সেবা খাত ও অন-ডিমান্ড কর্মী
পেশাজীবী: স্বাধীনভাবে কর্মরত বিউটিশিয়ান, দর্জি বা টেইলার্স কর্মী, লন্ড্রি বা ধোপা ব্যবসায়ী, ডেকোরেটর ও ইভেন্ট কর্মী, ক্যাটারিং বা বাবুর্চি, নিরাপত্তা প্রহরী (সিকিউরিটি গার্ড), এবং বাসা-বাড়িতে কর্মরত গৃহকর্মী বা বুয়া।
বাস্তবতা: নগরায়ণের ফলে এই খাতের আকার দিন দিন বিশাল হচ্ছে এবং এখানে প্রতি মাসে বিপুল অংকের নগদ টাকার হাতবদল হচ্ছে।
গ) কৃষি ও গ্রামীণ অপ্রচলিত অর্থনীতি
পেশাজীবী: প্রাতিষ্ঠানিক লাইসেন্সবিহীন পোল্ট্রি খামারি, ডেইরি বা দুগ্ধ খামারি, মৎস্য চাষী, সিজনাল শস্য ব্যবসায়ী, গাছ ও নার্সারি ব্যবসায়ী এবং গ্রামীণ হাট-বাজারের ইজারাদার ও দালাল।
বাস্তবতা: শিল্প খাতের বাইরে এই ব্যক্তিরা এককভাবে গ্রামীণ অর্থনীতির সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক উদ্বৃত্ত (Surplus) তৈরি করেন।
ঘ) উদীয়মান ডিজিটাল ও স্বাধীন পেশাজীবী (গিগ ইকোনমি)
পেশাজীবী: প্রাতিষ্ঠানিক কর ফাইলিংয়ের বাইরে থাকা ফ্রিল্যান্সার, কন্টেন্ট ক্রিয়েটর, অনলাইন টিউশন বা কোচিং শিক্ষক, এবং স্বাধীন গ্রাফিক ডিজাইনার বা ডেভেলপার।
১০. অবহেলিত পরিবহন খাত, কৃষক ও দিনমজুরদের পরিসংখ্যানভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা
শ্রমবাজারের মূল চালিকাশক্তি হওয়া সত্ত্বেও যে জনগোষ্ঠী রাষ্ট্রীয় নথিতে কর কাঠামো থেকে সম্পূর্ণ অদৃশ্য, তাদের প্রকৃত তথ্য ও রূপরেখা নিম্নরূপ:
ক) পরিবহন খাতের বিশাল শ্রমশক্তি (শতকরা ও সংখ্যা):
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (BRTA) এবং পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের যৌথ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত মিলিয়ে বাণিজ্যিক যানবাহনের সংখ্যা প্রায় ৫৫ থেকে ৬০ লাখ।
পেশাভিত্তিক ম্যাপিং: এর মধ্যে সিএনজি অটোরিকশা চালক, ট্যাক্সি ও লেগুনা চালক, রাইড শেয়ারিং (উবার/পাঠাও) মোটরবাইক ও কার চালক, এবং দূরপাল্লার বাস-ট্রাক চালক ও হেলপারদের সংখ্যা প্রায় ৭০ লাখ।
অর্থনৈতিক চিত্র: একজন সিএনজি বা ট্যাক্সি চালকের দৈনিক নিট আয় (জমা বা তেল খরচ বাদে) গড়ে ৮০০ থেকে ১,৫০০ টাকা, যা মাস শেষে ২৫,০০০ থেকে ৪৫,০০০ টাকা দাঁড়ায়। এটি প্রাতিষ্ঠানিক খাতের একজন মাঝারি সারির কর্মকর্তার বেতনের সমান। এই বিশাল অর্থের লেনদেনের কোনো হিসাব এনবিআর-এর কাছে নেই।
খ) কৃষক, খামারি ও কৃষিমজুর (৪৫.৪% শ্রমশক্তি):
BBS-এর তথ্যমতে, বাংলাদেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৪৫.৪% সরাসরি কৃষি খাতের সাথে যুক্ত, যার সংখ্যা ৪ কোটিরও বেশি।
পেশাভিত্তিক ম্যাপিং: প্রান্তিক ও মাঝারি চাষী, বাণিজ্যিক সবজি চাষী, মৎস্যজীবী বা জেলে, হাঁস-মুরগি ও ডেইরি খামারি, এবং দৈনিক চুক্তিতে কাজ করা কৃষিমজুর।
অর্থনৈতিক চিত্র: চাল, ডাল, সবজি বা মাছের বড় আড়তগুলোতে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার লেনদেন হয় সম্পূর্ণ ক্যাশ বা অনানুষ্ঠানিক মাধ্যমে। একজন মাঝারি বাণিজ্যিক সবজি চাষী বা মাছ চাষীর বার্ষিক মুনাফা অনেক ক্ষেত্রে করসীমা (সাড়ে ৩ লাখ টাকা) ছাড়িয়ে যায়, কিন্তু কর কাঠামোর আধুনিকায়ন না হওয়ায় তারা এই ব্যবস্থার বাইরে।
গ) দিনমজুর ও নির্মাণ শ্রমিক (Construction Workers):
দেশে আবাসন ও অবকাঠামো খাতের দ্রুত প্রসারের ফলে নির্মাণ শ্রমিক (রাজমিস্ত্রি, রডমিস্ত্রি, টাইলস মিস্ত্রি) এবং দিনমজুরদের সংখ্যা এখন প্রায় ৪০ লাখের ওপরে।
অর্থনৈতিক চিত্র: একজন দক্ষ টাইলস মিস্ত্রি বা রাজমিস্ত্রির দৈনিক মজুরি ৮০০ থেকে ১,২০০ টাকা। মাস শেষে তাদের আয় ২৫,০০০ থেকে ৩০,০০০ টাকার ওপরে হলেও তারা ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে থাকায় কর জালের বাইরে অবস্থান করছেন।
১১. ডিজিটাল কমার্স রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি ফোরাম (DCRAF)-এর কৌশলগত ভূমিকা (নতুন সংযুক্তি)
দেশের অনলাইন পেজ, সোশ্যাল মিডিয়া মার্চেন্ট, ভাসমান ই-কমার্স ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক পেশাজীবীদের কর ও আইনি কাঠামোর আওতায় আনার ক্ষেত্রে DCRAF অত্যন্ত বড় এবং স্ট্র্যাটেজিক অংশীদার হিসেবে কাজ করতে পারে:
ক) ডেটা সরবরাহ ও উদ্যোক্তা ম্যাপিং (Data & Mapping Partner): সরকারের পক্ষে দেশের তৃণমূল ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে থাকা লাখ লাখ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সঠিক পরিসংখ্যান বের করা অত্যন্ত কঠিন। এখানে DCRAF একটি "গবেষণা ও ডেটা পার্টনার" হিসেবে মাঠপর্যায়ের প্রকৃত পরিসংখ্যান ও SME উদ্যোক্তাদের সুনির্দিষ্ট ডেটাবেজ তৈরিতে সরকারকে সরাসরি ডেটা দিয়ে সহায়তা করবে।
খ) সচেতনতা তৈরি ও 'স্মার্ট লাইসেন্স' বিতরণ বুথ: নাগরিকদের মনে কর বা লাইসেন্সের আইনি ভয় দূর করতে DCRAF তৃণমূল পর্যায়ে ব্যাপক সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন করবে। এমনকি দেশের ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারগুলোর পাশাপাশি DCRAF-এর নিজস্ব নেটওয়ার্ককে "স্মার্ট লাইসেন্স ও অটো-টিন ওয়ান-স্টপ বুথ" হিসেবে ব্যবহারের মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের সরকারি জালের সাথে সম্পৃক্ত করবে।
গ) সরকারের পলিসি অ্যাডভোকেসি ও মধ্যস্থতাকারী (Policy Advocate): জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) বা আইসিটি মন্ত্রণালয়ের কাছে এই বৈপ্লবিক প্রস্তাবনাটি পেশ করতে এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অধিকার সম্পূর্ণ রক্ষা করে কীভাবে রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করা যায়, সেই উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারণী সংলাপে DCRAF সরকার ও তৃণমূল উদ্যোক্তাদের মধ্যে প্রধান অ্যাডভোকেসি সেতু হিসেবে কাজ করবে。
১২. বাংলাদেশের প্রচলিত কর নীতি, এনবিআর (NBR) এর সীমাবদ্ধতা ও আধুনিকায়নের উপায়
বাংলাদেশের বর্তমান কর আইনি কাঠামো (আয়কর আইন, ২০২৩) এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) কার্যপদ্ধতি মূলত "শাস্তিমূলক ও জটিল", যা সার্বজনীন করের ধারণার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। এই অপ্রচলিত বিশাল জনগোষ্ঠীকে করজাতে আনতে হলে প্রচলিত নীতিমালার বৈপ্লবিজ্ঞান আধুনিকায়ন প্রয়োজন:
বর্তমান আইন ও এনবিআর-এর প্রধান জটিলতাসমূহ:
ট্যাক্স রিটার্নের জটিল ফরম: বর্তমান কর আইন অনুযায়ী আয় শূন্য হলেও বা ন্যূনতম কর দিতে গেলেও ২৫ থেকে ৩০ পৃষ্ঠার একটি জটিল রিটার্ন ফরম পূরণ করতে হয়, যা একজন সাধারণ রিকশাচালক বা রাজমিস্ত্রি বা যেকোনো কর্মজীবীর পক্ষে অসম্ভব।
অফিসিয়াল হয়রানি ও অডিট ভীতি: করদাতার মনে সাধারণ একটি ভয় কাজ করে যে, একবার টিআইএন (TIN) খুললে বা কর দিলে প্রতি বছর কর অফিসের কর্মকর্তাদের নোটিশ বা অডিটের মুখোমুখি হতে হবে।
ট্রেড লাইসেন্স ও প্রাতিষ্ঠানিক বাধ্যবাধকতা: প্রচলিত নিয়মে কর দিতে বা ব্যবসা দৃশ্যমান করতে ট্রেড লাইসেন্স, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও ভ্যাট রেজিস্ট্রেশন লাগে, যা অলিতে-গলির ফুটপাত ব্যবসায়ীদের পক্ষে জোগাড় করা সম্ভব নয়।
এনবিআর ও প্রচলিত নীতিমালা আধুনিকায়নের সুনির্দিষ্ট উপায়:
১. 'আয়কর আইন' থেকে 'সার্বজনীন নাগরিক আমানত আইন'-এ রূপান্তর:
আইনগতভাবে করদাতার সংজ্ঞা পরিবর্তন করতে হবে। করের ফাইলকে একটি "শাস্তিমূলক ফাইল" হিসেবে না দেখে এটিকে নাগরিকের "ভবিষ্যতের ডিপিএস বা নিরাপত্তা অ্যাকাউন্ট" হিসেবে আইনি স্বীকৃতি দিতে হবে।
২. এনবিআর-এর ওয়ান-পেজ ডিজিটাল নো-ফিলিং (No-Filing) নীতি:
১২ কোটি ভোটারের এই অটো-টিনের জন্য কোনো রিটার্ন ফরম থাকবে না। এনবিআর একটি ১ পৃষ্ঠার ডিজিটাল ইন্টারফেস তৈরি করবে, যেখানে শুধু ৩টি বোতাম থাকবে—১) ন্যূনতম কর, ২) মধ্যম কর, ৩) উচ্চ কর। নাগরিক তার সুবিধা অনুযায়ী বোতাম চেপে পেমেন্ট গেটওয়ে দিয়ে টাকা পাঠিয়ে দেবে। এনবিআর এর জন্য কোনো অ্যাকাউন্ট অডিট বা নোটিশ পাঠাতে পারবে না।
৩. এনবিআর-এর সাথে নির্বাচন কমিশন (NID) ও বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেটা ইন্টিগ্রেশন:
এনবিআর-এর কর ব্যবস্থা সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় করতে হবে। নির্বাচন কমিশনের এনআইডি সার্ভারের সাথে বাংলাদেশ ব্যাংকের ইন্টারঅপারেবল ডিজিটাল ট্রানজেকশন প্ল্যাটফর্ম (যেমন: বিনিময় বা এমএফএস গেটওয়ে) যুক্ত থাকবে। একজন অপ্রচলিত ব্যবসায়ী বা মিস্ত্রি যখনই ডিজিটাল লেনদেন করবেন, তার করের হিসাব ব্যাক-এন্ডে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি হবে, তাকে কোনো নথি জমা দিতে হবে না।
৪. মাঠ পর্যায়ের ট্যাক্স কালেকশন বুথ বাতিল করে 'ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার' ব্যবহার:
কর আদায়ের জন্য মানুষকে কর অঞ্চলে যেতে হবে না। গ্রামীণ ও অপ্রচলিত কর্মজীবীদের সুবিধার্থে দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার (UDC) এবং ডাকঘরকে "সার্বজনীন কর ও সুবিধা কেন্দ্র" হিসেবে ঘোষণা করতে হবে, যেখানে তারা গিয়ে সহজেই তাদের সামাজিক সুবিধা বা পেনশনের আপডেট দেখতে পাবেন।
১৩. সার্বজনীন কর ব্যবস্থাকে নিশ্ছিদ্র ও সফল করার জন্য আরও কিছু বৈপ্লবিক সাজেশন
১২ কোটি ভোটারের এই মহাপরিকল্পনাকে সম্পূর্ণ নিশ্ছিদ্র ও সফল করতে নিম্নোক্ত ৪টি কৌশল প্রয়োগ করা যেতে পারে:
১. লিটার বা টোকেন ভিত্তিক 'পরোক্ষ-প্রত্যক্ষ কর' রূপান্তর (Indirect-to-Direct Tax Conversion):
পরিবহন চালক বা কৃষকদের আলাদা করে কর অফিসে গিয়ে টাকা জমা দেওয়ার জটিলতা এড়াতে একটি স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি চালু করা যেতে পারে। যেমন—ট্যাক্সি বা সিএনজি চালকরা যখনই ফুয়েল পাম্প থেকে সিএনজি, অকটেন বা ডিজেল কিনবেন, প্রতি লিটারে ১ টাকা করে "সার্বজনীন কর ও সামাজিক নিরাপত্তা তহবিল (UTSF)"-এ কেটে নেওয়া হবে, যা সরাসরি পাম্পের ডিজিটাল নজদারির মাধ্যমে চালকের এনআইডি-টিন অ্যাকাউন্টে জমা হয়ে যাবে। বছর শেষে এটিই তার ন্যূনতম কর হিসেবে গণ্য হবে।
২. কৃষি ও গ্রামীণ আড়তে 'ডিজিটাল লেজার' বা 'ডিজিটাল খতিয়ান':
মাছ, ধান বা ফলমূল বা সবজি আড়তে যখন কোনো প্রান্তিক চাষী বা মৎস্যজীবী পাইকারি বিক্রি করবেন, তখন আড়তদারের ডিজিটাল পিওএস (POS) মেশিনে চাষীর এনআইডি পাঞ্চ করা হবে। বিক্রয়মূল্যের একটি অত্যন্ত ক্ষুদ্র অংশ (যেমন ০.১%) সরাসরি কর হিসেবে কেটে তার টিন প্রোফাইলে জমা হবে এবং বিনিময়ে রাষ্ট্র তাকে "ফ্রি কৃষি বীমা" ও "ফসলহানি ক্ষতিপূরণ গ্যারান্টি" দেবে।
৩. গ্রামীণ ও অপ্রচলিত খাতের জন্য "ট্যাক্স-রিটার্ন মুক্ত কার্ড" (Tax-Return Free Card):
যেসব নাগরিকের বার্ষিক আয় করসীমার নিচে কিন্তু তারা দেশের স্বার্থে এবং নাগরিক সুবিধার আশায় ন্যূনতম ১,০০০ বা ২,০০০ টাকা কর দেবেন, তাদের জন্য কোনো "আয়কর রিটার্ন দাখিল" আইনিভাবে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও বাতিল করতে হবে। তাদের একটি গোল্ডেন বা গ্রিন "স্মার্ট ট্যাক্স কার্ড" দেওয়া হবে। এই কার্ডটি পকেট বা ওয়ালেটে থাকা মানেই তিনি রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃত একজন সম্মানিত নাগরিক, যাকে কোনো সরকারি অফিস বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বিনা কারণে হয়রানি করতে পারবে না।
৪. মেগা প্রজেক্টের চেয়ে 'সোশ্যাল সিকিউরিটি' বাজেটের প্রাধান্য:
এই সার্বজনীন কর ব্যবস্থা থেকে সংগৃহীত অর্থের ১০০% সম্পূর্ণ আলাদা এবং স্বাধীন একটি অডিট বডির অধীনে থাকবে। বাজেটে এই টাকার একটি অংশও রাস্তাঘাট বা মেগা প্রজেক্টে যাবে না। এটি সরাসরি দৃশ্যমান হবে—১) প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ফ্রি কোয়ালিটি লাঞ্চ এবং শিক্ষা উপকরণ, ২) প্রতিটি থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বিনামূল্যে আধুনিক ডায়াগনস্টিক ও ঔষধ সরবরাহ, এবং ৩) ৬৫ বছর ঊর্ধ্ব প্রতিটি করদাতার অ্যাকাউন্টে স্বয়ংক্রিয় মাসিক পেনশন প্রেরণ।
১৪. এনআইডি-সংযুক্ত "স্মার্ট ভ্রাম্যমাণ ট্রেড লাইসেন্স" ও আইনি বাধ্যবাধকতা
ফুটপাত, পাড়া-মহল্লা বা অলিতে-গলিতে নিয়োজিত কাপড় ব্যবসায়ী, খাবারের দোকানদার, ফল বিক্রেতা কিংবা ভাসমান হকারসহ যেকোনো অপ্রচলিত ব্যবসায়ীকে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনতে এবং তাদের নিখুঁত পরিসংখ্যান তৈরি করতে একটি সম্পূর্ণ নতুন আইনি বাধ্যবাধকতা প্রবর্তন করতে হবে:
বাধ্যতামূলক মোবাইল ট্রেড লাইসেন্স: প্রচলিত নিয়মে স্থায়ী দোকান ছাড়া ট্রেড লাইসেন্স দেওয়া হয় না। এই নীতি পরিবর্তন করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও সিটি কর্পোরেশনের অধীনে "স্মার্ট মোবাইল ট্রেড লাইসেন্স" (Smart Mobile Trade License) চালু করতে হবে। যেকোনো ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ী তার এনআইডি কার্ডের মাধ্যমে এক মিনিটে এই লাইসেন্স নিতে পারবেন।
নামমাত্র বার্ষিক চার্জ ও স্বয়ংক্রিয় ট্র্যাকিং: এই অপ্রচলিত বা ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে ট্রেড লাইসেন্সের বার্ষিক ফি হবে অত্যন্ত কম (যেমন: বছরে মাত্র ২০০ থেকে ৫০০ টাকা)। এই প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ ডিজিটাল হওয়ায় এবং এনআইডির সাথে যুক্ত থাকায়, রাষ্ট্র তাত্ক্ষণিকভাবে জানতে পারবে দেশে ঠিক কত লক্ষ মানুষ কোন ধরনের ক্ষুদ্র ও ভ্রাম্যমাণ ব্যবসার সাথে জড়িত।
রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও আইনি সুরক্ষা: এই স্বল্পমূল্যের লাইসেন্সটি থাকার কারণে ওই ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ী আইনি বৈধতা পাবেন। ফলে রাস্তা বা ফুটপাতে ব্যবসা করার সময় স্থানীয় চাঁদাবাজ বা অন্য কোনো পক্ষের হয়রানির শিকার হলে রাষ্ট্র তাকে সুরক্ষা দেবে। এর বিনিময়ে তাদের ক্যাশ ফ্লো এবং ব্যবসাটি সরকারের অর্থনৈতিক নজরদারি ও সার্বজনীন কর সীমার মধ্যে চলে আসবে।
১৫. বৈশ্বিক জার্নাল ও রাজস্ব নীতিমালা আধুনিকায়নে আরও কিছু সুনির্দিষ্ট সাজেশন
বিশ্বব্যাংক (World Bank) এবং আইএমএফ (IMF) এর আন্তর্জাতিক কর ব্যবস্থাপনা জার্নাল ও আধুনিক কল্যাণ রাষ্ট্রগুলোর (Welfare States) সফল রাজস্ব নীতিমালার আলোকে এই ড্রাফটটিকে চূড়ান্ত রূপ দিতে আরও ৪টি কৌশল যুক্ত করা প্রয়োজন:
ক) নেগেটিভ ইনকাম ট্যাক্স (Negative Income Tax - NIT) মডেল প্রবর্তন:
বিশ্বখ্যাত অর্থনীতিবিদ মিল্টন ফ্রিডম্যানের এই তত্ত্বটি উন্নত বিশ্বে অত্যন্ত সফল। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে, দিনমজুর, রিকশাচালক বা অত্যন্ত ক্ষুদ্র আয়ের পেশাজীবীরা যখন তাদের এনআইডি-টিনের মাধ্যমে ন্যূনতম ১,০০০ টাকা কর দিয়ে রাষ্ট্রীয় খাতায় নিজেদের নাম নথিভুক্ত রাখবেন, তখন বছর শেষে মন্দা বা দুর্যোগের সময়ে (যেমন বন্যা বা তীব্র শীত) রাষ্ট্র তাদের আয়ের ঘাটতি মেটাতে "সোশ্যাল ডিপিএস" তহবিল থেকে সরাসরি তাদের অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠাবে। এটি করদাতাদের মধ্যে একটি স্থায়ী মানসিক আস্থা তৈরি করবে।
খ) "ট্যাক্স লয়্যালটি" স্কোরের মাধ্যমে নাগরিক অগ্রাধিকার:
ব্যাংকিং খাতের ক্রেডিট স্কোরের মতো নাগরিকদের জন্য "ট্যাক্স লয়্যালটি স্কোর" চালু করতে হবে। একজন রাজমিস্ত্রি, টেক্সি ড্রাইভার বা কাপড় ব্যবসায়ী টানা ৩ বছর তার এনআইডির বিপরীতে ন্যূনতম কর এবং ভ্রাম্যমাণ ট্রেড লাইসেন্স ফি দিলে তার স্কোর বৃদ্ধি পাবে। এই স্কোরের ওপর ভিত্তি করে তার পরিবার রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা, যেমন—সরকারি দূরপাল্লার যাতায়াতে টিকিট বুকিংয়ে অগ্রাধিকার, রেলে বিশেষ কোটা এবং রাষ্ট্রীয় যেকোনো অনুদান পাওয়ার ক্ষেত্রে এক ধাপ এগিয়ে থাকবে।
গ) এনবিআর-এর মাঠপর্যায়ের ক্ষমতা বিকেন্দ্রেকরণ ও "ডিজিটাল অমবুডসম্যান" (Ombudsman):
প্রচলিত কর ব্যবস্থাপনায় কর কর্মকর্তাদের যে সীমাহীন ক্ষমতা দেওয়া আছে, তা সম্পূর্ণ বাতিল করতে হবে। সার্বজনীন কর আদায়ের পুরো প্রক্রিয়াটি অ্যাপের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় হওয়ায় কোনো কর্মকর্তা কোনো সাধারণ নাগরিককে নোটিশ বা ব্যক্তিগত জবাবদিহিতার জন্য ডাকতে পারবেন না। যেকোনো কর সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য একটি স্বাধীন "ডিজিটাল কর ন্যায়পাল" বা ডিজিটাল অমবুডসম্যান অফিস থাকবে, যেখানে নাগরিকরা ঘরে বসেই তাদের করের টাকা ও সুবিধাের হিসাবের বিষয়ে আপিল করতে পারবেন।
ঘ) কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (CSR) তহভিলের সরাসরি সংযোগ:
দেশের বড় বড় প্রাতিষ্ঠানিক করদাতাদের (যেমন ব্যাংক বা বাণিজ্যালয়) কর্পোরেট ট্যাক্সের একটি নির্দিষ্ট অংশ সরাসরি এই "সার্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তা ট্রাস্ট ফান্ডে" স্থানান্তরের আইনি বিধান করতে হবে। এই সংযুক্তির ফলে, ব্যক্তিপর্যায়ের ক্ষুদ্র করদাতাদের দেওয়া টাকার সাথে প্রাতিষ্ঠানিক করের একটি অংশ যুক্ত হয়ে তহভিলের আকার বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে, যা দিয়ে প্রান্তিক পেশাজীবীদের শিক্ষা ও মানসম্মত চিকিৎসার শতভাগ গ্যারান্টি দেওয়া রাষ্ট্রের পক্ষে সহজ হবে।
১৬. রাজস্ব আদায় গতিশীল ও নিশ্ছিদ্র করার জন্য আরও কিছু স্ট্র্যাটেজিক সাজেশন
১২ কোটি ভোটারের এই ঐতিহাসিক অটো-টিন এবং ভ্রাম্যমাণ স্মার্ট ট্রেড লাইসেন্স মডেলটি মাঠপর্যায়ে শতভাগ সফল করতে এবং সরকারের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে আরও ৪টি কৌশল প্রয়োগ করা আবশ্যক:
ক) 'মাইক্রো-ট্যাক্স হলিডে' (Micro-Tax Holiday) ও ইনসেন্টিভ পিরিয়ড:
নতুন এই আইনি কাঠামো চালুর প্রথম ১ বা ২ বছর অপ্রচলিত ও ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীদের কর বা লাইসেন্স ফি আদায়ের চেয়ে তাদের 'ডেটাবেজ ভেরিফিকেশন' বা পরিসংখ্যান তৈরিতে বেশি জোর দিতে হবে। এই সময়কালকে 'ইনসেন্টিভ পিরিয়ড' ঘোষণা করে বলা যেতে পারে—যারা প্রথম বছরের মধ্যে স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্মার্ট মোবাইল ট্রেড লাইসেন্স নেবেন, তাদের পরবর্তী বছরের কর বা ফি সম্পূর্ণ মওকুফ করা হবে। এতে জরিমানার ভয় ছাড়াই কোটি কোটি মানুষ দ্রুত সরকারি ডেটাবেজে অন্তর্ভুক্ত হবে।
খ) স্থানীয় 'মার্কেট ও হকার্স অ্যাসোসিয়েশন'কে ডিজিটালি জবাবদিহিতার আওতায় আনা:
ফুটপাত বা গ্রামীণ হাটের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা সাধারণত স্থানীয় বিভিন্ন সমিতি বা লাইন ম্যানদের দৈনিক চাঁদা দিয়ে ব্যবসা করেন। এই ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে স্থানীয় বাজার কমিটিকে একটি 'ডিজিটাল নোড' বা সরকারি প্রতিনিধি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া যেতে পারে। সমিতিগুলো চাঁদা তোলার পরিবর্তে প্রতিটি ব্যবসায়ীর স্মার্ট লাইসেন্স স্ক্যান করে তাদের সরকারি কোষাগারে ন্যূনতম ফি জমা নিশ্চিত করবে। যে বাজার বা সমিতি শতভাগ অন্তর্ভুক্তি দেখাবে, সেই বাজারের অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য সরকার বিশেষ বরাদ্দ দেবে।
গ) 'ট্যাক্স-ব্যাক গ্যারান্টি' (Tax-Back Guarantee) বা রিফান্ড স্কিম:
নিম্ন আয়ের দিনমজুর বা পরিবহন শ্রমিকদের মনে কর দেওয়ার আগ্রহ স্থায়ী করতে একটি রিফান্ড নীতি রাখা যেতে পারে। কোনো করদাতা যদি টানা ৫ বছর তার এনআইডির বিপরীতে ন্যূনতম কর (১,০০০ বা ২,০০০ টাকা) জমা দেন এবং এই সময়ে তিনি বা তার পরিবার কোনো কারণে বড় কোনো সরকারি সামাজিক সুবিধা ভোগ না করেন, তবে জরুরি প্রয়োজনে (যেমন: মেয়ের বিয়ে বা স্থায়ী ঘর নির্মাণ) রাষ্ট্র তাকে জমাকৃত অর্থের একটি নির্দিষ্ট অংশ বিনাসুদে বা অনুদান হিসেবে 'ট্যাক্স-ব্যাক' বা ফেরত দেবে।
ঘ) ডিজিটাল এনআইডি অ্যাকাউন্টে 'ইউনিভার্সাল ওয়ালেট' (Universal Wallet) বা সার্বজনীন ওয়ালেট সংযোজন:
নাগরিকদের জন্য কর দেওয়া ও রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে চিকিৎসা বা পেনশন ভাতা পাওয়া সহজ করতে প্রতিটি এনআইডির বিপরীতে একটি নিজস্ব সরকারি 'ডিজিটাল ওয়ালেট' থাকবে। নাগরিক তার মোবাইল ব্যাংক (বিকাশ/নগদ) থেকে এই ওয়ালেটে টাকা জমা দিয়ে এক ক্লিকে কর দিতে পারবেন। আবার বছর শেষে রাষ্ট্র তাকে যে সাবসিডি, কৃষি বিমা বা পেনশনের টাকা দেবে, তা-ও সরাসরি কোনো মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই এই ওয়ালেটে চলে আসবে। ফলে পুরো কর ও সুবিধা চক্রটি সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত হবে।
১৮ বছর পূর্ণ হলেই এনআইডির সাথে অটো-টিন জেনারেট করা এবং ন্যূনতম করের বিনিময়ে শতভাগ নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করার এই প্রস্তাবটি বাংলাদেশের অর্থনীতিকে স্বনির্ভর করার সবচেয়ে কার্যকর পথ। করকে যখন নাগরিকরা নিজের এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের 'নিরাপত্তা আমানত' মনে করবেন, তখনই এ দেশের মানুষ স্বইচ্ছায় ও গর্বের সাথে কর দিতে এগিয়ে আসবে।
Comments