এত ফেল কেন?
২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। ১১টি শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার নেমে এসেছে ৫২.১২ শতাংশে। অর্থাৎ পরীক্ষায় অংশ নেওয়া প্রতি ১০০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় ৪৮ জনই পাস করতে পারেননি। জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও গত বছরের প্রথম প্রকাশিত ফলের তুলনায় প্রায় ৪২ শতাংশ কমেছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, দেশের ২৯৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেননি। প্রশ্ন উঠেছে, এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী কেন ফেল করছে? এর দায় কি শুধু শিক্ষার্থীদের, নাকি শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরেও বড় ধরনের ব্যর্থতা রয়েছে?
গত কয়েক বছরের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে অবনতির চিত্র আরও স্পষ্ট হয়। ২০২৩ সালে পাসের হার ছিল ৭৮.৬৪ শতাংশ, ২০২৪ সালে ৭৭.৭৮ শতাংশ এবং ২০২৫ সালে তা কমে ৫৮.৮৩ শতাংশে দাঁড়ায়। ২০২৬ সালে এই হার আরও কমে ৫২.১২ শতাংশ হয়েছে। অর্থাৎ দুই বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ২৫ শতাংশেরও বেশি। এই ধারাবাহিক পতনকে শুধু শিক্ষার্থীদের মেধা বা প্রস্তুতির ঘাটতি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। বরং শিক্ষার মান, পাঠদান পদ্ধতি, মূল্যায়নব্যবস্থা এবং শিক্ষা প্রশাসনের কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।
শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতার অন্যতম কারণ হতে পারে শ্রেণিকক্ষের দুর্বল পাঠদান। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত ক্লাস না হওয়া, বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষকের অভাব, পাঠ্যসূচি যথাসময়ে শেষ না করা এবং দুর্বল শিক্ষার্থীদের প্রতি পর্যাপ্ত নজর না দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জন করতে পারে না। পরে পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য তাদের প্রাইভেট টিউশন ও কোচিংয়ের ওপর নির্ভর করতে হয়। এতে শিক্ষার সুযোগ পরিবারের আর্থিক সামর্থ্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। সচ্ছল পরিবারের শিক্ষার্থীরা বাড়তি সহায়তা পেলেও নিম্ন আয়ের পরিবারের শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে যায়।
এক গবেষণায় দেখা গেছে, মাধ্যমিক পর্যায়ের ৭৬.৬ শতাংশ শিক্ষার্থী ব্যক্তিগত শিক্ষকের সহায়তা নেয় এবং ৯৩ শতাংশ শিক্ষার্থী বাণিজ্যিক গাইডবই ব্যবহার করে। এই পরিসংখ্যানই প্রশ্ন তোলে, শিক্ষার্থীরা যদি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যথাযথ শিক্ষা পায়, তাহলে তাদের এত বেশি অর্থ ব্যয় করে বাইরে পড়তে হচ্ছে কেন? শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য বন্ধে নীতিমালা থাকলেও এর কার্যকর প্রয়োগ ও তদারকি কতটা হচ্ছে, সেটিও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা। একটি প্রতিষ্ঠানের সব শিক্ষার্থী ফেল করলে সেটিকে শুধু শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতা বলা যায় না। সেখানে শিক্ষকরা নিয়মিত ক্লাস নিয়েছেন কি না, শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা শনাক্ত করেছেন কি না, প্রতিষ্ঠানপ্রধান যথাযথ দায়িত্ব পালন করেছেন কি না এবং শিক্ষা বোর্ড নিয়মিত তদারকি করেছে কি না, তা তদন্ত করা জরুরি। একইভাবে শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মানও যাচাই করা প্রয়োজন।
অঞ্চলভেদে ফলাফলের পার্থক্যও উদ্বেগজনক। ঢাকা বোর্ডে পাসের হার ৬১.৮০ শতাংশ হলেও বরিশাল বোর্ডে তা মাত্র ৪৪.৮৪ শতাংশ। শিক্ষকসংকট, দুর্বল অবকাঠামো, আর্থিক অসচ্ছলতা এবং মানসম্মত শিক্ষার অসম সুযোগ এই ব্যবধানের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি ২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতায় পরীক্ষা ব্যাহত হওয়া এবং মূল্যায়ন পদ্ধতির পরিবর্তনও ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে। তবে এসব কারণের প্রকৃত প্রভাব জানতে তথ্যভিত্তিক গবেষণা প্রয়োজন।
শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতার পেছনে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের দুর্বল ভিত্তিও গুরুত্বপূর্ণ। প্রাথমিক পর্যায়ে ভাষা ও গণিতের মৌলিক দক্ষতা তৈরি না হলে উচ্চমাধ্যমিকে জটিল বিষয় বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। অর্থাৎ শিক্ষার্থীরা এইচএসসিতে এসে হঠাৎ দুর্বল হয়ে পড়ছে না; তাদের দীর্ঘ শিক্ষাজীবনের ঘাটতিগুলো সময়মতো সমাধান করা হয়নি।
তাই এখন প্রয়োজন একটি স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাব্যবস্থা পর্যালোচনা। কোন বিষয়ে কত শিক্ষার্থী ফেল করেছে, কোন প্রতিষ্ঠানে শূন্য পাসের কারণ কী, কোথায় শিক্ষকসংকট রয়েছে এবং মূল্যায়ন পদ্ধতিতে কী ধরনের দুর্বলতা আছে, তা প্রকাশ করতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, নিয়মিত পাঠদান, কোচিংনির্ভরতা কমানো এবং শিক্ষা প্রশাসনের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
সবশেষে মনে রাখতে হবে, শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতা মানেই শুধু তাদের অযোগ্যতা নয়। একটি শিক্ষার্থী বছরের পর বছর যে প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করে, সেই প্রতিষ্ঠানেরও তার শেখার দায়িত্ব রয়েছে। তাই প্রশ্ন শুধু কতজন ফেল করেছে, তা নয়; বরং কেন তারা ফেল করেছে এবং এই ব্যর্থতা ঠেকাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী করেছে। শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতার হিসাব নেওয়ার পাশাপাশি শিক্ষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষা বোর্ড ও নীতিনির্ধারকদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না গেলে শিক্ষাব্যবস্থার এই সংকট কাটানো সম্ভব হবে না।
Comments