অতিরঞ্জিত প্রচার নয়, উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যে: ২০৩০ সালে বাংলাদেশের ই-কমার্সের ব্লু-প্রিন্ট
দেশের অর্থনীতিতে ডিজিটাল বিপ্লবের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে বারবার উঠে এসেছে ই-কমার্সের নাম। তবে কেবল অতিরঞ্জিত প্রচারণা বা সাময়িক উচ্ছ্বাসের ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং তথ্য-উপাত্তের বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ এবং সঠিক কৌশলগত বিনিয়োগই পারে এই খাতকে টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে নিয়ে যেতে। সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণায় উঠে এসেছে এমন সব চাঞ্চল্যকর তথ্য ও মহাপরিকল্পনা, যা আমাদের ই-কমার্স খাতের অনাগত দিনগুলোর পথনির্দেশক হতে পারে।
তথ্য ও বাস্তবতার ব্যবধান: একটি বিশ্লেষণ
প্রতিবেদনটিতে বর্তমানে প্রচলিত কিছু ধারণাকে 'মিথ' বা অতিরঞ্জিত প্রচার হিসেবে চিহ্নিত করে প্রকৃত সত্য তুলে ধরা হয়েছে। সাধারণভাবে মনে করা হয় বাংলাদেশের ই-কমার্স বাজারের আকার বর্তমানে ৫ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু তথ্যের গভীর বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রকৃত খুচরা ই-কমার্সের (Retail E-commerce) আকার আসলে ১.৮ বিলিয়ন থেকে ২.২ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে। বড় অংকের ৫ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে মূলত ডিজিটাল সেবা, ভ্রমণ এবং বিটুবি কমার্স (B2B Commerce) অন্তর্ভুক্ত থাকায় খুচরা বাজারের প্রকৃত চিত্রটি আড়ালে পড়ে যায়।
একইভাবে বিক্রেতাদের সক্রিয়তা নিয়েও একটি বড় ব্যবধান লক্ষ্য করা গেছে। নথিপত্রে ১০ লাখ নিবন্ধিত বিক্রেতার কথা বলা হলেও বাস্তবে প্রতি মাসে মাত্র ৩ থেকে ৪ লাখ বিক্রেতা সক্রিয় থাকেন, যা এই খাতের উচ্চ অস্থিরতা ও অপেশাদারিত্ব নির্দেশ করে। এছাড়া ২০৩০ সালের মধ্যে ৫ মিলিয়ন উদ্যোক্তা তৈরির যে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য প্রচার করা হচ্ছে, তার বিপরীতে বাস্তবসম্মত ও টেকসই প্রক্ষেপণ হলো ২.২ মিলিয়ন। অর্থাৎ সঠিক পথে এগোলে আনুষ্ঠানিক বিক্রেতার (Formal Sellers) সংখ্যা বর্তমানের তুলনায় ১৪ গুণ বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রবৃদ্ধির রূপরেখা: ৪-স্তম্ভের বিস্তারিত কাঠামো
ই-কমার্স খাতকে ২০৩০ সালের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে নিয়ে যেতে যে ৪-স্তম্ভের কৌশলগত কাঠামো (Strategic Framework) প্রস্তাব করা হয়েছে, তার প্রতিটি স্তরে রয়েছে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা:
* নীতিমালা ও শাসন (Policy & Governance): এই স্তরের মূল লক্ষ্য হলো একটি স্বচ্ছ ও ব্যবসা-বান্ধব আইনি কাঠামো তৈরি করা। এর মধ্যে রয়েছে জাতীয় পর্যায়ের ডিজিটাল কমার্স নীতিমালা এবং শক্তিশালী তথ্য সুরক্ষা আইন (Data Protection Law), যা গ্রাহক ও উদ্যোক্তা উভয়ের স্বার্থ রক্ষা করবে। এছাড়া ইকোসিস্টেমের সুষ্ঠু তদারকির জন্য প্রশাসনিক কাঠামোর আধুনিকায়নও এর অন্তর্ভুক্ত।
* আর্থিক উদ্ভাবন (Financial Innovation): ক্যাশ অন ডেলিভারির (Cash on Delivery) ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ক্যাশলেস সোসাইটি (Cashless Society) বিনির্মাণে এটি গুরুত্বপূর্ণ। এর আওতায় পেমেন্ট গেটওয়ের আধুনিকায়ন, ইন্টারঅপারেবল লেনদেন এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণের (Micro-credit) ব্যবস্থা করা হবে। ডিজিটাল পেমেন্টের নিরাপত্তা বৃদ্ধি করা এই স্তম্ভের অন্যতম বড় লক্ষ্য।
* সক্ষমতা বৃদ্ধি (Capacity Building): এটি মূলত দক্ষতা উন্নয়ন কেন্দ্রিক। উদ্যোক্তাদের কারিগরি প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল মার্কেটিং এবং ব্যবসায়িক ব্যবস্থাপনায় দক্ষ করে গড়ে তোলার মাধ্যমে ই-কমার্স ইকোসিস্টেমকে শক্তিশালী করা হবে। বিশেষ করে নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ ইনকিউবেশন প্রোগ্রাম (Incubation Program) এবং গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের মূল ধারায় নিয়ে আসা এর প্রধান উদ্দেশ্য।
* লজিস্টিক অবকাঠামো (Logistics Infrastructure): পণ্য সরবরাহের নিরবচ্ছিন্ন ব্যবস্থা গড়ে তোলাই এর লক্ষ্য। এতে রয়েছে আধুনিক ওয়্যারহাউস (Warehouse) বা গুদাম ব্যবস্থাপনা, স্মার্ট ডেলিভারি ট্র্যাকিং এবং পচনশীল পণ্যের জন্য কোল্ড চেইন নেটওয়ার্ক (Cold Chain Network) স্থাপন, যা দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের পণ্যকেও দ্রুততম সময়ে মূল বাজারে পৌঁছে দেবে।
২০৩০ সালের অর্থনৈতিক প্রভাব ও সম্ভাবনা
এই ৪-স্তম্ভের মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে আগামী ৫ বছরে ১,৫৭৫ কোটি টাকার একটি কৌশলগত বিনিয়োগ প্রস্তাব করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এই বিনিয়োগ থেকে ৬.৮:১ অনুপাতে যে অর্থনৈতিক রিটার্ন আসবে, তা জাতীয় অর্থনীতিতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে। সঠিক তদারকি ও বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে ২০২৬ সালে যেখানে আনুষ্ঠানিক ডিজিটাল বিক্রেতার সংখ্যা হবে ১ লাখ ৫০ হাজার, ২০৩০ সালে তা বেড়ে দাঁড়াবে ২২ লাখে।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। ২০২৬ সালে এই খাত যেখানে ৫০ লাখ মানুষের জীবিকায় সহায়তা করবে, ২০৩০ সালে তা তিন গুণ বেড়ে ১ কোটি ৫০ লাখে উন্নীত হবে। সামগ্রিক অর্থনীতিতে ই-কমার্সের অবদানও ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাবে। ২০২৬ সালে জিডিপিতে (GDP) এই খাতের অবদান ১.২ শতাংশ হওয়ার পূর্বাভাস থাকলেও ২০৩০ সাল নাগাদ তা ৩.৫ শতাংশে উন্নীত হবে বলে প্রক্ষেপণ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরঞ্জিত তথ্যের পেছনে না ছুটে ডেটা-নির্ভর বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে এই ৪-স্তম্ভের কাঠামো অনুসরণ করলে বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে একটি শক্তিশালী এবং বিশ্বমানের ডিজিটাল কমার্স ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে সক্ষম হবে। এই মহাপরিকল্পনার সফল বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে, এটি কেবল একটি ব্যবসা হিসেবে নয়, বরং ৬.৮:১ রিটার্ন রেশিও নিশ্চিত করে ১ কোটি ৫০ লাখ মানুষের নিশ্চিত জীবিকা ও স্বাবলম্বিতার প্রধান উৎসে পরিণত হবে।
Comments