উন্নত জীবনের প্রলোভনে রুশ যুদ্ধে বাংলাদেশিরা,রাষ্ট্রীয় নজরদারিতে ব্যর্থতা
উন্নত জীবনের স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমিয়ে যুদ্ধের সম্মুখভাগে ঠাঁই হচ্ছে বাংলাদেশি তরুণদের-এমন বাস্তবতা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ২৯টি দেশের নাগরিকদের প্রতারণা ও চাপের মুখে রুশ সেনাবাহিনীতে নিয়োগের তথ্য উঠে আসায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। প্রশ্ন উঠেছে, কর্মসংস্থানের আশায় বিদেশে যাওয়া এসব মানুষ কীভাবে যুদ্ধের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতিতে জড়িয়ে পড়ছেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কেন আগেই তা শনাক্ত করতে পারল না।
অধিক আয়ের প্রলোভন, উন্নত জীবনের আকাঙ্ক্ষা এবং দেশে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের অভাব—এসব কারণকে কাজে লাগিয়ে অসাধু চক্র সাধারণ মানুষকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলছে। অনেকে সর্বস্ব বিক্রি করে কিংবা ঋণ নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমান ভাগ্য পরিবর্তনের আশায়। অথচ কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থানের পরিবর্তে তাঁদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হচ্ছে। এমনকি প্রতিপক্ষের ড্রোন ও গোলন্দাজ বাহিনীর অবস্থান শনাক্ত করতে তাঁদের মানবঢাল বা 'টোপ' হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগও পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে।
এ ঘটনা শুধু মানবপাচার ও প্রতারণার সমস্যা নয়; এটি বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান ব্যবস্থাপনা, অভিবাসন তদারকি এবং কূটনৈতিক উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে। বিদেশে কর্মসংস্থানের নামে কী ধরনের চুক্তি, ভিসা ও নিয়োগপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নাগরিকেরা যাচ্ছেন, তা যাচাই করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। যুদ্ধকবলিত অঞ্চলে কর্মসংস্থানের প্রলোভন দেখিয়ে মানুষকে পাঠানো হলে তা শনাক্ত করতে কার্যকর নজরদারি থাকা জরুরি। কোথায় ঘাটতি ছিল, কারা এই নিয়োগপ্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত এবং কীভাবে এমন ঘটনা প্রতিরোধ করা যেত-এসব বিষয়ে স্বচ্ছ তদন্ত প্রয়োজন।
এ মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো, মস্কোর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এবং যুদ্ধক্ষেত্রে আটকে থাকা বাংলাদেশিদের নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনা। এ জন্য রাশিয়ার সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে প্রতারণার মাধ্যমে বিদেশে নিয়োগের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। শুধু ঘটনার পর উদ্ধার তৎপরতা চালালেই দায়িত্ব শেষ হবে না; ভবিষ্যতে যাতে আর কোনো বাংলাদেশি এমন বিপদের মুখে না পড়েন, সে ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।
দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে কর্মসংস্থান বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করলেও তাঁদের জীবন ও নিরাপত্তাকে উপেক্ষা করে এই অর্জন টেকসই হতে পারে না। নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করা, নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনা এবং মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো,দেশের তরুণদের জন্য পর্যাপ্ত ও সম্মানজনক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা। দেশে কাজের অভাব মানুষকে যখন অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ বিদেশযাত্রায় বাধ্য করে, তখন শুধু ব্যক্তিগত সচেতনতার কথা বলে রাষ্ট্রের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। বিদেশে কর্মসংস্থানের স্বপ্ন যেন মৃত্যুফাঁদে পরিণত না হয়, তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। এখন প্রয়োজন দ্রুত উদ্ধার, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। কারণ, প্রতিটি প্রবাসী শ্রমিকের জীবন ও নিরাপত্তা যেকোনো অর্থনৈতিক অর্জনের চেয়ে বেশি মূল্যবান।
Comments