বিক্ষোভ ঘিরে উত্তাল ফ্রান্স, রাজপথে ৭০ হাজার পুলিশ মোতায়েন
ফ্রান্সজুড়ে নতুন করে বিক্ষোভ ও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েছে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সরকার। শনিবার (২৪ অক্টোবর) দেশটির বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ৭০ হাজার পুলিশ ও নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত সপ্তাহের বিক্ষোভে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকানোই এ পদক্ষেপের প্রধান লক্ষ্য।
আলজাজিরা ও রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেজ জানান, গত সপ্তাহের তুলনায় এবার প্রায় ১০ হাজার বেশি পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। নিরাপত্তা অভিযানে বিশেষায়িত পুলিশ ইউনিট, অশ্বারোহী বাহিনী, হেলিকপ্টার, ড্রোন, সাঁজোয়া যান ও জলকামান ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
বিক্ষোভের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁর শীর্ষ মন্ত্রী ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের কথা ছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও জোরদার করা এবং নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় আসে।
সহিংসতা ঠেকাতে কঠোর অবস্থান
ফরাসি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেজ অভিযোগ করেছেন, উগ্র-বামপন্থী কিছু গোষ্ঠী অনলাইনে সরকারি স্থাপনায় হামলা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির আহ্বান জানাচ্ছে। সহিংসতা, লুটপাট ও দাঙ্গায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সতর্ক করেন তিনি।
গত সপ্তাহের বিক্ষোভে কয়েকটি শহরে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার এবার আগেভাগেই অতিরিক্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
বড় শহরগুলোতে বিধিনিষেধ
নিরাপত্তাঝুঁকি বিবেচনায় ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে জনসমাগম ও বিক্ষোভের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। রাজধানী প্যারিসে নির্দিষ্ট পথে শ্রমিক সংগঠনগুলোর মিছিলের অনুমতি দেওয়া হলেও কয়েকটি সংগঠনের কর্মসূচি অনুমোদন পায়নি।
লিওঁসহ কয়েকটি শহরের কেন্দ্রীয় এলাকায় বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মার্সেইতে কঠোর শর্তে শ্রমিক ইউনিয়নের একটি মিছিলের অনুমতি দেওয়া হয়। কিছু এলাকায় কারফিউ এবং গণপরিবহন চলাচলেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
প্যারিসে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি স্থাপনা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। নিরাপত্তার কারণে ল্যুভরসহ কয়েকটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আর্ট বাসেল প্যারিস মেলার সাপ্তাহিক কর্মসূচিও বাতিল করা হয়েছে।
শিক্ষার্থী ও শ্রমিকদের ক্ষোভ
ফ্রান্সে সাম্প্রতিক বিক্ষোভের সূত্রপাত হয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত সমস্যা, শিক্ষকসংকট এবং শিক্ষা খাতে পর্যাপ্ত অর্থায়নের দাবিকে কেন্দ্র করে। পরে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, জনসেবা খাতে সংকট ও সরকারের নীতির বিরুদ্ধে অসন্তোষও আন্দোলনে যুক্ত হয়।
শিক্ষার্থী সংগঠন এবং 'ইয়েলো ভেস্ট' আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মীরা শনিবারও কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছেন। তবে কর্তৃপক্ষ কয়েকটি সমাবেশের অনুমতি না দেওয়ায় সরকারের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের বিরোধ আরও বেড়েছে।
শুক্রবার শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন ম্যাক্রোঁ। শিক্ষার্থী সংগঠনের প্রতিনিধিরা জানান, আলোচনায় তাদের বক্তব্য শোনা হলেও দাবির বাস্তবায়নে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের অপেক্ষায় রয়েছেন তারা।
বিক্ষোভের অধিকার নিয়ে বিতর্ক
সরকারের আরোপিত বিধিনিষেধের সমালোচনা করেছে বিভিন্ন শ্রমিক ও শিক্ষার্থী সংগঠন। তাদের মতে, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের সুযোগ সীমিত করা হলে নাগরিক স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে সরকারের কঠোর অবস্থান নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। অন্যদিকে, কর্তৃপক্ষের বক্তব্য হলো, সহিংসতা ও লুটপাট প্রতিরোধ এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এসব পদক্ষেপ প্রয়োজন।
এদিকে ফ্রান্সের অরলিয়ঁ শহরে ডানপন্থী দল ন্যাশনাল র্যালির সম্মেলনকে কেন্দ্র করে পাল্টা বিক্ষোভের আশঙ্কা রয়েছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের ধারণা, সেখানে ২০ হাজার থেকে ৩০ হাজার মানুষ সমবেত হতে পারেন। সম্ভাব্য সংঘর্ষ এড়াতে শহরের কেন্দ্রস্থলে জনসমাগম নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
গত সপ্তাহের সহিংসতার পর বহু মানুষকে আটক করেছে ফরাসি পুলিশ। তবে গ্রেপ্তারের মোট সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে ভিন্ন হিসাব রয়েছে।
সব মিলিয়ে, ফ্রান্সে চলমান পরিস্থিতি এখন নিরাপত্তা, নাগরিক স্বাধীনতা ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে বৃহত্তর বিতর্কে রূপ নিয়েছে। শনিবারের বিক্ষোভ কতটা শান্তিপূর্ণ থাকে, তার ওপর সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ অনেকটাই নির্ভর করবে।
Comments