বরখাস্ত হওয়া ম্যানেজার গ্রাহকের কোটি টাকা আত্মসাৎ
নীলফামারী জেলার কিশোরগঞ্জ সোনালী ব্যাংক শাখার অর্ধশত গ্রাহকের প্রায় ১ কোটি টাকা কৌশলে আত্মসাৎ করে গা ঢাকা দিয়েছেন নৈশ প্রহরী ফিরোজ মিয়া। ঘটনার সাথে জড়িত সন্দেহে নাম উঠে এসেছে ব্যাংকটি থেকে সাময়িক বরখাস্ত হওয়া সাবেক শাখা ম্যানেজার শরীফ হাসান মুরাদের।
তিনি সম্প্রতি নানা অনিয়মের দায়ে সাময়িক বরখাস্ত হয়ে কুড়িগ্রাম সোনালী ব্যাংকের ডিজিএম কার্যালয়ে সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার (এসপিও) হিসেবে যোগদান করেন। মূলত তিনি বদলি হওয়ার পরপরেই নৈশপ্রহরী ফিরোজ মিয়া বেকায়দায় পড়ে গত ২০ জুলাই থেকে পলাতক রয়েছেন। এ ঘটনায় সোনালী ব্যাংকের বর্তমান শাখা ব্যবস্থাপক পংকজ কান্তি রায় বাদী হয়ে কিশোরগঞ্জ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। যার জিডি নং-১৪৯১।
দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ততাকে কাজে লাগিয়ে সাধারণ গ্রাহকদের মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিয়ে বিলাসবহুল বাড়ি নির্মাণ ও পলাতক থাকায় স্থানীয় ব্যাংক পাড়া ও ভুক্তভোগী গ্রাহকদের মাঝে এ ঘটনায় চরম আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে।
গ্রাহকদের অভিযোগ ও অনুসন্ধানে জানা গেছে, কিশোরগঞ্জ সদর ইউনিয়নের ইসমাইল গ্রামের কছির উদ্দিনের ছেলে ফিরোজ মিয়া গত ১৫-২০ বছর ধরে ওই ব্যাংকে নৈশপ্রহরী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পদে নৈশপ্রহরী হলেও ব্যাংকের কিছু অসাধু কর্মকর্তার প্রশ্রয়ে তিনি নিয়মিত গ্রাহকদের নতুন অ্যাকাউন্ট খোলা, ঋণের ফাইল প্রস্তুত করা এবং টাকা জমা-উত্তোলনের কাজ করতেন।
দীর্ঘদিন এসব কাজ করার ফলে তিনি সাধারণ ও সহজসরল গ্রাহকদের কাছে ব্যাংকের অন্যতম প্রধান 'আস্থার প্রতীক' হিসেবে পরিচিতি পান। গ্রাহকরাও সময় বাঁচাতে ও জটিলতা এড়াতে ফিরোজের মাধ্যমেই ব্যাংকের লেনদেন সম্পন্ন করতেন।
গ্রাহক ছাদিকুল মিয়া অভিযোগ করে বলেন, ঋণের বিষয়ে আগে ফিরোজের সঙ্গেই কথা বলতে হতো। সে যাদের পক্ষে সুপারিশ করত, ব্যাংক থেকে তাদের ঋণ দ্রুত ছাড় হতো। ফিরোজ শিক্ষক, ব্যবসায়ী, ঠিকাদার ও কৃষকসহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষকে ঋণ পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে ফাঁকা চেক, এনআইডির ফটোকপি, অলিখিত স্ট্যাম্প ও ছবি জমা রাখত। পরে বড় অঙ্কের ঋণ পাস করিয়ে গ্রাহকদের হাতে নামমাত্র টাকা বুঝিয়ে দিত।
তিনি আরও বলেন, কয়েক বছর পর ব্যাংকের নোটিশ পেয়ে ঋণের আসল পরিমাণ দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়তেন গ্রাহকরা। পরে বাধ্য হয়ে ঘরবাড়ি ও জমিজমা বিক্রি করে ব্যাংকের দায় শোধ করতে হতো তাদের। এ ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত হলে ব্যাংকের অসাধু কর্মকর্তাদের জড়িত থাকার বিষয়ও বেরিয়ে আসবে বলে দাবি করেন তিনি।
অন্য এক ভুক্তভোগী তহুরা বেগম জানান, তার ডিপিএসের মেয়াদ শেষে টাকা তুলতে গেলে ফিরোজ তাকে চেকে স্বাক্ষর নিয়ে কয়েকদিন পর আসতে বলেন। পরে ব্যাংকে গিয়ে তিনি দেখতে পান তার অ্যাকাউন্টে কোনো টাকা নেই। ব্যাংকের ব্যবস্থাপককে বিষয়টি জানালে তিনি টাকার দায়িত্ব নেন, তবে বিষয়টি গোপন রাখার জন্য তাগিদ দেওয়া হয়।
এছাড়া আরজিনা বেগম নামে এক মাদরাসা শিক্ষিকা জানান, তার বেতন অ্যাকাউন্টের ২৮ হাজার টাকা ফিরোজ নিজের কৌশলে তুলে নিয়েছেন। তার মোবাইলে যাতে ক্ষুদে বার্তা না পাঠানো হয় সেজন্য ম্যাসেজ অপশন বন্ধ রেখে প্রদত্ত চেক দিয়ে বেশি অর্থ উত্তোলন করেন।
ভুক্তভোগী কলেজ শিক্ষক রবিউল ইসলাম জানান, আমি তাকে ব্যাংকে জমা দেওয়ার জন্য ৭০ হাজার টাকা দেই। সে আমাকে টাকা জমার সিল-স্বাক্ষরিত ভুয়া রশিদ দেন। যেটি আমি পরবর্তীতে বুঝতে পারি। আমার মোবাইলের ম্যাসেজ অপশন ব্যাংক থেকে বন্ধ করা ছিল।
মশিউর রহমান ও রাসেল নামে দুজন গ্রাহক অভিযোগ করে বলেন, এ ঘটনায় ব্যাংকের তৎকালীন ম্যানেজার শরীফ হাসান মুরাদসহ কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা সরাসরি জড়িত বলে আমরা মনে করি, অন্যথায় একজন নৈশ প্রহরীর পক্ষে এমন কাজ একাই করা অসম্ভব।
তারা আরো বলেন, ব্যাংকের নৈশ প্রহরী ফিরোজ মিয়া ও তৎকালীন শাখা ব্যবস্থাপক শরীফ হাসান মুরাদ বর্তমানে বিপুল সম্পদের মালিক। তাদের আয় ও সম্পদের মধ্যে অসামঞ্জস্য রয়েছে। আমরা এসবের সত্যতা যাচাইয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানাই।
এ বিষয় কথা হলে, অভিযুক্ত নৈশপ্রহরী ফিরোজের বাবা কছির উদ্দিন ছেলের প্রতারণার কথা এক পর্যায়ে স্বীকার করে বলেন, গাড়াগ্রামের তহুরা বেগমসহ কয়েকজনের ১৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যাংক ম্যানেজার পংকজ কান্তি রায়ের মাধ্যমে ফেরত দেওয়া হয়েছে। এত টাকা নিয়ে ছেলে কোথায় গেছে, তা আমার জানা নেই।
তবে অভিযুক্ত ফিরোজ মিয়ার দুলাভাই সফিকুল ইসলাম এবিষয়ে তথ্য চাইতে গেলে সাংবাদিকদের সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন এবং অভিযোগকারী গ্রাহকদের উল্টো দেখে নেওয়ার হুমকি দেন। এসময় তিনি নিজেকে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের কর্মী বলে দাবি করেন। এদিকে সাবেক শাখা ব্যবস্থাপক শরীফ হাসান মুরাদের মুঠোফোনে একাধিকবার কল দিয়েও কোন সংযোগ পাওয়া যায়নি।
কিশোরগঞ্জ শাখা ব্যবস্থাপক পংকজ কান্তি রায় বলেন, ব্যাংকের ভাবমূর্তি রক্ষায় এ মুহূর্তে নির্দিষ্ট পরিমাণ ও গ্রাহকের সংখ্যা সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য দেওয়া সম্ভব নয়। তবে গত ২০ জুলাই থেকে ফিরোজ অফিসে অনুপস্থিত। তার পরিবার জানায়, সে জরুরি কাজে ঢাকায় গেছে। তাকে ফোনে না পেয়ে বাড়িতে নোটিশ পাঠানো হয়। এর পরপরই ১৫-২০ জন গ্রাহক ব্যাংকে এসে অ্যাকাউন্টে টাকা না থাকার কথা জানান। বর্তমানে এ ঘটনায় বিভাগীয় তদন্ত চলছে।
কিশোরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল গফুর মিয়া জানান, সোনালী ব্যাংকের নৈশপ্রহরীর খোঁজ পেতে শাখা ব্যবস্থাপক বাদী হয়ে একটি মিসিং ডায়েরি করেছেন। বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে।
Comments