দারিদ্র্য বাড়ছে, নাকি মধ্যবিত্তের ঠিকানা বদলাচ্ছে?
দেশে দারিদ্র্য বাড়ছে। খবরটি নতুন নয়। নতুন হলো, এবার দারিদ্র্যের তালিকায় শুধু চিরচেনা দরিদ্র মানুষ নেই; সেখানে ঢুকছে সেই পরিবারগুলোও, যারা কিছুদিন আগেও নিজেদের দরিদ্র ভাবেনি।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দৈনিক ৩ ডলারের আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমার নিচে নতুন করে নেমেছেন প্রায় ২১ লাখ মানুষ। জাতীয় দারিদ্র্যের হারও ২০২২ সালের ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে আনুমানিক ২২ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে। অর্থাৎ দরিদ্রের সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—দরিদ্র হচ্ছে কারা?
উত্তরটা খুব জটিল নয়। যারা চাকরি হারিয়েছেন, যাদের আয় কমেছে, যাদের ব্যবসা সংকুচিত হয়েছে, যাদের মজুরি বাজারদরের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারেনি, তারাই এখন দারিদ্র্যের নতুন মুখ।
আর এই তালিকায় নারীদের উপস্থিতি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। শিল্প ও সেবা খাতে কাজ হারানো অনেক নারী আর শ্রমবাজারে ফিরতে পারেননি। অর্থাৎ একজন নারী শুধু চাকরি হারাননি; অনেক ক্ষেত্রে একটি পরিবারের দ্বিতীয় আয়ের উৎসটিও হারিয়ে গেছে।
এদিকে বাজারের গল্পটা আরও চমৎকার। মূল্যস্ফীতি কমেছে, এই সুখবরটি আমরা শুনছি। কিন্তু বাজারে গিয়ে সেই সুখবরের দেখা মেলে না। কারণ মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৭ শতাংশে নামার অর্থ পণ্যের দাম কমে যাওয়া নয়। অর্থ হলো, দাম আগের মতোই বাড়ছে, শুধু একটু কম গতিতে বাড়ছে।
ধরুন, গত বছর যে পণ্যটি ১০০ টাকায় কিনেছেন, এ বছর সেটি ১১০ টাকা। পরের বছর সেটি ১২০ টাকা না হয়ে ১১৭ টাকা হলে পরিসংখ্যানের খাতায় মূল্যস্ফীতি কমেছে। কিন্তু আপনার পকেটের কাছে পণ্যটি সস্তা হয়নি। বরং আগের বাড়তি দামটিই স্থায়ী হয়ে গেছে।
এটাই নিম্নআয়ের মানুষের বাস্তবতা। আয় বাড়ে ধীরে, বাজারদর বাড়ে দ্রুত। তারপর একদিন দেখা যায়, যে পরিবারটি গত বছর মধ্যবিত্ত ছিল, এ বছর তার হিসাবের খাতা 'ঝুঁকিপূর্ণ'। পরের বছর হয়তো 'দরিদ্র'।
অর্থাৎ বাংলাদেশে দারিদ্র্য এখন শুধু নিচ থেকে ওপরে তাকানো কোনো সমস্যা নয়। মধ্যবিত্তের নিচে নেমে যাওয়ার সমস্যাও।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে কর্মসংস্থানের সংকট। বিনিয়োগ কমছে, শিল্পের গতি কমছে, রপ্তানি কমছে, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও কর্মঘণ্টা কমছে, কোথাও উৎপাদন বন্ধ, কোথাও কর্মী ছাঁটাই। অর্থনীতির ভাষায় এগুলো প্রবৃদ্ধির সংখ্যা। মানুষের ভাষায় এগুলোর নাম—চাকরি নেই।
একটি কারখানার উৎপাদন কমলে অর্থনীতিবিদ হয়তো গ্রাফে একটি রেখা নিচে নামতে দেখবেন। কিন্তু সেই রেখার নিচে থাকে একজন শ্রমিকের সংসার, সন্তানের স্কুলের বেতন, বাড়িভাড়া, বাজারের ব্যাগ আর মাসের শেষ সপ্তাহের ধার।
সুতরাং প্রশ্নটা শুধু 'জিডিপি কত বাড়ল' নয়। প্রশ্ন হলো, মানুষের আয় কতটা বাড়ল? বিশ্বব্যাংক বলছে, আগামী অর্থবছরে প্রায় ৬ লাখ ৩০ হাজার নিট কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে। শুনতে সংখ্যাটি বড়। কিন্তু বাংলাদেশের মতো বিপুল শ্রমশক্তির দেশে দারিদ্র্য কমানোর জন্য সেটি যথেষ্ট নয়।
আর এখানেই আমাদের উন্নয়নের একটি পুরোনো কৌতুক আবার সামনে আসে—আমরা প্রবৃদ্ধির হিসাব করতে পারি, কিন্তু প্রবৃদ্ধির চাকরিটি কার ভাগ্যে গেল, সেই হিসাব করতে গিয়ে হোঁচট খাই। সবচেয়ে বড় বিদ্রূপ হলো, যখন দরিদ্র মানুষটির সবচেয়ে বেশি সহায়তা প্রয়োজন, তখনই সে অনেক সময় সরকারি সহায়তার তালিকার বাইরে থাকে।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোর প্রায় অর্ধেকই কোনো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় নেই। অর্থাৎ রাষ্ট্র বলছে, 'দরিদ্রদের জন্য সহায়তা আছে।' আর দরিদ্র মানুষটি বলছে, 'আমার জন্য কোথায়?'
এই ফাঁকটিই আসলে সবচেয়ে ভয়ংকর। দারিদ্র্য কমানোর জন্য শুধু ভর্তুকি বা নগদ সহায়তা যথেষ্ট নয়। দরকার এমন অর্থনীতি, যেখানে মানুষ কাজ পাবে, আয় বাড়বে এবং সেই আয় মূল্যস্ফীতির কাছে প্রতিদিন পরাজিত হবে না।
কারণ একজন মানুষকে ৫০০ টাকা সহায়তা দিয়ে একদিন বাঁচানো যায়। কিন্তু তাকে একটি স্থায়ী কাজ দিলে সে নিজের পরিবারকে বছরের পর বছর বাঁচাতে পারে।
তাই এখন সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হওয়া উচিত, আমরা কত টাকা দরিদ্রদের দিচ্ছি, সেটি নয়; আমরা কেন এত মানুষকে দরিদ্র হয়ে পড়তে দিচ্ছি? যে পরিবারটি গতকাল পর্যন্ত দারিদ্র্যসীমার ওপরে ছিল, আজ কেন নিচে নেমে গেল? যে নারীটি কারখানায় কাজ করতেন, তিনি কেন আর ফিরতে পারলেন না? যে তরুণ চাকরি খুঁজছেন, তার জন্য নতুন চাকরি কোথায়? যে শ্রমিকের মজুরি বেড়েছে ৫ শতাংশ, কিন্তু সংসারের খরচ বেড়েছে তার চেয়ে বেশি—তার প্রকৃত আয় কত?
এসব প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে শুধু দারিদ্র্যের হার গুনলে হয়তো পরিসংখ্যান পাওয়া যাবে, সমাধান পাওয়া যাবে না।
সঠিক মানুষকে সঠিক সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা দরকার নিশ্চয়ই। কিন্তু তার চেয়েও বেশি দরকার এমন একটি অর্থনীতি, যেখানে মানুষকে দরিদ্র হওয়ার পর খুঁজে বের করতে হবে না; বরং দরিদ্র হওয়ার আগেই তার আয় ও কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা তৈরি হবে।
কারণ দারিদ্র্যের সবচেয়ে নির্মম দিক হলো—মানুষ একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দরিদ্র হয় না। সে একটু একটু করে পিছিয়ে যায়। প্রথমে বাজারের তালিকা ছোট হয়। তারপর সন্তানের কোচিং বন্ধ হয়। এরপর চিকিৎসা পিছিয়ে যায়। তারপর সঞ্চয় ভাঙে। তারপর ধার হয়। শেষে একদিন দেখা যায়—পরিসংখ্যানের খাতায় সে দরিদ্র।
তখন আমরা বলি, 'আরও ২১ লাখ মানুষ দরিদ্র হয়েছে।' মানুষটির কাছে অবশ্য ব্যাপারটা এত পরিসংখ্যানের নয়। তার কাছে ব্যাপারটা খুব সোজা—আগে সংসার চালাতে কষ্ট হতো। এখন সংসার চালানোই সম্ভব হয় না।
Comments