প্রবাসে গিয়ে ফিরছেন লাশ হয়ে, নয় মাসে ৪ হাজারের বেশি মরদেহ দেশে এসেছে
প্রতিবছর জীবিকার সন্ধানে বিদেশে পাড়ি জমান হাজার হাজার বাংলাদেশি। কারও স্বপ্ন পরিবারের অভাব ঘোচানো, কারও লক্ষ্য সন্তানদের ভালোভাবে মানুষ করা, আবার কেউ চান একটু সচ্ছল জীবনের নিশ্চয়তা। কিন্তু সবার স্বপ্ন পূরণ হয় না। পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর প্রত্যাশায় বিদেশে যাওয়া অনেক কর্মীকে ফিরতে হয় কফিনবন্দী হয়ে। তাদের মৃত্যুতে থেমে যায় একটি পরিবারের স্বপ্ন, নেমে আসে চরম অনিশ্চয়তা।
প্রবাসী কর্মীদের মৃত্যুর পরিসংখ্যানও উদ্বেগজনক। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নয় মাসে ৪ হাজার ৬০ জনের মরদেহ দেশে এসেছে। সে হিসাবে প্রতিদিন গড়ে ১৪টির বেশি মরদেহ ফিরেছে বাংলাদেশে। হয়তো জমি বেচে নয়তো ঋণ করে পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যাক্তিটি অনেক আশা নিয়ে বিদেশে পাড়ি দিয়েছিল। সেই্ ব্যাক্তির মৃত্যুতে তার পরিবারে নেমে আসে চরম অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। সেই সাথে স্বজনদের দীর্ঘ অপেক্ষা এবং অসংখ্য প্রশ্ন।
কাজ করতে গিয়ে মৃত্যু, মরদেহ ফিরল ১৭ মাস পর
পাবনার আল আমিন জীবিকার সন্ধানে গিয়েছিলেন কম্বোডিয়ায়। কাজ করতেন একটি টাইলস কারখানায়। পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনার আশায় সেখানে কঠোর পরিশ্রম করতেন তিনি। কিন্তু কর্মস্থলেই ঘটে দুর্ঘটনা। শতাধিক টাইলসের নিচে চাপা পড়ে প্রাণ হারান আল আমিন।
২০২৫ সালের ১২ এপ্রিল তাঁর মৃত্যু হয়। অথচ মরদেহ দেশে পৌঁছায় ২০২৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর। মৃত্যুর পর স্বজনদের কাছে ফিরতে তাঁকে অপেক্ষা করতে হয়েছে প্রায় ১৭ মাস।
মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর আল আমিনের স্বজনেরা মরদেহ দেশে আনার জন্য বিভিন্ন দপ্তরে যোগাযোগ করেন। কম্বোডিয়ায় বাংলাদেশের দূতাবাস না থাকায় প্রক্রিয়াটি জটিল হয়ে পড়ে। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের সহায়তা চেয়েও প্রথম দিকে মরদেহের অবস্থান শনাক্ত করতে সমস্যায় পড়েন তাঁরা। পরে পরিবারের সদস্যরা স্থানীয় পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করলে মরদেহ দেশে পাঠানোর প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা পাওয়া যায়।
আল আমিনের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। বিদেশে কোনো কর্মীর মৃত্যু হলে তাঁর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে পরিবারকে অনেক সময় প্রশাসনিক জটিলতা ও দীর্ঘ অপেক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
মৃত্যুর কারণ নিয়ে প্রশ্ন
প্রবাসী কর্মীদের মৃত্যুর কারণ নিয়েও রয়েছে অনেক প্রশ্ন। প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে দেশে আসা মরদেহের প্রায় ৬৬ শতাংশের মৃত্যুর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে স্বাভাবিক মৃত্যু। বাকি ৩৪ শতাংশের মৃত্যু হয়েছে দুর্ঘটনাজনিত বিভিন্ন কারণে।
তবে স্বাভাবিক মৃত্যু বলতে ঠিক কী বোঝানো হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে মরদেহের সঙ্গে আসা কাগজপত্রে হার্ট অ্যাটাক কিংবা স্বাভাবিক মৃত্যুর কথা উল্লেখ থাকলেও মৃত্যুর পেছনের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানের তথ্য পাওয়া যায় না।
অভিবাসন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, কর্মস্থলে নির্যাতন, দুর্ঘটনা, আত্মহত্যায় প্ররোচনা কিংবা অন্য কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার শিকার হলেও অনেক কর্মীর মৃত্যুর যথাযথ তদন্ত হয় না। ফলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ অজানাই থেকে যায়। বিশেষ করে বিদেশে কর্মরত অবস্থায় মারা যাওয়া শ্রমিকদের ক্ষেত্রে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের সুযোগ কতটা রয়েছে, সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।
সড়ক ও কর্মস্থলের দুর্ঘটনায় ঝরছে প্রাণ
প্রবাসে বাংলাদেশি কর্মীদের মৃত্যুর অন্যতম কারণ সড়ক ও কর্মস্থলের দুর্ঘটনা। নির্মাণকাজে ভারী বস্তুর নিচে চাপা পড়া, ভবন থেকে পড়ে যাওয়া, সড়ক দুর্ঘটনা, আগুন ও বৈদ্যুতিক শকে প্রাণ হারাচ্ছেন অনেকে।
ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের পাঁচ বছরের পরিসংখ্যানেও দুর্ঘটনায় মৃত্যুর চিত্র উঠে এসেছে। ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ১৮ হাজার ১৬৬ জন প্রবাসী কর্মীর মরদেহ দেশে এসেছে। তাঁদের মধ্যে ৩ হাজার ৬৯৮ জন সড়ক ও কর্মস্থলের দুর্ঘটনা, আগুনে পোড়া, ভবন থেকে পড়ে যাওয়া এবং বৈদ্যুতিক শকে মারা গেছেন। শুধু সড়ক দুর্ঘটনাতেই প্রাণ হারিয়েছেন ২ হাজার ৬৪৯ জন।
নোয়াখালীর ফয়েজ আহম্মেদ ও তাঁর ছোট ভাই সুজন আহম্মেদের মৃত্যুর ঘটনাটি এর একটি মর্মান্তিক উদাহরণ। ফয়েজ দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবে কাজ করতেন। সাত মাস আগে ছোট ভাই সুজনও সেখানে গিয়ে তাঁর সঙ্গে কাজে যোগ দেন। দুই ভাই একই গাড়িতে খেজুর পরিবহনের কাজ করতেন। গত ১৬ জুলাই সড়ক দুর্ঘটনায় একসঙ্গে প্রাণ হারান তাঁরা। ২৮ জুলাই তাঁদের মরদেহ দেশে আসে।
দুই ছেলেকে হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েন বাবা আবদুল মালেক। যে সন্তানদের আয়ে পরিবারের সচ্ছলতা ফেরার কথা ছিল, তাদের দুজনকেই একসঙ্গে কবরে শায়িত করতে হয়েছে তাকে। এই মৃত্যুতে পরিবারটি শুধু দুটি সন্তানকেই হারায়নি, হারিয়েছে তাদের ভবিষ্যতের স্বচ্ছলতা ফেরার স্বপ্নও।
গরম, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও ঝুঁকিপূর্ণ কর্মপরিবেশ
মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে প্রচণ্ড গরমের মধ্যে কাজ করতে হয় বাংলাদেশি শ্রমিকদের। নির্মাণশিল্পসহ বিভিন্ন খাতে কর্মরত অনেক শ্রমিককে দীর্ঘ সময় খোলা জায়গায় রোদে কাজ করতে হয়। পর্যাপ্ত বিশ্রাম, বিশুদ্ধ পানি ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ না থাকলে স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়ে।
গবেষক ও অভিবাসন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, দীর্ঘ সময় অতিরিক্ত তাপমাত্রায় কাজ করলে শরীরে পানিশূন্যতা, তাপজনিত অসুস্থতা ও হৃদ্যন্ত্রের জটিলতার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে কিডনি ও হৃদ্রোগসহ নানা স্বাস্থ্যসমস্যাও দেখা দিতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা বাড়তে থাকায় এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় কর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি।
শারীরিক ঝুঁকির পাশাপাশি প্রবাসজীবনে রয়েছে মানসিক চাপও। পরিবার থেকে দূরে থাকা, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, আর্থিক অনিশ্চয়তা, মালিকপক্ষের চাপ ও নির্যাতনের ঘটনা অনেক শ্রমিককে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে দেয়।
নারী অভিবাসী কর্মীদের পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। বিদেশে গৃহকর্মে নিয়োজিত অনেক নারী যৌন নির্যাতন, শারীরিক ও মানসিক নিপীড়ন এবং গৃহবন্দী থাকার অভিযোগ করেন। এসব পরিস্থিতিতে কোনো নারীর মৃত্যু হলে আত্মহত্যা, নির্যাতন কিংবা অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না, তা গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা প্রয়োজন।
মরদেহ ফিরিয়ে আনতে দীর্ঘ অপেক্ষা
বিদেশে কোনো বাংলাদেশি কর্মীর মৃত্যু হলে তাঁর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীন ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড। তবে কর্মীর বৈধ কাগজপত্র না থাকলে কিংবা সংশ্লিষ্ট দেশে বাংলাদেশের দূতাবাস না থাকলে প্রক্রিয়াটি জটিল হয়ে পড়ে।
মৃত্যুসনদ সংগ্রহ, বিদেশি কর্তৃপক্ষের অনুমোদন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরি এবং মরদেহ পরিবহনের ব্যবস্থা করতে হয়। অনিয়মিত কর্মীদের ক্ষেত্রে এসব প্রক্রিয়ায় আরও বেশি সময় লাগতে পারে।
মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর স্বজনেরা অপেক্ষা করেন শেষবারের মতো প্রিয়জনের মুখ দেখার জন্য। কিন্তু সেই অপেক্ষা যখন মাসের পর মাস দীর্ঘ হয়, তখন শোকের সঙ্গে যুক্ত হয় অসহায়ত্বও। অনেক পরিবারের পক্ষে বিদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা কিংবা প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
আর্থিক সহায়তা কি স্বজন হারানোর ক্ষতি পূরণ করতে পারে?
প্রবাসে কর্মরত অবস্থায় কোনো বাংলাদেশি কর্মীর মৃত্যু হলে তাঁর পরিবারের জন্য সরকার আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা রেখেছে। দেশে আসা প্রতিটি মরদেহ দাফনের জন্য ৩৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়। পাশাপাশি মৃত কর্মীর পরিবারকে তিন লাখ টাকা আর্থিক অনুদান দেওয়া হয়। এ ছাড়া জীবনবিমা, বিদেশে বকেয়া বেতন, ক্ষতিপূরণ ও অন্যান্য পাওনা আদায়ের ক্ষেত্রেও দূতাবাসের মাধ্যমে সহযোগিতা করা হয়।
চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে মরদেহ দাফনের জন্য ৯ কোটি ৪৫ লাখ টাকা, আর্থিক অনুদান হিসেবে ৬১ কোটি ৫৬ লাখ টাকা এবং বিমাসুবিধা হিসেবে ৪৪ কোটি টাকার বেশি দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বিদেশ থেকে ক্ষতিপূরণ, বকেয়া বেতন ও বিমার অর্থ বাবদ প্রায় ৭৫ কোটি টাকা আদায় করে দেওয়া হয়েছে।
মৃত্যুর কারণও জানতে চায় পরিবার
প্রবাসী শ্রমিকেরা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্সে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী হয়, সচল থাকে দেশের অর্থনীতির চাকা। অথচ বিদেশে কর্মরত অবস্থায় তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মৃত্যুর পর প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
কোনো কর্মীর মৃত্যু হলে শুধু মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা কিংবা পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়াই রাষ্ট্রের দায়িত্বের শেষ কথা হতে পারে না। প্রতিটি অস্বাভাবিক মৃত্যুর নিরপেক্ষ তদন্ত, কর্মস্থলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যালোচনা এবং দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
বিদেশে যাওয়ার আগে কর্মীদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা সম্পর্কে প্রশিক্ষণ, কর্মস্থলে ঝুঁকি মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে কার্যকর সমন্বয় এবং বিপদে পড়া কর্মীদের দ্রুত সহায়তা নিশ্চিত করাও জরুরি।
Comments