সাজেক ছাড়লেন হাজারো পর্যটক, বন্ধে ১০ দিনে ২০ কোটি টাকা ক্ষতির আশঙ্কা
রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র সাজেক ভ্যালিতে অবস্থানরত সব পর্যটক এলাকা ছেড়েছেন। সোমবার (১২ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ১০টা ও দুপুর আড়াইটায় দুই দফায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরাপত্তায় এক হাজার পর্যটক সাজেক থেকে খাগড়াছড়িতে পৌঁছেছেন। বর্তমানে সাজেক পর্যটনকেন্দ্রে কোনো পর্যটক নেই।
এদিকে, নিরাপত্তার কারণে সাজেক ভ্যালি সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করায় আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজা ও শীতের পর্যটন মৌসুমকে ঘিরে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন স্থানীয় পর্যটন ব্যবসায়ীরা। তাঁদের দাবি, আগামী ১৬ থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত দুর্গাপূজার ছুটিকে কেন্দ্র করে অধিকাংশ রিসোর্ট ও কটেজের কক্ষ আগাম বুকিং দেওয়া ছিল। পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ থাকলে ১০ দিনে প্রায় ২০ কোটি টাকার ব্যবসায়িক ক্ষতি হতে পারে।
সাজেক কটেজ অ্যান্ড রিসোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন সূত্রে জানা গেছে, সোমবার সকাল সাড়ে ১০টা ও দুপুর আড়াইটার দিকে বিভিন্ন কটেজ ও রিসোর্টে অবস্থানরত পর্যটকেরা সাজেক ছাড়েন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরাপত্তায় তাঁদের খাগড়াছড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়। প্রশাসনের বেঁধে দেওয়া সময়সীমার আগেই সব পর্যটককে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। নতুন করে কাউকে সাজেকে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি।
সাজেকের সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় গত রোববার (১১ অক্টোবর) জরুরি গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে পর্যটনকেন্দ্রটি সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেন রাঙামাটির জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী। একই সঙ্গে সোমবার বিকেল ৫টার মধ্যে সাজেকে অবস্থানরত পর্যটকদের এলাকা ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়।
এর আগে রোববার ভোর ৬টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত সাজেক সড়কে অবরোধ কর্মসূচি পালন করে সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন। এতে সাজেকগামী যান চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েন পর্যটকেরা। পরে বিকেলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পর অবরোধকারীরা দুই দিনের জন্য কর্মসূচি স্থগিত করতে সম্মত হন। এরপর নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্য দিয়ে সাজেকে আটকে পড়া পর্যটকদের খাগড়াছড়িতে ফিরিয়ে নেওয়া শুরু হয়।
এদিকে, আগামী ১৬ অক্টোবর থেকে শুরু হচ্ছে শারদীয় দুর্গাপূজা। সরকারি ছুটি ও উৎসবকে কেন্দ্র করে ২০ থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত পর্যটকদের ব্যাপক সমাগমের প্রত্যাশা করছেন সাজেকের ব্যবসায়ীরা। পাশাপাশি শুরু হতে যাচ্ছে শীতকালীন পর্যটন মৌসুম। এমন সময়ে পর্যটনকেন্দ্রটি বন্ধের ঘোষণায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন রিসোর্ট-কটেজের মালিক, রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী, পরিবহনচালকসহ পর্যটন খাতের সঙ্গে জড়িত শত শত মানুষ।
এ প্রসঙ্গে সাজেকের মেঘ সমুদ্র রিসোর্টের স্বত্বাধিকারী যোথেন ত্রিপুরা বলেন, 'আগামী ১৬ থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত দুর্গাপূজা উপলক্ষে আমাদের রিসোর্টের প্রায় ৯০ শতাংশ কক্ষ বুকিং ছিল। হঠাৎ করে জেলা প্রশাসন সাজেক পর্যটনকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করায় আমরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছি। ইতিমধ্যে অনেক পর্যটক বন্ধের খবর পেয়ে তাঁদের আগাম বুকিং বাতিল করছেন। তাদের টাকা ফেরত দিতে হচ্ছে।'
তিনি আরও বলেন, 'আমাদের ব্যবসার জন্য এই সময়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রশাসনের কাছে অনুরোধ, সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে পর্যটনকেন্দ্রটি খুলে দিয়ে আমাদের ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ করে দেওয়া হোক।'
খাগড়াছড়ি-সাজেক সড়কে চলাচলকারী মাহিন্দ্রচালক মো. জসিম উদ্দিন বলেন, 'সাজেক বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমরাও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছি। গতকালসহ গত তিন দিনে আমার তিনটি ভাড়া বাতিল হয়ে গেছে। পর্যটক না থাকলে আমাদের আয়ও বন্ধ হয়ে যায়।'
সাজেক কটেজ অ্যান্ড রিসোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদক রাহুল চাকমা জন বলেন, 'জেলা প্রশাসনের জরুরি গণবিজ্ঞপ্তির পর নির্ধারিত সময়ের আগেই দুই দফায় সব পর্যটক সাজেক ছেড়েছেন। বর্তমানে সেখানে কোনো পর্যটক নেই। নতুন করে কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না।'
তিনি বলেন, 'সাজেকে বছরের বেশির ভাগ সময় পর্যটকদের আনাগোনা তুলনামূলক কম থাকে। সাপ্তাহিক ছুটি, ঈদ, দুর্গাপূজা এবং শীতের মৌসুমে পর্যটকদের ব্যাপক সমাগম হয়। এসব সময়ের ব্যবসার ওপর নির্ভর করেই আমাদের সারা বছরের আয় ও লোকসান পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে হয়। কিন্তু পর্যটনকেন্দ্রটি বন্ধ থাকায় এখন আমরা বড় ধরনের সংকটে পড়েছি।'
রাহুল চাকমা জনের ভাষ্য, সাজেকে বর্তমানে প্রায় ১৩০ থেকে ১৩৫টি রিসোর্ট, ২০ থেকে ২৫টি রেস্তোরাঁসহ বিভিন্ন পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এ ছাড়া খাগড়াছড়ি থেকে সাজেকে পর্যটক পরিবহনকারী যানবাহনের চালক ও মালিকেরাও এ খাতের ওপর নির্ভরশীল।
তিনি আরও বলেন, 'সাপ্তাহিক ছুটি, ঈদ, দুর্গাপূজা ও শীতের মৌসুমে সাজেকে প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি টাকার ব্যবসা হয়। আগামী ১৬ থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত ১০ দিনের ছুটির মৌসুমে পর্যটনকেন্দ্রটি বন্ধ থাকলে আমাদের প্রায় ২০ কোটি টাকার ব্যবসায়িক ক্ষতি হতে পারে।'
পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ থাকলে শুধু রিসোর্ট ও কটেজের মালিকেরাই নন, এর সঙ্গে যুক্ত রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী, পরিবহনচালক, পর্যটক গাইড, কর্মচারী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
তাঁদের মতে, সাজেকের পর্যটন ব্যবসার ওপর নির্ভর করে স্থানীয় অনেক পরিবারের জীবিকা নির্বাহ হয়। পর্যটনকেন্দ্রটি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে এসব পরিবারের আয়-রোজগার ব্যাহত হবে।
তাই সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত সাজেক ভ্যালি পর্যটকদের জন্য খুলে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন পর্যটন ব্যবসায়ীরা। তাঁদের আশা, প্রশাসন প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করে পর্যটনকেন্দ্রটি চালুর উদ্যোগ নিলে আসন্ন দুর্গাপূজা ও শীতের মৌসুমে সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতি কিছুটা হলেও এড়ানো সম্ভব হবে।
Comments