এডিপি বাস্তবায়নে দুরবস্থা,অর্থবছরের শুরুতেই বড় ধাক্কা: উন্নয়ন কোথায়?
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে যে ধাক্কা লেগেছিল,তা কাটিয়ে ওঠার প্রত্যাশা থাকলেও উন্নয়ন বাস্তবায়নের চিত্র এখনো উদ্বেগজনক। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে, অর্থাৎ জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপি বাস্তবায়নের হার মাত্র ৩.৮৯ শতাংশ। ব্যয় হয়েছে ১২ হাজার ১৭ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের ইতিহাসে তিন মাসের হিসাবে এডিপি বাস্তবায়নের এত কম হার আগে দেখা যায়নি।
প্রকল্প অনুমোদন,দরপত্র,জমি অধিগ্রহণ ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে বিলম্ব হচ্ছে কি না,তা খতিয়ে দেখা জরুরি। মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর প্রকল্প ব্যবস্থাপনা এবং বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিবর্তনের পর সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধীরগতি তৈরি হলে তার প্রভাব উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে পড়তে পারে। প্রশ্ন হলো - হাজার হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন বরাদ্দ থাকার পরও প্রকল্পের কাজ এগোচ্ছে না কেন? কোথায় আটকে আছে সিদ্ধান্ত,আর কোথায় ব্যর্থ হচ্ছে বাস্তবায়ন?
উন্নয়ন ব্যয় কমলে অর্থনীতিতে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। সরকারি উন্নয়ন ব্যয় কমে গেলে সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র, হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নির্মাণ পিছিয়ে যায়।
সরকারি প্রকল্পে কাজ কম হলে ঠিকাদার,নির্মাণশ্রমিক,পরিবহনকর্মী ও সরবরাহকারীদের আয় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। নির্মাণসামগ্রী,যন্ত্রপাতি ও বিভিন্ন সেবার চাহিদাও কমে যেতে পারে। ফলে অর্থনীতিতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
সরকারের উন্নযন ব্যয় কমলে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ খাতের ওপর প্রভাব পড়ে -
যোগাযোগ: সড়ক ও সেতুর কাজ পিছিয়ে গেলে পণ্য পরিবহনে সময় ও ব্যয় বাড়তে পারে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি: প্রয়োজনীয় অবকাঠামো সময়মতো তৈরি না হলে সরবরাহ সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
স্বাস্থ্য: হাসপাতাল,চিকিৎসাকেন্দ্র ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নির্মাণে দেরি হলে মানুষকে কাঙ্ক্ষিত সেবা পেতে অপেক্ষা করতে হয়।
শিক্ষা: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা অবকাঠামোর উন্নয়ন পিছিয়ে গেলে শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
পানিসম্পদ: পানি ব্যবস্থাপনা,সেচ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণের প্রকল্প বিলম্বিত হলে কৃষি ও জনজীবনে ঝুঁকি বাড়তে পারে।
অব্যয়িত বরাদ্দের আড়ালে লুকানো অর্থনৈতিক ক্ষতি অনেক। উন্নয়ন বরাদ্দ ব্যয় না হলে পরিকল্পিত অবকাঠামো ও সেবা নির্ধারিত সময়ে পাওয়া যায় না। প্রকল্পের মাধ্যমে যে কর্মসংস্থান ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম তৈরি হওয়ার কথা,তা পিছিয়ে যায়। সরকারের ব্যয় কম থাকায় অর্থনীতিতে প্রত্যাশিত চাহিদা ও বিনিয়োগের প্রভাবও তৈরি হয় না। অর্থাৎ বাজেটে অর্থ বরাদ্দ দেখালেও বাস্তবে তার সুফল জনগণের কাছে পৌঁছায় না।
সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থায়নে দেশীয় ও বিদেশি ঋণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রকল্প বাস্তবায়ন পিছিয়ে গেলে ঋণনির্ভর অর্থায়নের সুফল পেতে দেরি হয়,অথচ ঋণ পরিশোধের দায় থেকেই যায়। নির্মাণসামগ্রীর দাম, শ্রমের ব্যয় কিংবা অন্যান্য খরচ বেড়ে গেলে প্রকল্পের মোট ব্যয়ও বাড়তে পারে। ফলে একই প্রকল্প শেষ করতে ভবিষ্যতে আরও বেশি অর্থের প্রয়োজন হতে পারে।
এডিপি বাস্তবায়নের হার ৩.৮৯ শতাংশে আটকে থাকা উন্নয়ন ব্যবস্থাপনার জন্য একটি গুরুতর সতর্কসংকেত। অর্থবছরের প্রথম তিন মাসের চিত্র পুরো বছরের ফলাফল নিশ্চিত করে না। তবে শুরুতেই এমন ধীরগতি থাকলে পরবর্তী সময়ে বাস্তবায়নের চাপ বাড়তে পারে। তাই সরকারের সামনে এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বাড়ানো,অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং জনগণের কাছে উন্নয়নের সুফল পৌঁছে দেওয়া। শুধু কত টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, সেই হিসাব নয়-কতটা কাজ হয়েছে,কত মানুষের উপকার হয়েছে এবং কতটা অর্থনৈতিক সুফল তৈরি হয়েছে,তারও হিসাব দিতে হবে।
উন্নয়নের নামে হাজার হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করলেই জনগণের ভাগ্য বদলায় না। বদলায় তখনই,যখন সেই অর্থে রাস্তা তৈরি হয়,হাসপাতাল সেবা দেয়,শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন হয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় এবং অর্থনীতি গতি পায়। তিন মাসে এডিপি বাস্তবায়ন যদি ৪ শতাংশেরও নিচে থাকে,তাহলে প্রশ্ন উঠবেই-সমস্যা কোথায়,দায় কার,আর এই ব্যর্থতার মূল্য দিচ্ছে কে?
Comments