শ্রমিক অসন্তোষ থেকে বিনিয়োগ সংকট, চাপে বাংলাদেশের অর্থনীতি
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাকশিল্প। লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং দেশের শিল্পায়নে এই খাতের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে শ্রমিক অসন্তোষ, কারখানা বন্ধ, বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং উৎপাদন ব্যয়ের চাপ মিলিয়ে পোশাকশিল্প নতুন করে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। যে শিল্পের ওপর বাংলাদেশের রপ্তানি অর্থনীতি এতটা নির্ভরশীল, সেই শিল্পের ভিত কি ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে?
শ্রমিক অসন্তোষে উৎপাদন ব্যাহত, বাড়ছে উদ্বেগ মজুরি ও অন্যান্য দাবিতে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন নতুন করে শিল্প খাতে অস্থিরতা তৈরি করেছে। শ্রমিকদের আন্দোলন চতুর্থ দিনে গড়ানোর সময় কয়েক শ কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
পোশাকশ্রমিকদের অসন্তোষকে শুধু আইনশৃঙ্খলা বা শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি নয়—এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয়, প্রকৃত মজুরি, কর্মপরিবেশ এবং শিল্পের মুনাফা বণ্টনের প্রশ্ন।
একদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ছে, অন্যদিকে আয় সেই অনুপাতে বাড়ছে না। ফলে নির্ধারিত মজুরি দিয়েও অনেক শ্রমিকের পক্ষে পরিবার চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে। শ্রমিকদের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে তাই বিশাল ব্যবধান তৈরি হয়েছে। কিন্তু একথা ঠিক যে, শ্রমিক অসন্তোষের কারণে উৎপাদন বন্ধ থাকলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হন শ্রমিক, মালিক এবং দেশের অর্থনীতি।
রপ্তানি বাড়লেও অর্থনীতিতে স্বস্তি নেই কেন? চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ এবং প্রবাসী আয় ১৩ শতাংশ বেড়েছে। কিন্তু একই সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি সেপ্টেম্বরে নেমে এসেছে ৪.১৭ শতাংশে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পরিস্থিতি বেসরকারি বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমের দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। রপ্তানি আয় বাড়লেও নতুন কারখানা, নতুন বিনিয়োগ এবং নতুন কর্মসংস্থান কেন প্রত্যাশিত মাত্রায় তৈরি হচ্ছে না?
এর পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। ব্যবসায়ীদের জন্য ঋণের ব্যয়, জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং নীতিগত অনিশ্চয়তা বিনিয়োগ সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে। বিশেষ করে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির তুলনায় কম থাকলে বাস্তব অর্থে ঋণের প্রবাহ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এতে নতুন শিল্প স্থাপন, উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান তৈরির উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
পোশাকশিল্পের ওপর অতিনির্ভরতা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ? বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশ আসে তৈরি পোশাকশিল্প থেকে। এই নির্ভরতা একদিকে দেশের জন্য বড় অর্থনৈতিক শক্তি তৈরি করেছে, অন্যদিকে ঝুঁকিও বাড়িয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা কমে গেলে, বড় ক্রেতারা অর্ডার সরিয়ে নিলে বা প্রতিযোগী দেশগুলো কম খরচে পণ্য সরবরাহ করতে পারলে বাংলাদেশের রপ্তানি খাত চাপে পড়তে পারে।
এখন আন্তর্জাতিক বাজারে শুধু কম দামে পোশাক উৎপাদন করাই যথেষ্ট নয়। ক্রেতারা পণ্যের মান, শ্রমিকের অধিকার, পরিবেশগত মানদণ্ড, কার্বন নিঃসরণ এবং উৎপাদন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতার বিষয়েও গুরুত্ব দিচ্ছে।
এ কারণে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পকে শুধু উৎপাদনের পরিমাণ বাড়ানোর চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। উচ্চমূল্যের পোশাক, প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন, দক্ষ শ্রমশক্তি এবং নতুন বাজার তৈরিতে বিনিয়োগ জরুরি।
এ প্রসঙ্গে সিপিডির সাম্প্রতিক আলোচনায়ও রপ্তানি বহুমুখীকরণ, উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদন এবং আন্তর্জাতিক বাজারের নতুন শর্ত পূরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সবচেয়ে বড় সংকট: কর্মসংস্থান বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে এখন অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ কর্মসংস্থান তৈরি করা। বিশেষ করে তরুণ ও শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর জন্য মানসম্মত কাজের সুযোগ তৈরি না হলে জনসংখ্যাগত সুবিধা অর্থনৈতিক বোঝায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের ৩ নভেম্বর প্রকাশিত 'Demographic Change in South Asia: From Tailwinds to Headwinds for Development' শীর্ষক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অনুপাত ২০৪সের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর পূর্বাভাস রয়েছে। অন্যদিকে, দেশের মোট কর্মশক্তির প্রায় ৮৪ শতাংশ বা আনুমানিক ৫ কোটি ৮০ লাখ মানুষ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন।
বিশ্বব্যাংকের আশঙ্কা, কর্মসংস্থান তৈরির ধীরগতি, নারীদের শ্রমবাজারে কম অংশগ্রহণ এবং দক্ষতার ঘাটতি বাংলাদেশের জনসংখ্যাগত সুবিধাকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে রূপান্তরের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ২০৫১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ একটি বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সমাজে পরিণত হওয়ার পূর্বাভাসও দেওয়া হয়েছে।
এলডিসি উত্তরণে বাড়তি সময় কি কাজে লাগাতে পারবে বাংলাদেশ? বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ স্বল্পোন্নত দেশ বা এলডিসি থেকে উত্তরণ। উত্তরণের সময়সীমা আরও তিন বছর বাড়ানোর সুযোগকে অর্থনৈতিক সংস্কারের জন্য ব্যবহার করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা।
সিপিডির বিশিষ্ট ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য সম্প্রতি বলেছেন, এই বাড়তি সময়কে শুধু বিদ্যমান বাণিজ্যসুবিধা ধরে রাখার সুযোগ হিসেবে দেখলে চলবে না। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আয় বৃদ্ধি, ব্যাংক খাতের সংস্কার এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
একই আলোচনায় তিনি দেশের কর-জিডিপি অনুপাত ৬.৯ শতাংশ এবং ব্যাংক খাতের খেলাপি ও অনাদায়ি ঋণের হার প্রায় ৩৩ শতাংশ বলে উল্লেখ করেন। এমন পরিস্থিতিতে পোশাকশিল্পের সংকট মোকাবিলায় তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারও জরুরি।
পোশাক শিল্পের সংকটের সমাধান কি হবে না? পোশাকশিল্পকে স্থিতিশীল রাখতে প্রথমেই শ্রমিক ও মালিকপক্ষের মধ্যে কার্যকর আলোচনার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি, মজুরি এবং কর্মপরিবেশের বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কারখানার উৎপাদন ও ব্যবসায়িক ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, শিল্প খাতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। উৎপাদন ব্যয় বাড়তে থাকলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হবে।
তৃতীয়ত, ব্যাংক খাতের সংস্কার ও সহজ শর্তে উৎপাদনমুখী ঋণের সুযোগ বাড়াতে হবে। তবে ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা এবং অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করাও জরুরি।
চতুর্থত, তৈরি পোশাকের বাইরে চামড়া, ওষুধ, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হালকা প্রকৌশল ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতেও রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এতে একটি নির্দিষ্ট শিল্পের ওপর অর্থনীতির অতিনির্ভরতা কমবে।
শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। শুধু সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করা সম্ভব হবে না।
বাংলাদেশের পোশাকশিল্প এখন এমন এক সময় পার করছে, যখন সামান্য অস্থিরতাও বড় অর্থনৈতিক প্রভাব ফেলতে পারে। রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ের ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি অর্থনীতির জন্য আশাব্যঞ্জক হলেও বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং শিল্প উৎপাদনের দুর্বলতা দেখা যাচ্ছে।
তাই শ্রমিক অসন্তোষকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে বিবেচনা না করে শিল্পের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা, শ্রমিকের জীবনমান এবং অর্থনৈতিক নীতির সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে।
Comments