যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর আবদুল এল-সাইয়েদ
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে দেশটির প্রথম মুসলিম সিনেটর হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন চিকিৎসক ও প্রগতিশীল রাজনীতিক আবদুল এল-সাইয়েদ। মিশিগান অঙ্গরাজ্যের অত্যন্ত আলোচিত ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সিনেট নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে পরাজিত করে তিনি এই ঐতিহাসিক গৌরব অর্জন করেন।
বুধবার (৪ নভেম্বর) ডেট্রয়েটে মিশিগান ডেমোক্রেটিক পার্টির কার্যালয়ে সমবেত সমর্থকদের সামনে নিজের বিজয় ঘোষণা করেন আবদুল এল-সাইয়েদ। বিজয় ভাষণে তিনি আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, 'আপনারা আমাকে নিজেদের বাড়িতে, গির্জায় ও সিনাগগে স্থান দিয়েছেন।' দীর্ঘ দেড় বছরের নির্বাচনি প্রচারণায় মিশিগানের প্রত্যন্ত জনপদ থেকে শুরু করে বড় বড় শহরের সাধারণ মানুষের কাছ থেকে যে অভূতপূর্ব সাড়া ও সমর্থন পেয়েছেন, তা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন তিনি।
কঠিন সময়ে ভোটারদের অটুট সমর্থন তাকে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি জুগিয়েছে উল্লেখ করে এল-সাইয়েদ বলেন, 'প্রতিপক্ষ এমন এক আমেরিকা দেখতে চায়, যেখানে আমাদের অনেকেরই কোনো স্থান নেই। কিন্তু আমরা জানি, আমাদের সবার বসবাসের জন্যই আমেরিকা যথেষ্ট বড়।'
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম 'দ্য গার্ডিয়ান'-এর প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, নির্বাচনি প্রচারণাকালে আবদুল এল-সাইয়েদের মুসলিম পরিচয়কে কেন্দ্র করে নানা ধরনের বিতর্ক ও নোংরা রাজনৈতিক কৌশল অবলম্বন করা হয়েছিল। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ তার কট্টর বিরোধীরা এল-সাইয়েদকে লক্ষ্য করে নানামুখী ইসলামবিদ্বেষী বক্তব্য দেন। এমনকি ট্রাম্প তাকে 'জিহাদি' বলেও আক্রমণ করতে দ্বিধা করেননি।
তবে এসব বিদ্বেষপূর্ণ আক্রমণের কঠোর জবাব দিয়ে এল-সাইয়েদ বলেন, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতির মতো মৌলিক প্রশ্নগুলোর কোনো সদুত্তর দিতে না পেরেই প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য বিভাজনের পথ বেছে নিয়েছিল।
মিশিগানের সাবেক স্বাস্থ্য পরিচালক আবদুল এল-সাইয়েদ ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রাথমিক নির্বাচনেই বড় ধরনের চমক দেখিয়েছিলেন। দলীয় হাইকমান্ডের পছন্দের প্রার্থী হেইলি স্টিভেন্সকে হারিয়ে তিনি সবাইকে তাক লাগিয়ে মনোনয়ন নিশ্চিত করেন।
নির্বাচনি প্রচারণায় তিনি সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে 'মেডিকেয়ার ফর অল' কর্মসূচির জোরালো পক্ষে অবস্থান নেন। একই সঙ্গে ফিলিস্তিন ইস্যুতে ইসরায়েলকে মার্কিন সামরিক সহায়তা বন্ধের আহ্বান জানিয়ে সাহসী অবস্থান নেন তিনি। তার এই প্রগতিশীল নীতি ঠেকাতে এবং তার নির্বাচনী প্রচারণার গতি রোধ করতে ইসরায়েলপন্থি শক্তিশালী লবি সংগঠন এআইপ্যাকের সুপার পিএসি 'ইউনাইটেড ডেমোক্রেসি প্রজেক্ট' প্রাথমিক নির্বাচনে প্রায় ৩ কোটি ডলার ব্যয় করেছিল, যা একক কোনো নির্বাচনী লড়াইয়ে ব্যয়ের ক্ষেত্রে একটি রেকর্ড হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিজয় ভাষণে এই প্রসঙ্গ টেনে এল-সাইয়েদ স্পষ্ট জানিয়ে দেন, 'আমরা চাই আমাদের কষ্টার্জিত করের অর্থ দেশের ভেতরেই—আমাদের স্কুল, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা ও অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় হোক। কোনো বর্ণবাদী শাসন, গণহত্যা কিংবা ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের পেছনে আমাদের ট্যাক্সের একটি কানাকড়িও খরচ হোক—তা আমরা চাই না।'
অন্যদিকে, এল-সাইয়েদের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্স ছিলেন একজন সাবেক কংগ্রেস সদস্য। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি সমর্থন নিয়ে তিনি নির্বাচনে লড়েছিলেন। তবে প্রচারণার শেষ পর্যায়ে এসে শুল্কনীতি এবং ইরান যুদ্ধ সংক্রান্ত বিষয়ে নিজের আগের অবস্থান থেকে কিছুটা সরে আসেন তিনি।
উল্লেখ্য, মিশিগানের এই গুরুত্বপূর্ণ আসনটি থেকে বিদায়ী সিনেটর গ্যারি পিটার্স ২০১৫ সাল থেকে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। তার অবসরের ফলে আসনটি শূন্য হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের মিশিগানের এই নির্বাচনটি একটি 'সুইং স্টেট' বা দোদুল্যমান অঙ্গরাজ্যে কোনো প্রগতিশীল প্রার্থীর প্রকৃত জনপ্রিয়তা ও জনসমর্থন যাচাইয়ের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পরীক্ষা ছিল, যেখানে সফলতার সঙ্গে বিজয়ী হয়ে ইতিহাস গড়লেন আবদুল এল-সাইয়েদ।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
Comments