৮০০ বছর ধরে পূজা হয় ঢাকার যেই মন্দিরে
ইতিহাস, ঐতিহ্য আর বিশ্বাসের এক অনন্য ঠিকানা ঢাকার ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির। প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী, প্রায় আটশো বছরের পুরোনো এই মন্দির ঘিরে রয়েছে নানা কাহিনি ও ধর্মীয় আবেগ। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভক্তরা ছুটে আসেন এখানে পূজা দিতে। ঢাকঢোলের বাদ্য, মন্ত্রোচ্চারণ আর ভক্তদের পদচারণায় প্রতিবছরের মতো এবারও দুর্গোৎসবে মুখর মন্দির প্রাঙ্গণ। প্রাচীন ঐতিহ্য আর ধর্মীয় বিশ্বাসের মেলবন্ধনে ঢাকেশ্বরী মন্দির হয়ে উঠেছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের এক বিশেষ তীর্থস্থান।
মন্দিরের প্রবেশপথ পেরিয়ে মূল প্রাঙ্গণে ঢুকতেই চোখে পড়ে দুর্গাপ্রতিমা। প্রায় এক ফুট উচ্চতার এই প্রতিমাকে ঘিরেই গড়ে উঠেছিল ঢাকেশ্বরী মন্দির—এমনটাই জানান মন্দিরসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের বর্ণনা অনুযায়ী, মন্দির প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই এখানে দুর্গাপূজার আয়োজন হয়ে আসছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সেই ধারাবাহিকতা বহন করছে এই প্রাচীন উপাসনালয়।
শুধু পূজা-অর্চনার স্থান নয়, ঢাকেশ্বরী মন্দিরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইতিহাস, সংস্কৃতি আর মানুষের আবেগ। সময়ের পরিবর্তনে বদলেছে ঢাকার নগরচিত্র, বেড়েছে জনসংখ্যা, গড়ে উঠেছে আধুনিক স্থাপনা। কিন্তু মন্দির প্রাঙ্গণে এলে যেন ছুঁয়ে দেখা যায় অতীতের এক দীর্ঘ অধ্যায়। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত ধর্মীয় বিশ্বাস আর ঐতিহ্যের টানেই এখানে ফিরে আসেন ভক্তরা।
দুর্গাপূজার সময় মন্দির প্রাঙ্গণ পায় ভিন্ন এক রূপ। ঢাকের শব্দ, শঙ্খধ্বনি, পূজার মন্ত্র আর ভক্তদের আনাগোনায় তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। কেউ আসেন মানত পূরণে, কেউ পরিবারের মঙ্গল কামনায়, আবার কারও কাছে এই মন্দিরে আসা শেকড়ের সঙ্গে সম্পর্ক নতুন করে অনুভব করার উপলক্ষ। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা ভক্তদের কাছে ঢাকেশ্বরী তাই কেবল একটি মন্দির নয়, বিশ্বাস ও আত্মিক প্রশান্তির ঠিকানা।
পূজায় আসা মানুষেরা বলছেন, 'এত পুরোনো একটি মন্দিরে এসে পূজা দিতে পারা আমাদের জন্য অনেক আনন্দের ও সৌভাগ্যের। এখানে এলে ধর্মের প্রতি আলাদা একটা টান অনুভব করি। তাই চেষ্টা করি প্রতিবছর পুরো পরিবার নিয়ে এখানে আসতে।'
প্রাচীন এই মন্দিরের ইতিহাস নিয়ে রয়েছে নানা বর্ণনা ও জনশ্রুতি। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, সেন আমলের রাজা বল্লাল সেনের নামও জড়িয়ে আছে ঢাকেশ্বরী মন্দির প্রতিষ্ঠার ইতিহাসের সঙ্গে। তবে মন্দিরের প্রতিষ্ঠাকাল ও ইতিহাসের বিভিন্ন দিক নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। সেই ইতিহাসের সূত্র ধরে ঢাকেশ্বরী আজ বাংলাদেশের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র।
আটশ বছরের ঐতিহ্যের দাবি, প্রাচীন প্রতিমা ঘিরে বিশ্বাস আর প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা দুর্গোৎসব—সব মিলিয়ে ঢাকেশ্বরী মন্দিরের আবেদন অনন্য। সময় বদলেছে, বদলেছে নগরজীবন; কিন্তু এই মন্দিরকে ঘিরে ভক্তদের আবেগ আর ঐতিহ্যের টান আজও অটুট। তাই দুর্গাপূজার আয়োজন ছাড়িয়ে ঢাকেশ্বরী মন্দির হয়ে উঠেছে ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় সম্প্রীতির এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক।
Comments