মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম আমানতের সুদ,প্রকৃত মূল্য হারাচ্ছে সঞ্চয়
দেশে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ঘরে থাকলেও কয়েকটি ব্যাংকে এক বছর মেয়াদি স্থায়ী আমানতের সুদহার কমে প্রায় সাড়ে ৭ শতাংশে নেমে এসেছে। ফলে ব্যাংকে টাকা জমা রেখে সুদ পেলেও মূল্যস্ফীতির প্রভাবে সঞ্চয়ের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমছে। অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণে, দীর্ঘ সময় ধরে আমানতের সুদহার মূল্যস্ফীতির নিচে থাকলে তা সঞ্চয়কারীদের আর্থিক সিদ্ধান্ত, ব্যাংকের আমানত সংগ্রহ এবং সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিবেশে প্রভাব ফেলতে পারে।
অর্থনীতির পরিভাষায়, নামমাত্র সুদহার থেকে মূল্যস্ফীতির হার বাদ দিলে প্রকৃত সুদহারের একটি আনুমানিক ধারণা পাওয়া যায়। সে হিসাবে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশ এবং আমানতের সুদহার ৭ দশমিক ৫ শতাংশ হলে প্রকৃত সুদহার দাঁড়ায় প্রায় ঋণাত্মক ১ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থাৎ,সুদ থেকে অর্জিত আয়ের তুলনায় পণ্য ও সেবার দাম বেশি বাড়লে আমানতকারীর অর্থের প্রকৃত মূল্য কমে যায়। কর ও অন্যান্য প্রযোজ্য খরচ বিবেচনায় নিলে প্রকৃত রিটার্ন আরও কম হতে পারে।
সঞ্চয়কারীদের জন্য এই পরিস্থিতি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ,অনেক মানুষ ভবিষ্যৎ চিকিৎসা, শিক্ষা,অবসরকালীন ব্যয় কিংবা জরুরি প্রয়োজন মেটাতে ব্যাংকে অর্থ জমা রাখেন। তাঁদের কাছে মূলধনের নিরাপত্তার পাশাপাশি সঞ্চয়ের ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমানতের সুদ মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মেলাতে না পারলে দীর্ঘমেয়াদে একই পরিমাণ অর্থ দিয়ে আগের মতো পণ্য ও সেবা কেনা সম্ভব হয় না। এতে নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ ও অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা তুলনামূলক বেশি চাপে পড়তে পারেন।
অন্যদিকে, ব্যাংকে আমানত রাখার আর্থিক সুবিধা কমে গেলে কিছু সঞ্চয়কারী বিকল্প বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকতে পারেন। কেউ নগদ অর্থ হাতে রাখতে পারেন,আবার কেউ সোনা,জমি বা অন্যান্য সম্পদে অর্থ বিনিয়োগ করতে পারেন। তবে এ ধরনের সিদ্ধান্তের সঙ্গে ঝুঁকি,তারল্য এবং লেনদেনের খরচ জড়িত। বিশেষ করে অনানুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থায় অর্থ প্রবাহ বাড়লে লেনদেনের স্বচ্ছতা,কর ব্যবস্থাপনা এবং অর্থপাচার প্রতিরোধের কার্যক্রম জটিল হতে পারে।
ব্যাংকের আমানত সংগ্রহ দুর্বল হয়ে পড়লে ঋণ বিতরণ ও উৎপাদনশীল খাতে অর্থায়নের ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে। ব্যাংক সাধারণত আমানতসহ বিভিন্ন উৎস থেকে সংগৃহীত অর্থ ঋণ ও বিনিয়োগে ব্যবহার করে। আমানত কমে গেলে ব্যাংককে বিকল্প তহবিলের ওপর নির্ভর করতে হতে পারে,যার ব্যয় বেশি হলে ঋণের সুদহারেও চাপ পড়তে পারে। এর প্রভাব ব্যবসা সম্প্রসারণ,নতুন শিল্প স্থাপন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর পড়ার আশঙ্কা থাকে।
তবে আমানতের সুদহার মূল্যস্ফীতির নিচে থাকলেই ব্যাংকিং খাতে ঋণসংকট তৈরি হবে,এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতি,বিকল্প তহবিলের প্রাপ্যতা, ঋণের চাহিদা, আমানতকারীদের আচরণ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতি-সবকিছুই এখানে গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে সুদহার বাড়ানো হলে ব্যাংকের তহবিল সংগ্রহের ব্যয় বাড়তে পারে,যা ঋণগ্রহীতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা এবং ব্যাংকিং খাতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সমন্বিত নীতিগত উদ্যোগ প্রয়োজন। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ,আমানতের সুদহার নির্ধারণে বাজার পরিস্থিতি বিবেচনা,ব্যাংকগুলোর সুশাসন নিশ্চিত করা এবং আমানতের নিরাপত্তা সম্পর্কে স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি ব্যাংকিং সেবার মান উন্নয়ন ও গ্রাহকদের অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলাও জরুরি।
সামগ্রিকভাবে,আমানতের সুদহার ও মূল্যস্ফীতির ব্যবধান কেবল সঞ্চয়কারীদের লাভ-ক্ষতির হিসাব নয়;এটি ব্যাংকের প্রতি আস্থা,আর্থিক মধ্যস্থতা এবং ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের সঙ্গেও সম্পর্কিত। তাই সরকার,বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর লক্ষ্য হওয়া উচিত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সঞ্চয়ের প্রকৃত মূল্য রক্ষায় সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা। এতে আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আমানত ধরে রাখা এবং সেই অর্থ উৎপাদনশীল বিনিয়োগে কাজে লাগানোর সুযোগ বাড়বে।
Comments