মাঝআকাশে ভয়াবহ বিপদ, ১২ মিনিটের লড়াইয়ে বাঁচল উড়োজাহাজ
সহকারী পাইলটের ক্রমাগত ছুরিকাঘাতের মুখেও ককপিটের দরজা খোলার জন্য কীভাবে লড়াই করেছিলেন, সেই রোমহর্ষ বর্ণনা দিয়েছেন ফ্লাইদুবাইয়ের এফজেড১০৭৩ ফ্লাইটের ভারতীয় ক্যাপ্টেন স্মিথ মছার। বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য প্রশংসিত এ পাইলট গত বুধবারের সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন।
সৌদি আরবের একটি হাসপাতালের শয্যা থেকে শুক্রবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলেন ক্যাপ্টেন স্মিথ মছার। সে সময় তিনি বলেন, 'আমি যখন রক্তাক্ত অবস্থায় নিচে পড়ে যাই, তখন বুঝছিলাম, উড়োজাহাজটি খাড়া নিচের দিকে আছড়ে পড়ছে। আমি জানতাম কিছু একটা করার এটাই আমার শেষ সুযোগ। আর দরজাটি ঠিক আমার পাশেই ছিল।'
উড়োজাহাজটি যখন তীব্রগতিতে মাটির দিকে নেমে যাচ্ছিল, তখন পাইলটের এ মরিয়া চেষ্টার ফলে ক্রু ও যাত্রীরা ককপিটের দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়তে সক্ষম হন। এরপর হামলাকারী সহকারী পাইলটকে কাবু করে উড়োজাহাজের নিয়ন্ত্রণ নেন তাঁরা। যার ফলে নিশ্চিত এক বড় ধরনের বিমান দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পায় আরোহীদের প্রাণ।
এদিকে উড়োজাহাজে থাকা একজন 'ইসরায়েলি প্লাম্বারের' (পানির লাইনের মিস্ত্রি) সাহসী ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ককপিটে ওই ব্যক্তির দ্রুত পদক্ষেপ বড় ধরনের ট্র্যাজেডি রোধে সাহায্য করেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
এ বিষয়ে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, 'ফ্লাইটে থাকা ইসরায়েলি প্লাম্বার বুঝতে পেরেছিলেন কী ঘটছে। তিনি বেশ শক্তিশালী। সারা দিন ভারী পাইপ তোলার কাজ করলে শরীরে শক্তি থাকাই স্বাভাবিক। ভেতরের চিৎকার শুনেই তিনি পরিস্থিতি আঁচ করতে পারেন।'
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট আরও জানান, মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে উড়োজাহাজটি যখন প্রায় ১৭ হাজার ফুট (৫,১৮০ মিটার) নিচে নেমে যায়, তখন তীব্র মহাকর্ষীয় বলের (জি-ফোর্স) মধ্যেও ওই ব্যক্তি হামলাকারীকে আসন থেকে টেনেহিঁচড়ে পেছনে ফেলে দেন। সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিত অন্য যাত্রীরা তাঁকে চেপে ধরেন। এরপর আগে কখনো উড়োজাহাজ চালানোর অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও ওই প্লাম্বার 'স্টিক' টেনে ধরেন ও ক্র্যাশ করার ঠিক আগমুহূর্তে উড়োজাহাজটিকে আবার স্বাভাবিক অবস্থানে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হন।'
এ ঘটনার পর থেকে গত কয়েক দিনে ফ্লাইটের অন্য যাত্রীদের কাছ থেকেও এমন আরও রোমহর্ষ বিবরণ সামনে আসছে।
ফ্লাইট ট্র্যাকিং ওয়েবসাইট ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, বুধবার সকাল ৭টা ৫ মিনিটে (গ্রিনিচ মান সময় ০৩:০৫) দুবাই থেকে ইসরায়েলের তেল আবিবের উদ্দেশে রওনা দেয় ফ্লাইট এফজেড১০৭৩। উড়োজাহাজটি পরে ৩৪ হাজার ফুট (১০ হাজার মিটারের বেশি) ওপরে চলতে থাকে। তবে যাত্রার দুই ঘণ্টার কিছু বেশি সময় পর হঠাৎই এটি নিচে নামতে শুরু করে। উড়োজাহাজটি একবার তীব্রগতিতে নিচে নেমে আবার ওপরে ওঠে এবং আবার নিচের দিকে পড়তে থাকে।
খাড়া নিচের দিকে নামতে শুরু করার ঠিক ১২ মিনিট পর, গ্রিনিচ মান সময় ০৫:৩৩ মিনিটে উড়োজাহাজটি প্রায় ১৫ হাজার ফুট (৪,৫৭০ মিটার) উচ্চতায় পৌঁছালে এটির গতি ও অবস্থান কিছুটা স্বাভাবিক হতে শুরু করে।
উড়োজাহাজের ভেতরে চলা সেই রুদ্ধশ্বাস কয়েক মিনিটের ভয়াবহ পরিস্থিতির বিস্তারিত বিবরণ এখন সামনে আসছে।
গ্রিনিচ মান সময় ০৫:২১—খাড়া নিচের দিকে নামতে শুরু করে উড়োজাহাজ
ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, উড়োজাহাজটি প্রথমে তীব্রগতিতে নিচের দিকে নামতে থাকে। এরপর সেটি এক ঝটকায় আবার ওপরে উঠে দ্বিতীয়বারের মতো খাড়া নিচের দিকে পড়তে শুরু করে।
স্ত্রী ও দুই ছোট সন্তানসহ ফ্লাইটে থাকা যাত্রী অ্যাডাম পোলো সিএনএনকে জানান, প্রথম যখন উড়োজাহাজটি নিচে নামছিল, তখন এক মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল এটি হয়তো 'স্বাভাবিক কোনো এয়ার পকেট' বা শূন্যতা। তবে মাত্র এক সেকেন্ড পরই বোঝা গেল, এ অস্বাভাবিক পতন এবং এর তীব্র গতি কোনোভাবেই স্বাভাবিক ছিল না।
এই যাত্রী আরও বলেন, 'সে সময় উড়োজাহাজের বিদ্যুৎ–সংযোগ, মাল্টিমিডিয়া সিস্টেম ও শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র—সবকিছু পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। যাঁরা করিডরে দাঁড়িয়ে ছিলেন কিংবা টয়লেটে যাচ্ছিলেন, তাঁরা ছিটকে পড়ে যান। আসনে বসা ছাড়া বাকি সবাই নিচে পড়ে গিয়েছিলেন। পরিস্থিতি এমন ছিল, যেন জীবনের সবচেয়ে বিপজ্জনক রোলার কোস্টারে চড়েছি, তবে এর তীব্রতা ছিল হাজার গুণ বেশি।'
মাত্র দুই মিনিটের মধ্যে উড়োজাহাজটি ১৭ হাজার ফুটের বেশি নিচে নেমে আসে। নিরাপদে বাড়ি ফিরে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হওয়া যাত্রীরা সেই মুহূর্তের বর্ণনা দিতে গিয়ে জানান, কেবিনজুড়ে চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছিল, মানুষ দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে চিৎকার করছিলেন এবং একের পর এক তীব্র ঝাঁকুনি হচ্ছিল।
বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, 'উড়োজাহাজটি এত খাড়া কোণ করে অবিশ্বাস্য গতিতে নিচের দিকে নামছিল যে এর ঝাঁকুনিতে পেছনের দিক থেকে রাডার ছিঁড়ে যায়। এ ধরনের উড়োজাহাজ এমন গতিতে চলার জন্য তৈরি করা হয়নি। ফলে এটি তার সক্ষমতার সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল।'
'জীবনের জন্য লড়াই': ছুরিকাহত ক্যাপ্টেন
মাঝআকাশে কেবিনের ভেতরে যখন এই তাণ্ডব চলছে, ঠিক তখনই ককপিটের ভেতরে দুই পাইলটের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হয়। সহকারী পাইলট হঠাৎই ভারতীয় ক্যাপ্টেন স্মিথ মছারকে ছুরিকাঘাত করে বসেন।
শুক্রবার স্মিথ মছার বর্ণনা দেন, কীভাবে তিনি হঠাৎই রক্তাক্ত ও গুরুতর আহত অবস্থায় ককপিটের মেঝেয় ছিটকে পড়েছিলেন। নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে ভিডিও কলে তিনি বলেন, 'আমি আহত অবস্থায় মেঝেতে পড়ে ছিলাম। তবে শেষবারের মতো আরেকটু শক্তি সঞ্চয় করে ভেতর থেকে ককপিটের দরজাটি খোলার জন্য মনস্থির করি।'
উড্ডয়নকালে উড়োজাহাজের ককপিটের দরজা সাধারণত তালাবদ্ধ থাকে এবং শুধু পাইলটরাই তা খুলতে পারেন। তবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মুখপাত্র ডোরন স্পিলম্যান সংবাদমাধ্যমকে জানান, রক্তাক্ত অবস্থায় মেঝেতে পড়ে থাকা সত্ত্বেও স্মিথ মছার 'তাঁর শেষ মুহূর্তের শক্তি' দিয়ে ককপিটের দরজার লক খুলতে সক্ষম হন।
মোদির সঙ্গে আলাপকালে মছার বলেন, 'দরজা খোলার পর অন্যরাও ভেতরে চলে আসেন এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখেন। আমি অবশ্যই নিজের জীবন বাঁচানোর জন্য লড়াই করছিলাম, তবে একই সঙ্গে মনে মনে প্রতিজ্ঞা ছিল, অন্যদের আমি মরতে দেব না।'
এ ঘটনার পর নেতানিয়াহু স্মিথ মছারকে একজন 'প্রকৃত বীর' হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। নিজের এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডলে তিনি লেখেন, এ একটিমাত্র কাজের মাধ্যমে পাইলট দারুণ সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন এবং উড়োজাহাজে থাকা ১৭৪ জন আরোহীর প্রাণ রক্ষা পেয়েছে। গুরুতর আহত হওয়া সত্ত্বেও তিনি প্রতিরোধ গড়ে তোলেন এবং ককপিটের দরজা খুলে যাত্রী ও ক্রুদের হামলাকারীকে কাবু করার সুযোগ করে দেন। ফলে মাঝআকাশে এক নিশ্চিত বড় বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হয়েছে।
ক্যাপ্টেন ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে জানান, তিনি গত ১৭ বছর ধরে উড়োজাহাজ চালাচ্ছেন। ফলে চোখ বন্ধ করেও বুঝতে পারেন উড়োজাহাজের ভেতরে ঠিক কী ঘটছে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ক্যাপ্টেনের সাহসিকতা, ধৈর্য ও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার প্রশংসা করে বলেন, এর ফলেই এত মানুষের জীবন বেঁচেছে এবং পুরো ভারত তাঁকে নিয়ে গর্বিত।
এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাস বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, সৌদি আরবে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর স্মিথ মছারকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে আবুধাবিতে নিয়ে আসা হয়েছে এবং তিনি এখন আশঙ্কামুক্ত ও দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠছেন।
রিয়াদে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাস সূত্রে জানা গেছে, এ 'সাহসী ভারতীয় পাইলটকে' প্রথমে সৌদি আরবের তাবুক শহরের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল, যেখানে উড়োজাহাজটি জরুরি অবতরণ করে।
নিজেদের এক্স হ্যান্ডলে এক বার্তায় দূতাবাস জানায়, পাইলটের স্বাস্থ্য সম্পর্কে বিস্তারিত রিপোর্টের অপেক্ষা করা হচ্ছে। তবে তাঁর অবস্থা বর্তমানে স্থিতিশীল। তিনি যেন দ্রুত এই আঘাত কাটিয়ে সুস্থ হয়ে ওঠেন, সে কামনা সবার।
Comments