ব্যাংকে টাকা রেখে ঠকছেন মানুষ?
এই বৃহষ্পতিবার, ১৫ অক্টোবর থেকে আমানতকারীদের চাহিদা অনুযায়ী অর্থ উত্তোলনের সুযোগ দেওয়াসহ পূর্ণাঙ্গ ব্যাংকিং কার্যক্রম ফের শুরু করবে। এর আগে এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গেছে পাঁচ ব্যাংকের সমন্বয়ে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক। পদ্মা ব্যাংকের অবস্থা না বললেই নয়। এই ব্যাংকটি চলছে না, গ্রাহকরা কোন টাকাও পাচ্ছে না। ব্যাংকটি বন্ধ হবে নাকি মৃতপ্রায় করেই জিউয়ে রাখা হবে সেটা কেউ জানে না।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক ফিরেছে স্বাভাবিক পথে। হয়তো একদিন পদ্মা ব্যাংকও ফিরবে লেনদেন। কিন্তু এগুলো কোনদিনই আর প্রথম সারির ব্যাংক হবে না। সেই আস্থা উঠে গেছে। এখন ব্যাংক ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা এখন দ্রুত কমছে। কারণ মানুষ ভুগেছে অনেক।
একজন মানুষের আমানত শুধু টাকা নয়,এটি তার সারাজীবনের পরিশ্রম,পরিবারের স্বপ্ন আর ভবিষ্যতের নিরাপত্তা। একজন গ্রাহক যখন ব্যাংকে টাকা জমা রাখেন,তখন তিনি শুধু একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করেন না-তিনি বিশ্বাস করেন,তার কষ্টার্জিত অর্থ নিরাপদ থাকবে,প্রয়োজনে তিনি সেই অর্থ হাতে পাবেন। এই বিশ্বাসই ব্যাংক ও গ্রাহকের সম্পর্কের সবচেয়ে বড় শক্তি।
কিন্তু ব্যাংকের সেই শক্তি বিনাশ হয়ে গেছে। কমছে আমানতের সুদের হার। মানুষ আর ব্যাংকে ভরসা পাচ্ছে না। ব্যাংক ছেড়ে মানুষ সঞ্চয়পত্রের দিকে ঝুঁকছে। তুলনামূলক ভালো মুনাফা ও নিরাপদ বিনিয়োগের প্রত্যাশায় ফের সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগে ঝুঁকছে সাধারণ মানুষ। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি বেড়েছে প্রায় ৫৭ শতাংশ।
আগস্টের শুরু থেকেই আমানতের সুদহার ৫০ থেকে ১০০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়েছে দেশের অধিকাংশ শীর্ষ বাণিজ্যিক ব্যাংক। এর ফলে আমানতের প্রকৃত রিটার্ন মূল্যস্ফীতির তুলনায় আরও পিছিয়ে পড়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি সুদহার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯.৫০ শতাংশে নামিয়েছে এবং সুদহারের স্প্রেডের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংকগুলো ঋণের সুদের হারও কমিয়েছে।
এই পদক্ষেপের বড় মূল্য দিতে হচ্ছে সঞ্চয়কারীদের। সার্বিক মূল্যস্ফীতি যখন দশ শতাংশের কাছাকাছি তখন নতুন করে সুদহার কমানোর ফলে আমানতের মুনাফার হার কমে ৮.৫০ থেকে ৯ শতাংশে নেমে আসছে,যা এক সময় ৯ থেকে ১০.১৫ শতাংশের মধ্যে ছিল। ফলে সুদহার মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মেলাতে না পারায় আমানতকারীরা প্রকৃত অর্থে নেতিবাচক রিটার্নের মুখে পড়ছে।
অর্থাৎ ব্যাংকে টাকা রেখে ঠকছেন আমানতকারীরা। ব্যাংক যে হারে সুদ দিচ্ছে,তার তুলনায় মূল্যস্ফীতি অনেক বেশি। এতে প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে। এখন ব্যাংকে অর্থ রাখা মানেই লোকসান।
এমনিতেই ব্যাংকের ওপর মানুষের আস্থা কম। এ অবস্থায় আমানত রেখে ঠকলে মানুষের মধ্যে সঞ্চয়ের প্রবণতা আরও কমে যাবে। ব্যাংকের ওপর আস্থা রাখতে পারছে না বলে অনেকেই আমানত তুলে নিয়েছেন এবং নিচ্ছেন। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে দৈনন্দিন খরচ মেটাতেও অনেকে সঞ্চয় ভাঙছেন। আবার ব্যাংক খাত নিয়ে নানা আতঙ্কের কারণেও কেউ কেউ অর্থ তুলে নিয়েছেন।
মানুষকে সঞ্চয়ী করতে হলে প্রণোদনা দিতে হবে। খারাপ সময়ে এই প্রণোদনা দেওয়া আরও জরুরি। অথচ এখন ব্যাংক থেকে দূরে রাখা হচ্ছে আমানতকারীদের। সুদ দেওয়া হচ্ছে মূল্যস্ফীতির তুলনায় কম হারে। সঞ্চয় করতে নিরুৎসাহিত হওয়ার অর্থই হচ্ছে অর্থনীতিতে বিনিয়োগযোগ্য মূলধন কমে যাওয়া। আর আমানত কমলে ব্যাংকের তারল্য-সংকট বৃদ্ধি পাবে। তাতে উৎপাদন বা ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডেও ভাটা পড়ে,মন্দাও দীর্ঘস্থায়ী হয়।
Comments