রাজধানীর লোকাল বাসে চরম অব্যবস্থাপনা, ঝুঁকিতে নারী-শিশু ও প্রবীণরা
রাজধানীর লোকাল বাসে নারী, শিশু, প্রতিবন্ধী ও প্রবীণ যাত্রীদের নিরাপদ যাতায়াত নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী সংরক্ষিত আসন রাখার কথা থাকলেও বাস্তবে তা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে না। পাশাপাশি প্রায় ৮০ শতাংশ বাসে হেলপার না থাকায় যাত্রীদের ওঠানামায় তৈরি হচ্ছে বাড়তি ঝুঁকি। বিশেষ করে চলন্ত বাস থেকে নামার সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা বেশি থাকছে।
নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটি এবং শিপিং অ্যান্ড কমিউনিকেশন রিপোর্টার্স ফোরামের (এসসিআরএফ) যৌথ পর্যবেক্ষণে এসব অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে। রোববার (১১ অক্টোবর) গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সংগঠন দুটি পর্যবেক্ষণের তথ্য প্রকাশ করে।
বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, এক মাস ধরে ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী অর্ধশতাধিক বাস পর্যবেক্ষণ করা হয়। এ সময় যাত্রী, পরিবহনকর্মী ও সংশ্লিষ্ট অন্যদের সঙ্গে কথা বলে বাসসেবার বিভিন্ন সমস্যা চিহ্নিত করেন পর্যবেক্ষকেরা।
নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক আশীষ কুমার দে বলেন, রাজধানীর লোকাল বাসগুলোতে নিয়মনীতি উপেক্ষা করে চলাচলের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। যাত্রীসেবার তুলনায় মুনাফাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন বাসমালিকেরা। এসব অনিয়ম নিয়ন্ত্রণে দ্রুত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার দাবি জানান তিনি।
সংরক্ষিত আসনে বসছেন পুরুষ যাত্রীরা
পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, নারী, শিশু, প্রতিবন্ধী, মুক্তিযোদ্ধা ও প্রবীণ নাগরিকদের জন্য প্রতিটি বাসে নয়টি আসন সংরক্ষিত রাখার সরকারি নির্দেশনা রয়েছে। কিছু বাসে এ-সংক্রান্ত নির্দেশনা লেখা থাকলেও অধিকাংশ বাসে তা দৃশ্যমান নয়। যেসব বাসে নির্দেশনা রয়েছে, সেখানেও নিয়মটির যথাযথ বাস্তবায়ন দেখা যায়নি।
যাত্রীতে পূর্ণ বাসে সংরক্ষিত আসনে পুরুষদের বসে থাকতে দেখা যায়। ফলে যেসব যাত্রীর জন্য আসনগুলো নির্ধারিত, তাদের অনেককেই দাঁড়িয়ে চলাচল করতে হয়। এতে শারীরিক দুর্ভোগের পাশাপাশি অস্বস্তি ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে।
হেলপার না থাকায় বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি
রাজধানীর লোকাল বাসের আরেকটি বড় সমস্যা হিসেবে হেলপার না থাকার বিষয়টি উঠে এসেছে। সংগঠন দুটির পর্যবেক্ষণ বলছে, প্রায় ৮০ শতাংশ বাসে হেলপার নেই। এসব বাসের অনেক ক্ষেত্রে চালক মালিকের কাছ থেকে দৈনিক চুক্তিতে গাড়ি নেন এবং একজন কন্ডাক্টর নিয়ে বাস পরিচালনা করেন। দিনের আয় থেকে মালিকের পাওনা পরিশোধের পর অবশিষ্ট অর্থ চালক ও কন্ডাক্টরের মধ্যে ভাগ হয়। ব্যয় কমানোর উদ্দেশ্যে হেলপার নিয়োগ না দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে বলে পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
হেলপার না থাকায় কন্ডাক্টরকে একই সঙ্গে ভাড়া আদায় এবং বিভিন্ন স্থানে বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানো-নামানোর দায়িত্ব সামলাতে হয়। এর ফলে অনেক সময় নির্ধারিত স্টপেজের বাইরে বাস থামানো হয়। তাড়াহুড়া করে যাত্রী ওঠানো-নামানোর কারণে নারী, শিশু, প্রতিবন্ধী ও প্রবীণদের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে।
বিশেষ করে বাস থেকে নামার সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা বেশি থাকে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে প্রায় প্রতিদিনই ছোটখাটো দুর্ঘটনা ঘটছে বলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করা হয়েছে।
অনিয়ম বন্ধে চার দফা সুপারিশ
বাসসেবার এসব সমস্যা সমাধানে চারটি সুপারিশ দিয়েছে সংগঠন দুটি। এগুলো হলো—
১. নগর পরিবহনের সব বাসে নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীসহ নির্ধারিত যাত্রীদের জন্য নয়টি সংরক্ষিত আসন নিশ্চিত করা।
২. চালক ও কন্ডাক্টরের পাশাপাশি প্রতিটি বাসে একজন হেলপার নিয়োগ দেওয়া।
৩. চালক বা কন্ডাক্টরের কাছে দৈনিক চুক্তিতে বাস ভাড়া দেওয়ার প্রচলিত ব্যবস্থা বন্ধ করা।
৪. সিটি করপোরেশন নির্ধারিত স্টপেজের বাইরে বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানো-নামানো বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া।
সংগঠন দুটির মতে, এসব সুপারিশ বাস্তবায়ন করা গেলে রাজধানীর লোকাল বাসে শৃঙ্খলা ফেরানোর পাশাপাশি নারী, শিশু, প্রতিবন্ধী ও প্রবীণ যাত্রীদের যাতায়াত আরও নিরাপদ করা সম্ভব হবে।
Comments